মঠের দরোজা ঠেলে প্রবেশ করলো একজন দেবতা; লম্বা, আতঙ্ক-জাগানিয়া, কাঁধের দুই পাশে উড়ছে বিশাল আলখাল্লার প্রান্ত। মাথার আচ্ছাদন ঈগলের পালকে শোভিত, অর্ধেক মানব অর্ধেক ঈগলের অবয়ব বিশাল, ধাতব। চোখের জায়গায় দুটো কালো গর্ত।
আকহ্ হোরাস! চেঁচিয়ে উঠে ঢলে পড়লো একটা মেয়ে।
আকহ্ হোরাস! জনতার ঠোঁটে উচ্চারিত হতে লাগলো সেই চিৎকার। এ যে দেবতা স্বয়ং! সারিবদ্ধভাবে একে একে হাঁটু গেড়ে সম্মান প্রদর্শন করতে লাগলো তারা। এমনকি, সিংহাসনের চারপাশে উপবিষ্ট মহৎ প্রাণেরা পর্যন্ত নিচু হলেন। সমগ্র মন্দিরে কেবল দু জন মানুষ এখন দাঁড়িয়ে আছেন রঙ করা মূর্তির মতো নিজের সিংহাসনের ধাপে ফারাও, আর থিবেসের রাজ-উজির।
রাজার সামনে এসে থামলো আকহ্ হোরাস। তামার শিরস্ত্রাণের ভেতর থেকে তাকিয়ে রইলো তার দিকে। এখনো এক চুলও নড়েননি ফারাও। তাঁর প্রসাধন-চর্চিত গাল মরার মতো সাদা, চোখ দুটো কী একটু জ্বলছে? ধর্মীয় কোনো আবেগে? নাকি ভয়ে?
কে তুমি? জানতে চাইলেন ফারাও। ভুত নাকি মানব? আমাদের এই পবিত্র অনুষ্ঠানে কেনো বাধা দিলে? পরিষ্কার, জোরালো স্বরে বললেন তিনি। গলার স্বরে কোনো কম্পন নেই, তার প্রতি আমার ভক্তি বেড়ে গেলো। হতে পারে তিনি দুর্বল, বয়স্ক; কিন্তু এখনো সাহস অটুট আছে বৃদ্ধের । ঠিক যোদ্ধার মতোই কী মানুষ কী দেবতা যে কারো মোকাবেলা করতে সক্ষম তিনি।
মুখ খুললো আকহ্ হোরাস। পাথরের থামে প্রতিধ্বিনিত হলো তার আওয়াজ। মহান ফারাও, আমি ভুত নই, একজন মানুষ। আমি আপনারই লোক। আপনারই নির্দেশে আজ আপনার সামনে এসেছি। দুই বছর আগে, ঠিক এই দিনে, ওসিরিসের উৎসবে আপনি আমাকে যে দায়িত্ব দিয়েছিলেন, সেই কারণে এসেছি।
মাথার আচ্ছাদন খুলে ফেলতে আগুন-রঙা চুলগুলো ট্যানাসের কাঁধে ছড়িয়ে পড়লো। সাথে সাথেই তাকে চিনে ফেললো জনতা। এতো জোরে চেঁচিয়ে উঠলো তারা, মন্দিরের ভিত্তিমূল কেঁপে উঠলো।
প্রভু ট্যানাস! ট্যানাস! ট্যানাস!
আমার ধারণা, সবার চেয়ে জোরে চেঁচিয়ে উঠেছিলো আমার কর্ত্রী । আর একটু হলেই বধির হয়ে গেছিলাম আমি, ওর হুঙ্কারে।
ট্যানাস! আকহ্ হোরাস! আকহ হোরাস! এই জোড়া নাম এক হয়ে আছড়ে পড়তে লাগলো মন্দিরের দেয়ালে।
সমাধি থেকে উঠে এসেছে সে! দেবতা হয়ে গেছে আমাদের ট্যানাস!
খাপ থেকে তরবারি খুলে মেলে ধরলো ট্যানাস, নীরবতা কামনা করছে। চুপ হলো জনতা।
মহান মিশর, কথা বলার অনুমতি প্রার্থনা করছি।
ইশারায় সায় দিলেন ফারাও। সিংহাসনে বসে পড়লেন, যেনো পায়ে বলো। পাচ্ছেন না।
জোরালো স্বরে বলতে লাগলো ট্যানাস। দুই বছর আগে বিষাক্ত খুনী আর দস্যুদের নির্মূল করার ভার আপনি আমার উপর অর্পণ করেছিলেন, যারা আমাদের প্রিয় মাতৃভূমির জীবন বিপন্ন করে তুলেছিলো। আপনি আমাকে বাজপাখির প্রতীক দিয়েছিলেন।
আলখাল্লার আড়াল থেকে নীল মূর্তিটা বের করে সিংহাসনের ধাপে রাখলো ট্যানাস। এক পা পিছিয়ে আবার বলতে শুরু করলো।
রাজার নির্দেশ পালনে সুবিধার জন্যে আমি মৃত্যুর অভিনয় করেছিলাম। আগন্তুক একজনের দেহ মমি করে সমাধিস্থ করা হয়েছিলো।
বাক্-হার! চেঁচিয়ে উঠলো একটা নিঃসঙ্গ কণ্ঠ । এক হাজার কণ্ঠ সেই ধ্বনি ঠোঁটে তুলে নেয়। আবারো নীরবতা কামনা করতে হলো ট্যানাসকে।
নীল কুমির বাহিনীর একশ যোদ্ধাকে নিয়ে মরুতে অভিযান চালিয়েছি আমি; দুর্গম অঞ্চলে হানা দিয়ে ধ্বংস করেছি শ্রাইকদের দুর্গ। কাতারে কাতারে মেরে ফেলে পথের ধারে জড়ো করে রেখেছি শয়তানগুলোর মুণ্ডু।
বাক্-হার! সোৎসাহে চেঁচিয়ে উঠে জনতা। সত্যি কথা। আকহ্ হোরাস তাই করেছে! আবারো, তাদের গর্জন থামায় ট্যানাস।
শ্রাইক-নেতাদের নিকেশ করেছে আমি। তাদের অনুসারীদের কোনোরকম দয়া দেখিয়ে কতল করেছি। সমগ্র মিশরে এখন কেবল একজন আছে, নিজেকে শ্রাইক বলে দাবি করে।
এবারে নীরবে কথা গিলতে থাকে জনতা। এমনকি, ফারাও পর্যন্ত অধৈৰ্য্য গোপন রাখতে পারলেন না। বলো, লর্ড ট্যানাস যাকে লোকে এখন আকহ-হোরাস নামে জানে বলো, কে এই ব্যক্তি। ফারাও-এর প্রতিশোধ কী, সে জানে না।
আকহ্-সেথ নামের আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে রাখে সে। গর্জে উঠলো ট্যানাস। ঠিক অন্ধকারের দেবতাদের মতো।
তার সত্যিকারের নাম জানাও, উত্তেজনায় দাঁড়িয়ে পড়লেন ফারাও। এই শেষ শ্ৰাইকের নাম বলো আমাকে!
ধীরে কাজ শুরু করে ট্যানাস। ইচ্ছেকৃতভাবে পুরো মন্দিরে দৃষ্টি বোলায় সে। আমার চোখে চোখ পড়তে হালকা করে মাথা নেড়ে সায় দিলাম, একটুও না চমকে ধীরে মঠের দরোজায় দৃষ্টি ফেরায় ট্যানাস।
সবার মনোযোগ এখন ট্যানাসের উপর নিবদ্ধ; কেউ টেরও পায় না একদল সৈন্য খুব দ্রুততার সাথে মঠের দরোজা গলে ঢুকে অবস্থান নিয়ে ফেলেছে। পুরোদস্তুর যুদ্ধের পোশাকে থাকা সত্ত্বেও তাদের বেশিরভাগকেই চিনতে পারলাম আমি। আসতেস, রেমরেমসহ নীল বাহিনীর পঞ্চাশজন বীর রয়েছে সেখানে। চমৎকার পেশাদারিত্বের সাথে সিংহাসনের চারিদিকে অবস্থান করে নেয় তারা। ইনটেফের পেছনে দাঁড়ায় রেমরেম এবং আসতেস। ওদের অবস্থান নেওয়া শেষ হতে, মুখ খুললো ট্যানাস।
মহান ফারাও, এই আকহ্ সেথ্ এর নাম বলবো আমি। আপনারই সিংহাসনের ছত্রছায়ায় নির্লজ্জের মতো বসে আছে সে, হাতের তলোয়ার দিয়ে দেখায় ট্যানাস। ওই তো সে প্রশংসার স্বর্ণ-শেকল পরে আছে বিশ্বাসঘাতক গলায়। ওই তো দাঁড়িয়ে সে ফারাও-এর রাজত্বেকে যে দস্যু আর বর্বরের লীলাভূমি বানিয়ে রেখেছিলো। ও-ই আকহ্ সেথ থিবেসের পরিচালক, উচচ-রাজ্যের রাজ-উজির!
