রাজার আগ্রহে পুরোটা সময় লসট্রিস তার পাশে পাশে রইলো। আমার ধারণা, কনিষ্ঠ বন্ধুর প্রতি তাঁর এই আগ্রহ মূলত সত্যিকারের ভালোবাসায় রূপ নিয়েছিলো ততদিনে। কিন্তু এর ফল হিসেবে দারুন ক্লান্ত হয়ে পড়লো মিসট্রেস; নদী পাড়ি দিয়ে থিবেসে ফিরে আসতে একেবারে ভেঙে পড়লো ও। পেটের বাচ্চার জন্যে চিন্তায় পড়ে গেলাম আমি। এখনো রাজাকে লসট্রিসের গর্ভাবস্থার কথা জানানোর মতো সময় আসেনি। সপ্তাহও পেরোয়নি রাজার শয্যাপাশ থেকে ফিরেছে সে, এতো দ্রুত ওকে গর্ভবতী ঘোষণা করা এমনকি আমার পক্ষেও সম্ভব নয়। রাজার কাছে তখনো উদ্দাম, উচ্ছল এক তরুণী সে।
৫. ওসিরিসের মন্দিরে
ওসিরিসের মন্দিরে রাজার ঘোষণার মধ্য দিয়ে সমাপ্তি ঘটলো শতাব্দী প্রাচীন উৎসবের।
মন্দিরের উঁচু বেদীতে স্থাপিত সিংহাসনে বসে ভাষণ দেবেন ফারাও। দ্বৈত-মুকুট তার মস্তকে শোভাবর্ধন করছে। লসট্রিস আর আমার জন্যে ভালো একটা জায়গা বেছে রেখেছিলাম, ভীষণ ভীড়ের মাঝেও সবকিছু যেনো পরিষ্কারভাবে দেখা যায়। সিংহাসনের ঠিক বিপরীতে, রাজার মাথার উচ্চতার চেয়ে সামান্য উপরে আমাদের অবস্থান হওয়ায় পুরো মন্দিরের সবকিছু আমাদের দৃষ্টিসীমায় রয়েছে। মেষের পালক ভরা একটা নরম বালিশ, ঝুড়িতে কিছু ফলমূল, শরবত, সুরা তৈরি রেখেছিলাম লসট্রি সের জন্যে।
আমাদের চারপাশে মিশরের তাবৎ মহৎ প্রাণ, জমিদার, ভদ্রমহিলা, রাজবধূ বসা; অভিজাত সাজ-পোশাকে সেজেছেন তাঁরা।
মন্দিরের প্রতিটি কোণ লোকে লোকারণ্য। ভীড়ের চাপে দেয়াল ভেঙে পড়ার উপক্রম। সারাজীবনেও এতো লোক দেখিনি আমি। গোনা সম্ভব নয়, তবে আমার ধারণা দুই লক্ষ লোক সেদিন সমবেত হয়েছিলো মন্দির প্রাঙ্গন, পবিত্র আভেন্য আর বাগানের মাঠ মিলিয়ে। যেনো অতিকায় কোনো মৌমাছির আঁক সর্বক্ষণ গুনগুন ধ্বনি উঠছে।
সিংহাসনের চারপাশে, ফারাও-এর পায়ের সমতলে বসে উচ্চ-পদস্থ ব্যক্তিবর্গ। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন ওসিরিসের মন্দিরের প্রধান পুরোহিত। আগেরজন ইতিমধ্যেই এই নশ্বর পৃথিবী ত্যাগ করে অন্যরাজ্যের পশ্চিমধারের মাঠ পেরিয়ে স্বর্গের উদ্দেশ্যে যাত্রা আরম্ভ করেছেন। এই জন বয়সে তরুণ শক্ত-পোক্ত মানুষ। একে খুব সহজে হাত করতে পারবেন না ইনটেফ–আমার মনে হলো। ইতিমধ্যেই যে বিভিন্ন বিষয়ে আমার সাথে পরামর্শ করেছেন নতুন পুরোহিত, আমার ধারণা, ইনটেফ তার খবর রাখেন না।
যা হোক, ফারাও নন, উৎসবের সবচেয়ে আকর্ষণীয় চরিত্র ছিলেন রাজ-উজির ইনটেফ। সবার নজর কাড়ছিলেন তিনি। লম্বা, শক্তিশালী অত্যন্ত সুদর্শন দেখাচ্ছিলো তাকে। ঠিক যেনো কিংবদন্তির কোনো বীর। তার ঠিক পেছনেই দাঁড়িয়ে র্যাসফার।
চিরকালীন রীতি অনুযায়ী সিংহাসনের সামনের ছোট্ট খোলা স্থানে দাঁড়িয়ে রাজাকে যমজ নগরী থিবেস-এ আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানালেন ইনটেফ। উনি যখন কথা বলছিলেন, ত্যাড়ছা চোখে আমার কর্ত্রীর দিকে তাকিয়ে দেখলাম, ঘৃণা আর ক্রোধে জ্বল জ্বল করছে তার মুখাবয়ব। পরিষ্কার, মুক্ত অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ। মনে হলো, ওকে সতর্ক করে দিয়ে বলি, চারপাশের মানুষজন টের পেয়ে যেতে পারে তার ভাবাবেগ। কিন্তু এতে করে অন্য সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করা হবে ভেবে বাদ দিলাম চিন্তাটা।
দীর্ঘ বক্তব্য রাখলেন ইনটেফ। তার অর্জন, বিগত বছরগুলোতে ফারাও-এর প্রতি তার সেবার ইতিহাস কিছুই বাদ গেলো না। এতো মানুষের গায়ের উত্তাপ, তার সঙ্গে মাথার উপরের নির্দয় সূর্যের খরতাপে গা যেনো পুড়ে যাবে। একজন মহিলাকে জ্ঞান হারিয়ে ঢলে পড়তে দেখলাম আমি।
অবশেষে, ইনটেফের বক্তব্য শেষ হতে, তাঁর জায়গা নিলো প্রধান পুরোহিত। থিবেসের ধর্ম বিষয়ক আচার-অনুষ্ঠানের কথা বর্ণনা করলেন তিনি। এদিকে, দুপুর গড়িয়ে যাওয়ায় গরম আর দুর্গন্ধ বাড়তে লাগলো। সুগন্ধি তেল এখন আর ঘামের গন্ধ ঠেকিয়ে রাখতে পারছে না। এই ভীড় থেকে বেরিয়ে গিয়ে প্রকৃতির ডাকে যে সাড়া দেবে কেউ এমন উপায় নেই। কি পুরুষ কি নারী যে যেখানে আছে, সেখানেই প্রাকৃতিক কাজ সারলো। ঠিক গণ-শৌচাগারের মতো অবস্থা দাঁড়ালো মন্দিরের। সুগন্ধি-ভেজানো একটা রুমাল লসট্রিসের হাতে দিলাম আমি, ওটা দিয়ে মুখ চেপে রাখলো সে।
শেষমেষ যখন দেবতা ওসিরিসের নামে রাজার উপরে শান্তি বর্ষণের আহ্বান জানিয়ে তাঁর বক্তব্য শেষ করলেন পুরোহিত, স্বস্তির ধ্বনি উঠলো জনতার মধ্য থেকে। ইনটেফের পেছনে, নিজের জায়গায় বসে পড়লেন তিনি। প্রথমবারের মতো সম্পূর্ণ নীরব হলো জনতা। ফারাও-এর ভাষণ শোনার জন্যে আগ্রহে সামনে ঝুঁকে বসলো তারা।
দাঁড়ালেন রাজা। এতোটা সময় ধরে ঠিক মূর্তির মতো বসেছিলেন তিনি। দুই হাত ছড়ালেন ফারাও; আর ঠিক সেই মুহূর্তে উপস্থিত জনতা, পুরোহিত, মহৎপ্রাণ, জমিদার সবাইকে হতবুদ্ধ করে দিয়ে চিরকালীন প্রথার অন্যথা ঘটলো। এর পর যা হলো, তাতে অবশ্য অবাক-না-হওয়া সামান্য কিছু মানুষের মধ্যে আমি একজন–কেননা, এই ঘটনাবলিতে আমার নিজেরও অংশগ্রহণ ছিলো।
মঠের বিশাল, পালিশ করা তামার দরোজা হা হয়ে খুলে গেলো। মনে হলো, যেনো অদৃশ্য কোনো শক্তি ওটা খুলেছে, কাউকে দেখা যাচ্ছে না।
অবিশ্বাসে শ্বাস ফেললো জনতা, মন্দির প্রাঙ্গনে যেনো বাতাসের মতো বয়ে গেলো সেই শব্দ। আচমকা চেঁচিয়ে উঠলো একটা নারী কণ্ঠ, সাথে সাথেই অশরীরী হুঙ্কারে কেঁপে উঠলো সবাই। কেউ কেউ হাঁটু গেড়ে বসলো, কেউ আবার মাথা নিচু করে দুই হাত উঁচিয়ে ক্ষমা চাইতে লাগলো অতীন্দ্রিক শক্তির কাছে। সাথের চাদরে মুখ ঢেকে কাঁদতে লাগলো বহুজন।
