তোমাকে এখন থেকে সতর্ক থাকতে হবে, টাইটা, লসট্রিস ফিসফিস করে বললো আমার কানে, সুযোগ পাওয়া মাত্রই তোমাকে রাস্তা থেকে হঠিয়ে দেবে এরা।
রাজ-উজিরের সন্নিকটে দাঁড়িয়ে র্যাসফার। আমার অনুপস্থিতির সময়টাতে নিঃসন্দেহে পদোন্নতি পেয়েছে সে। তার মাথায় দশ হাজারের সেরা উপাধির টুপি। হাতে স্বর্ণ-মণ্ডিত চাবুক। মুখমণ্ডলের মাংশপেশির অবশ্য কোনো উন্নতি হয়নি, মুখের একপাশ এখনো ঝুলে আছে, লালা গড়াচ্ছে ওখান থেকে। ঠিক সেই মুহূর্তে আমার দিকে নজর পড়লো তার, অর্ধেক-মুখে ফুটে উঠলো এক চিলতে হাসি। ব্যাঙ্গ করে চাবুক মাথার উপরে তুলে অভিবাদন জানালো।
তোমাকে শপথ করে বলছি, মিসট্রেস, প্রতিটি মুহূর্ত ছোরার বাটে হাত রাখবো আমি; ফলমূল ছাড়া আর কিছু মুখে তুলবো না যতদিন রাসফার থিবেসে আছে। বিড়বিড় করে বলে, স্বতঃস্ফুর্ত ভঙ্গিতে আমিও ফিরিয়ে দিলাম র্যাসফারের হাসি।
কোনো রকম উপহার গ্রহণ করবে না, লসট্রিস বলে উঠলো। আর আমার বিছানার পায়ের কাছে ঘুমাবে রাতে। দিনে সব সময় আমার পাশে থাকবে, এদিক সেদিক ঘোরাফেরা করতে যেনো না দেখি।
যা বলেছো-অক্ষরে অক্ষরে পালন করবো। ওকে অভয় দিয়ে বললাম। সত্যিই, পরবর্তী দিনগুলোতে লসট্রিসের কাছাকাছি রইলাম আমি; জানি, আর যাই হোক, মেয়ের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কোনোকিছু করে সিংহাসনে বসার সুযোগ ইনটেফ নষ্ট করতে চাইবেন না।
স্বাভাবিক কারণেই, রাজ-উজিরের প্রত্যক্ষ সান্নিধ্যেই রইলাম আমরা বেশিরভাগ সময়। ওসিরিসের উৎসবের মেজবান তো তিনিই। এই সময়টুকুতে যথার্থ পিতা হিসেবে চমৎকার অভিনয় করে গেলেন ইনটেফ, ঠিক একজন রাণীর সাথে যেমন করে ব্যবহার করে মানুষ তেমন আচরণ করলেন মেয়ের সাথে। প্রতিদিন সকালে উপহার, সোনা-গহনা, আইভরি আর মূল্যবান কাঠের উপরে খোদাই করা দেব-দেবীদের মূর্তি প্রভৃতি পাঠালেন। লসট্রিসের আদেশ সত্ত্বেও উপহারগুলো ফেলিনি আমি। মূল্যবান জিনিস হেলায় নষ্ট করা সাজে না। গোপনে ওগুলো বিক্রি করে, শহরে আমার বন্ধু বণিকের সাহায্যে শষ্য ব্যবসায় কাজে লাগালাম টাকাগুলো।
মাঝে-মধ্যেই ইনটেফের ফ্যাকাসে হলুদ চোখে চোখ পড়তে বুঝলাম, আমার প্রতি তার মনোভাব পাল্টায়নি। শত্রুর সঙ্গে মোকাবেলায় তার ধৈৰ্য্য আর রোখ অবিশ্বাস্য। ভীষণ এক মাকড়শার মতো নিজের সৃষ্ট জালের কেন্দ্রে বসে যেনো তিনি–চোখ জ্বলছে ঘৃণার আগুনে। মনে পড়লো, বিষমিশ্রিত দুধের কথা–কেঁপে উঠলাম আমি।
এদিকে, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে যেমন চলে আসছে, আনন্দ-উল্লাস মুখর পরিবেশে আচার মেনে চললো ওসিরিসের উৎসবের উদযাপন। এইবার অবশ্য হাপির হদে শিকারে অংশগ্রহণ করলো না ট্যানাসের বাহিনী, ওসিরিসের মন্দিরের গীতি নাট্যেও অভিনয় করলো ভিন্ন অভিনেতার দল। ফারাও-এর প্রত্যাদেশ অনুযায়ী আমার রচিত নাটকই পুনরাভিনীত হলো, আগের মতোই হৃদয়-ছোঁয়া সংলাপ আর কাব্যে আপ্লুত হলো জনতা। অবশ্য, আমার কর্ত্রীর মতো সুন্দরী নয় এবারের আইসিস; হোরাসও নয় আমার ট্যানাসের মতো শৌর্য-বীর্যে উদ্ধত। আর র্যাসফারের তুলনায় সেথ যেনো বেশি অমায়িক।
গীতিনাট্যের পরদিন নদী পাড়ি দিয়ে সমাধি মন্দিরের নির্মাণকাজ তদারকি করতে চললেন ফারাও; সারাদিনই তার নিকটে থাকার সৌভাগ্য হলো আমার। বহুবার খোলাখুলিভাবে নির্মাণের বিভিন্ন কৌশল নিয়ে আমার মতামত জানতে চাইলেন তিনি। সবসময়ই স্বর্ণের হারটা গলায় পরে থাকলাম আমি, কিছুই নজর এড়ালো না ইনটেফের। আমার প্রতি রাজার স্পষ্ট পক্ষপাতিত্বে তার রোষ ছিলো দেখার মতো। এই কারণে হয়তো আমার বিরুদ্ধে কিছু করার আগে দু বার ভাববেন ভেবে মনে মনে আত্মপ্রসাদ বোধ করলাম।
আমি থিবেস ছাড়ার পর অপর একজন স্থপতি মন্দির নির্মাণের দায়িত্ব পেয়েছেন। নিঃসন্দেহে যে উঁচু মান নির্ধারণ করে গেছিলাম, তার ধারে-কাছেও যেতে পারে নি সে, কাজেও কোনো গতি আসেনি।
হোরাসের মহান মাতার কসম, যদি তুমি এখনো দায়িত্বে থাকতে, টাইটা! দু:খের সাথে মাথা নাড়লেন ফারাও। তোমার কর্ত্রী রাজী হলে, ওর থেকে তোমাকে কিনে নিয়ে এখানে, এই মৃতের নগরে সবসময়ের জন্যে নিয়োজীত করতাম। যে গর্দভটা এখন কাজ করছে, ও ব্যাটা খরচ তো দ্বিগুন করেইছে, কাজের অবস্থাও খারাপ।
হুম। সে একজন তরুণ উন্নাসিক বান্দা। সায় দিয়ে বললাম। রাজমিস্ত্রি, প্রস্তরশিখী ও ব্যাটার বিচি চুরি করে ফেললেও টের পাবে না।
উঁহু, ওর নয়, আমার বিচি চুরি করছে ওরা! ভৎর্সনার স্বরে বলে উঠলেন ফারাও। বরঞ্চ, তুমি খরচের তালিকা মিলিয়ে একটু দেখো, কোথায় কোথায় চুরিটা হচ্ছে–আমাকে জানাও।
অবশ্যই, আমার প্রতি এহেন আস্থা প্রদর্শনের জন্যে বেশ সম্মানিত বোধ করলাম । নতুন স্থপতি আমার নকশা করা বহু কিছু পরিবর্তনের ধৃষ্টতা পর্যন্ত দেখিয়েছে। নিম্ন রাজ্যের লাল ফারাও-এর কারিগরদের মতো সিরিয়ার নকশা নকল করে আমাদের নিজস্ব শিল্প নষ্টের হুমকিতে ফেলে দিয়েছে সে।
সমাধি মন্দিরের ধন-সম্পদ পরিদর্শন করে দিনের বাকি অংশ পার করে দিলেন ফারাও। পরদিনও সেই একই কাজ। এখানে অবশ্য তাঁর অনুযোগ করার মতো কিছু নেই। এই পৃথিবীর ইতিহাসে, কখনো কোনোদিন এতো সম্পদ একত্র করা সম্ভব হয়নি। এমনকি আমি পর্যন্ত স্বর্ণ-খণ্ডের পরিমাণ এবং ঔজ্জ্বল্যে বিরক্ত বোধ করতে শুরু করলাম।
