বেশি বকো তুমি, সতর্ক করে দিয়ে বললাম। এমনও হতে পারে, এ সামান্য পেট ব্যথা । নিশ্চিত হওয়ার আগে পরীক্ষা করে দেখতে হবে।
কোনো পরীক্ষার দরকার নেই আমার। আমার মন বলছে–ওটা আমার বাচ্চা।
তারপরও পরীক্ষা করে দেখা প্রয়োজন। বলে, একটা পাত্র আনতে ছুটলাম। ওটাতে আমার মিসট্রেসের দিনের প্রথম প্রস্রাব সংগ্রহ করে, সমান দুই ভাগে ভাগ করলাম।
প্রথম অংশের প্রস্রাবের সঙ্গে সমান পরিমাণ নীল নদের জল মেশালাম। এরপর, দুটো পাত্রে কালো মাটি ভরে পাঁচটি করে ধুররা বীজ বপন করলাম। একটি পাত্রে নীল নদের বিশুদ্ধ জল, অপর পাত্রে আমার কর্ত্রীর মিশ্রণ ঢেলে দিলাম। এটা হলো প্রথম পরীক্ষা।
এরপর, ক্যাম্পের ধারের আগাছার ভেতর খুঁজে-পেতে দশটি ব্যাঙ ধরে নিয়ে এলাম। কালো, পিচ্ছিল প্রাণী ওগুলো। স্কুল দেহে কোনো ঘাড় নেই, চ্যাপ্টা মাথার উপরে বসানো ড্যাবড্যাবে চোখ দুটো। ছেলেমেয়েরা বলে আকাশ-পণ্ডিত।
দুটি পাত্রে নদীর জল ঢেলে পাঁচটি করে আকাশ-পণ্ডিত রাখলাম। একটির মধ্যে আমার কর্ত্রীর শরীরের তরল ঢেলে দিলাম, বাকিটা আগের মতোই রইলো। পরদিন সকালে, গ্যালির উপরে আমার কর্ত্রীর প্রকোষ্ঠের গোপনীয়তায় চাদর দিয়ে ঢাকা পাত্রগুলো পরীক্ষা করে দেখলাম।
যে শস্যদানার পাত্রে লসট্রিসের তরল ছিলো, সবুজ চারাগাছ দেখা দিয়েছে ওটাতে, বাকিগুলো আগের মতোই আছে। পাঁচ আকাশ-পণ্ডিত যেগুলো আমার কর্ত্রীর আশীর্বাদ পেয়েছে, লম্বা, রুপালি ডিম পেড়েছে। বাকি পাঁচ বেচারা শূন্য পাত্রে বসে আছে ড্যাব-ড্যাবে চোখে।
বলেছিলাম না, আমি কোনো কিছু বলার আগেই লাফিয়ে উঠলো লসট্রিস। দেবতাদের ধন্যাবাদ! এ চেয়ে সুখের কিছু আর ঘটে নি আমার জীবনে!
এখনই আতনের সাথে কথা বলতে হবে আমাকে। আজ রাতেই রাজার শয্যায় যাবে তুমি। শান্তস্বরে বললাম ওকে। হতবুদ্ধ লসট্রিস একদৃষ্টে চেয়ে রইলো আমার পানে।
এমনকি ফারাও পর্যন্ত এটা বিশ্বাস করবেন না, মরু ঝড়ের বাতাসে ভেসে আসা বীজে গর্ভবতী হয়ে পড়েছো তুমি। ওই ছোট্ট জারজটার জন্যে একটা সৎ-পিতা খুঁজে বের করতে হবে আমাদের। ইতিমধ্যেই, পেটের বাচ্চাকে আমাদের বলে সম্বোধন করতে শুরু করে দিয়েছি আমি। গম্ভীর ভাবভঙ্গির আড়ালে আমি নিজেও আনন্দে আত্মহারা।
আর কখনো ওকে জারজ বলবে না! জ্বলে উঠলো লসট্রিস। ও একজন রাজকুমার হবে!
অবশ্যই হবে, যদি আরকি ওর জন্যে রাজ-পিতা জোগাড় করতে পারি। তৈরি হয়ে নাও, রাজার কাছে যাচ্ছি আমি।
*
গতরাতে আমি একটা স্বপ্ন দেখেছি, মহান মিশর, ফারাওকে বললাম। এতো অসাধারণ ছিলো সেই স্বপ্ন; নিশ্চিত হওয়ার জন্যে আমন রার ইন্দ্রজাল অনুশীলন করেছিলাম।
আগ্রহের আতিশায্যে সামনে ঝুঁকে বসলেন ফারাও; অন্য সবার মতোই আমার স্বপ্ন আর আমন রার ইন্দ্রজালের ভক্ত হয়ে গেছেন তিনিও।
এইবারে, এই বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই আর, মহান ফারাও। আমার স্বপ্নে দেবী আইসিস এসেছিলেন, তিনি আমার কাছে প্রতিজ্ঞা করে গেছেন, তার ভাই সেথ এর কারণে আপনার যে পুত্রসন্তান নষ্ট হয়েছিলো, তার ক্ষতিপূরণ তিনি স্বয়ং দেবেন। ওসিরিসের উৎসবের প্রথম রাতেই আমার কর্ত্রীকে আপনার শয্যাপাশে ডেকে নিন, শীঘ্রই আরো একটি পুত্রসন্তান উপহার পাবেন। এ দেবী আইসিসের প্রতিজ্ঞা।
আজই তো উৎসবের শুরু, আনন্দে উদ্বেলিত রাজা বলে উঠলেন, সত্যি কথা হলো, টাইটা, গত একমাস থেকেই ওই কাজ করার জন্যে উত্তেজিত হয়ে আছি আমি। তোমার নিষেধের কারণে কিছু বলিনি। কিন্তু, আমন রার ইন্দ্রজালে কী দেখলে, কই, বললে না তো! আবারো, সামনে ঝুঁকে বসলেন ফারাও, আমিও তৈরি।
ঠিক আগের বারের মতোই, তবে এবারে আরো পরিষ্কার, আরো খুঁটিনাটি সমৃদ্ধ। সেই বৃক্ষের সমুদ্র নদীর তীর ধরে অনন্তকাল পর্যন্ত টিকে আছে, মাথায় মিশরের দ্বৈত-মুকুট। আপনার বংশধারা শক্তিশালী, সময়ের শেষ পর্যন্ত টিকে আছে।
সন্তুষ্টির দীর্ঘশ্বাস ফেললেন ফারাও। যাও, মেয়েটাকে পাঠাও আমার কাছে।
তাঁবুতে ফিরে দেখি, আমার অপেক্ষায় বসে আছে লসট্রিস। সুন্দর করে সেজেছে সে।
আমি চোখ বন্ধ করে রাখবো পুরোটা সময়। ভাববো, ট্যানাসের সঙ্গে সেই ট্রাস এর সমাধিতে রয়েছি। বলে খিলখিল করে হেসে ফেললো মিসট্রেস। অবশ্য, রাজার সঙ্গে ট্যানাসের তুলনা অনেকটা ইঁদুরের লেজের সঙ্গে হাতির শুড়ের তুলনার মতো!
রাতের খাবারের ঠিক পর পরই রাজার তাঁবুতে লসট্রিসকে নিয়ে যেতে এলো আতন। শান্ত, দৃঢ় পদক্ষেপে বেরিয়ে গেলো লসট্রিস; হয়তো, ওর ছোট্ট রাজকুমারের কথা ভাবছিলো, ভাবছিলো তার সত্যিকারের বাবার কথা থিবেসে যে আমাদের পথ চেয়ে বসে আছে।
*
প্রিয়তমা থিবেস, একশো দরোজার নগরী, রূপসী থিবেস কী যে খুশি হয়েছিলাম আমরা, নদী তীরের ঝকঝকে মন্দির আর শহরের দেয়াল যখন দেখা দিলো সামনে।
পরিচিত সমস্ত স্থাপনা দেখতে পেয়ে আপ্লুত আমার কত্ৰী গান গেয়ে উঠলো। অবশেষে, যখন উজিরের প্রাসাদের ঘাটে ধীরে ভীড়লো আমাদের গ্যালি, ঘরে ফেরার আনন্দ ম্লান হয়ে এলো আমাদের। নীরব হয়ে গেলাম দু জনেই। নিজের পিতাকে দেখতে পেয়ে ভয়-পাওয়া শিশুদের মতো আমার হাত জড়িয়ে ধরলো লসট্রিস।
উজির ইনটেফ, সঙ্গে বুড়ো-আঙুলবিহীন তার দুই ছেলে-মেনসেট আর সোবেক দাঁড়িয়ে আছে অভ্যর্থনা বাহিনীর সামনের সারিতে; তাদের পেছনে মিশরের তাবৎ মহৎ প্রাণ, জমিদার, প্রভুরা । ঠিক যেমন কল্পনা করেছিলাম, দারুন শক্তিমান সুদর্শন আছেন ইনটেফ। ভেতরে ভেতরে দমে গেলাম আমি।
