প্রধান পুরোহিত যখন উচ্চস্বরে পাঠ করলো সেই হিসাব, হাসি ফুটে উঠলো রাজার মুখে। প্রায় যথার্থ বন্যার পূর্বাভাস করেছি আমরা। খুব কমও নয়, আবার এতো বেশিও নয় যে, নদীর ধারের গ্রাম আর শহর ডুবিয়ে দেয়। এই বন্যায় দারুন ফসল ফলবে, গবাদীপশুগুলোও মোটা-তাজা হয়ে উঠবে।
এমন নয় যে, দারুন ফসলের পূর্বানুমানের জন্যে হেসেছেন ফারাও; বরঞ্চ তাঁর খাজনা আদায়কারীদের সম্ভাব্য সগ্রহে উদ্বেলিত তিনি। বন্যার হিসেব দেখে খাজনার মান ঠিক করা হয় । এই বছর তাহলে সমাধি মন্দিরের জন্যে অনেক সম্পদ পাওয়া যাবে–এ-ই ছিলো তার আনন্দের কারণ। হাপির মন্দিরে জল-উৎসবের সমাপ্তি ঘোষণা করলেন তিনি, থিবেস অভিমুখে তীর্থযাত্রা শেষে ওসিরিসের উৎসবের দিনক্ষণ জানালেন। শেষবার ওসিরিসের গীতিনাট্যে আমার কর্ত্রীর অভিনয়ের পর দুই বছর অতিক্রান্ত হয়ে গেছে বিশ্বাস হতে চাইলো না আমার।
সারারাত জেগে থেকে ট্যানাসের গল্প শোনাতে হলো মিসট্রেসকে। থিবেস যাত্রা নিয়ে এতো উত্তেজিত হয়ে আছে ও, ঘুম হারাম হয়ে গেছে ।
আর মাত্র আটদিনের মাথায় উত্তরে রওনা হবে রাজকীয় নৌবহর। ওখানে, থিবেসে, আমাদের অপেক্ষায় থাকবে ট্যানাস। আমার কর্ত্রীর আনন্দের কোনো সীমা পরিসীমা রইলো না।
*
বিশাল, রাজকীয় নৌবহর যাত্রার জন্যে তৈরি। আমরা ছাড়াও বাদাবাকি সভাষদ ততক্ষণে বরাদ্দ করা জলযানে চড়ে বসেছি, প্রাসাদের ধাপ টপকে যখন রাজকীয় জলযানে আরোহণ করলেন ফারাও, চেঁচিয়ে উৎসাহ জানালাম আমরা। ফারাও নিরাপদে আসন গ্রহণ করতেই হাজার হাজার বাঁশি ধ্বনিত হলো–এ হলো পাল তোলার সংকেত। একই সঙ্গে পাল তুলে উত্তরে গলুই ঘোরানো হলো জাহাজগুলোর। বন্যার স্রোতে পড়ে তরতর করে বয়ে চললাম আমরা।
আকহ্ হোরাস, শ্রাইকদের ধ্বংস করার পর থেকেই সজীব বাতাস বইতে শুরু করেছে দেশটায় । যতোগুলো গ্রাম পেরিয়ে এলাম আমরা, তীরে এসে রাজাকে অভিবাদন জানিয়ে গেলো অধিবাসীরা। উচ্চ-আসনে বসা, মাথায় জবরজং দ্বৈত মুকুট–মৃদু হাসলেন ফারাও।
আমাদের এই নৌযাত্রায় অন্তত দুই বার জাহাজ ছেড়ে, সভাষদসহ জমিনে নেমে আকহ হোরাসের নিশানা মূর্তিগুলো পরিদর্শন করলেন ফারাও। ক্যারাভান পথের ধারের গ্রামের অধিবাসীরা নরমুণ্ডুর এই মূর্তিগুলো পবিত্র নিদর্শন হিসেবে রেখে দিয়েছে। প্রতিটি মুণ্ডু ঘষে-মেজে চকচকে করে ফেলেছে তারা; কাদা মাটি দিয়ে পিরামিড তৈরি করে রেখেছে। এমনকি নরমুণ্ডুের পিরামিডের চারপাশে শ্রাইন তৈরি করে পুরোহিত পর্যন্ত নিয়োগ করেছে, যেনো এই নিদর্শন নষ্ট না হয়।
দুটো শ্রাইনেই স্বর্ণের আংটি উপহার হিসেবে দিলো লসট্রিস, আমার প্রতিবাদে কোনো কাজ হলো না। অনেক সময়ই খেয়াল করেছি, সম্পদের কোনো হিসেব রাখে না আমার কর্ত্রী । আমি না থাকলে নির্ঘাত হাসি মুখে নিজের সবকিছু বিলিয়ে দিতো সে।
গজ-দ্বীপ ছাড়ার দশম রাতে, নদীর বাঁকে ছিমছাম একটা ভূখণ্ডে ক্যাম্প ফেললাম আমরা। সেই রাতের আমোদ-প্রমোদের মধ্যে ছিলো দেশের সেরা গল্প-বলিয়ের পরিবেশনা। গল্প দারুন ভালোবাসে আমার কর্ত্রী, এ তো আপনাদের আগে থেকেই জানা। প্রাসাদ ছাড়ার পর থেকেই আজ রাতের ব্যাপারে জল্পনা-কল্পনা করছিলাম আমরা। কিন্তু, দুঃখের সাথে লক্ষ্য করলাম, ক্লান্তি এবং অসুস্থতার জন্যে গল্প শুনতে অপারগতা জানালো লসট্রিস। আমাকে অবশ্য অন্যদের সাথে অনুষ্ঠানে যাওয়ার জন্যে অনুরোধ করলো সে, কিন্তু অসুস্থ অবস্থায় ওকে একা রেখে যাই কি করে? গরম ওষুধ দিয়ে, মেঝেতে ওর পাশে থাকলাম যদি রাতে আমাকে প্রয়োজন হয়।
সকালে যখন ওকে জাগাতে গেলাম, বেশ চিন্তিত হয়ে পড়েছি ততক্ষণে। সাধারণত ঠোঁটে হাসি নিয়ে এক লাফে বিছানা ছাড়ে লসট্রিস। কিন্তু আজ সকালে, মাথার উপরে চাদর টেনে ফিসফিস করে বললো, আর একটু ঘুমাতে দাও, টাইটা। বুড়ি মানুষের মতো ভারী আর ক্লান্ত লাগছে।
রাজা আজ দ্রুত রওনা হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। সূর্যোদয়ের আগেই আমাদের জাহাজে চড়তে হবে। গরম একটা পানীয় দেবো তোমাকে, দেখো, ভালো লাগবে তখন। গত পূর্ণিমায় আমার নিজের হাতে তোলা লতাগুল্ম, গরম পানিতে ঢেলে মিশ্রণ তৈরি করলাম।
বেশি কথা বলো না তো, আমাকে দাবড়ি লাগালো মিসট্রেস, কিন্তু ছাড়লাম না আমি। ঘুম থেকে তুলে, পানীয়টুকু খাওয়ালাম। চেহারা বিকৃত করে ফেললো সে। নির্ঘাত আমাকে বিষ খাওয়াচ্ছো। বললো লসট্রিস। এরপর, কোনোরকম সতর্কতা না জানিয়ে বমি করে ফেললো।
একেবারে চমকে গেছি আমরা দু জনেই।
কী হয়েছে আমার, টাইটা? ফিসফিসালো লসট্রিস। এ রকম আর কখনো হয়নি।
এরপরই, পুরো ব্যাপারটা বুঝলাম আমি।
খামসিন চেঁচিয়ে উঠলাম। ট্রাসের গোরস্থান! ট্যানাস!
প্রথমটায় শূন্য চোখে আমার দিকে চেয়ে রইলো সে, এরপর ঠোঁটে জেগে ওঠা হাসিটা পুরো তাবুতে যেনো আলো জ্বেলে দিলো। আমার পেটে বাচ্চা! চেঁচালো লসট্রিস।
এতো জোরে বলো না, মিসট্রেস। আবেদন জানিয়ে বললাম।
ট্যানাসের বাচ্চা! আমার পেটে ওটা ট্যানাসের বাচ্চা! নিঃসন্দেহে। ওর অসুস্থতার পর থেকে রাজাকে ঠেকিয়ে রেখেছিলাম আমি, লসট্রিসের সাথে শারীরিক সম্পর্ক থেকে।
ওহ, টাইটা, স্বাপ্নিক স্বরে বলে উঠে, নিজের রাতের পোশাক তুলে ফেললো লসট্রিস। শক্ত, সমান পেটটাতে হাত বোলাতে লাগলো। ভাবো একবার! ঠিক ট্যানাসের মতো, ছোট্ট একটা শয়তান তৈরি হচ্ছে এখানে। পুরো পেটে আদর করে হাত বোলালো সে। জানতাম, ট্রাসের গোরস্থানে যে সুখ আমি আবিষ্কার করেছি, তার নিদর্শন অবশ্যই থাকবে। দেবতারা আমাকে একটা স্মৃতিচিহ্ন দিয়েছেন। সারা জীবনের জন্যে।
