লসট্রিসের পেছনে, আমার চিরাচরিত জায়গায় ফিরে গেলাম। ভরে দিলাম ওর শূন্য পাত্র। সুরার প্রভাবে টলোমলো অতিথিরা মনে করলো, তাদের মনোরঞ্জনের জন্যে এতক্ষণ একটা নাটক অভিনীত হলো; কাজেই হাততালি দিয়ে, শিষ বাজিয়ে, ফুলের পাঁপড়ি ছুঁড়ে নিজেদের আনন্দ প্রকাশ করতে লাগলো তারা। বুঝতে পারলাম, অনেকেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছেন যাক, একজন দাস তবে দাস-ই আছে।
সুরার পাত্র ঠোঁটের সামনে ধরলো লসট্রিস, চুমুক দেওয়ার আগে পাত্রের ধারের ওপার থেকে হাসলো একটু। চিরজীবন ওর কাছাকাছি থাকবো আমি–এ আমার প্রতিজ্ঞা।
*
ভোজসভা এবং আমার মুক্তি-প্রহরের দিন সকালে বার্ষিক বন্যার পানিতে নীল নদের প্লাবনের সংবাদে আমাদের ঘুম ভাঙলো। আগে থেকে কিছুই বোঝে নি কেউ; বন্দরের দাড়োয়ানের চিৎকারে সচকিত হলো জনতা। মদের প্রভাবে তখনো ভার হয়ে আছে মাথা, দৌড়ে নদীর ধারে পৌঁছুলাম। ইতিমধ্যেই দুই তীর লোকে-লোকারণ্য হয়ে গেছে। হর্ষ-মুখর জনতা গান গেয়ে, নেচে-প্রার্থনা করে স্বাগত জানালো বানের পানি।
নতুন পানিতে ধুয়ে-মুছে গেলো ঘোলাটে সবুজ রঙ; এখন নদীর বর্ণ দারুন ধূসর। রাতের মধ্যেই বন্দরের পাথুরে সিঁড়ির অর্ধেক ডুবে গেছে, অল্প কিছু সময়ের মধ্যে জমিনে উঠে পড়বে পানি। এরপর, সেচ-খালগুলো ধরে পৌঁছে যাবে তৃষ্ণার্ত ফসলের মাঠে। ডুবিয়ে দেবে কৃষাণের ঘর-দোর, জমিনের সীমানা নির্ধারক খুঁটি।
বন্যাশেষে নতুন সীমানা নির্ধারণ, নীলের জলের অভিভাবকের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। ধনী এবং ক্ষমবানদের সম্পত্তি বাড়ানোর এই সুযোগ ইনটে কখনো ছাড়েন নি। উপঢৌকনের বদৌলতে তাদের জমিন বাড়িয়ে দিতেন তিনি।
নদীর উজান থেকে ভেসে এলো জলপ্রপাতের গর্জন। প্রকৃতিপ্রদত্ত গ্রানাইটের বাঁধ টপকে ছুটছে বানের পানি; সংকীর্ণ পথে বাধা পেয়ে ফুঁসছে, নীল আকাশের দিকে ছুঁড়ে দিচ্ছে পানির ফোয়ারা। মিহি জলকণার মেঘ শান্তির পরশ বুলিয়ে দিতে লাগলো দ্বীপের বাসিন্দাদের মুখে । আনন্দে উদ্বেলিত হই আমরা দেবতাদের এই উপহারে; আমাদের ভূ-খণ্ডে বৃষ্টি বলতে এ-ই।
চোখের সামনে দ্বীপের আশেপাশের বেলাভূমি প্লাবিত হতে লাগলো। কিছুক্ষণের মধ্যে আমাদের ঘা ভেসে যাবে। জলবাগানের দরোজায় কড়া নাড়বে পানি। শুধুমাত্র নাইলোমিটারে পরিমাপ করে বলা যাবে কতদূর পর্যন্ত পৌঁছুবে পানির স্তর। এর উপরই নির্ভর করছে উৎসব অথবা দুর্ভিক্ষের প্রাদুর্ভাব।
হন্তদন্ত হয়ে মিসট্রেসের কাছে ফিরে চললাম, কিছু সময়ের মধ্যেই জল-উৎসব আরম্ভ হবে। ওতে আমার বেশ বড়ো একটা ভূমিকা আছে। সুন্দর পোশাকে সজ্জিত হলাম আমরা দু জন; পুরস্কারের স্বর্ণের হার পরে নিলাম গলায়। এরপর, আমাদের হারেমের অন্যান্যদের সাথে নিয়ে স্বতঃস্ফুর্ত মিছিলে যোগ দিলাম। হাপির মন্দির অভিমুখে চলেছে সবাই।
ফারাও এবং মিশরের সমস্ত মহৎপ্রাণ আমাদের নেতৃত্বে রইলেন। পুরোহিতেরা আমাদের অভ্যর্থনা জানাতে মন্দিরের ধাপে দাঁড়িয়ে ছিলেন। কামানো মাথা চকচক করছে তাদের, চোখ উজ্জ্বল–অবশ্যই লোভ জ্বলজ্বল করছে সেখানে, রাজা আজ অনেক দান-সওগাত করবেন যে!
রাজা আসার আগেই দেব-দেবীর মূর্তি নিয়ে যাওয়া হয়েছে মন্দিরে; লাল লিনেন আর ফুলে-ফুলে বোঝাই ওগুলো। সুগন্ধি-তেলে মাখানো হয়েছে মূর্তিগুলো, বন্যার জন্যে প্রার্থনাসূচক গান গাইতে লাগলাম আমরা ওগুলোর সম্মুখে।
বহুদূর দক্ষিণে, যেখানে কোনো সভ্য মানুষের পা পড়ে নি; দুটো অসীম ধারণক্ষমতার কলসী নিয়ে তার পর্বতে আসীন দেবী হাপি–ও দুটো থেকেই নীল নদের পবিত্র জলের উৎপত্তি। দুই কলসীর জলের রঙ, স্বাদ ভিন্ন। একটির রঙ উজ্জ্বল সবুজ; স্বাদ মিষ্টি। অপরটি পলির কারণে গাঢ় ধূসর–যে পলি পড়ে আমাদের জমিন, ফসলের মাঠ উর্বর হয়ে উঠে।
আমাদের সঙ্গিতের মধ্যেই শস্যদানা, গোশত আর মদ, সোনা-রুপা উপঢৌকন হিসেবে দিলেন ফারাও। এরপর তার পরামর্শদাতা, প্রকৌশলী আর গণিতজ্ঞদের ডেকে নিলেন তিনি। নাইলোমিটারে তাদের হিসেব কষতে আদেশ দিলেন।
ইনটেফের দাস থাকার সময়ে আমি জলের পরিমাপে অংশ নিতাম। বিশাল, বর্ণাঢ্য দলে আমার মতো দাস নেই একজনও; কিন্তু কজনের কাছেই বা আছে প্রশংসার স্বর্ণ-শেকল এই ভেবে নিজেকে সান্ত্বনা দিলাম। আমাকে অবশ্য উপযুক্ত সম্মান প্রদর্শন করলো অন্যান্যরা। ওরা জানে আমার ক্ষমতার কথা, আগে এই কাজ করেছে আমার সাথে। নদীর প্রবাহ পরিমাপের জন্যে নাইলোমিটারের নকশা আমিই করেছি, যে ভবনে তারা কাজ করেন–সেটির নকশাও আমারই করা। যুক্তিগ্রাহ্য অনুমাণ থেকে বন্যার পানির সম্ভাব্য উচ্চতা এবং আয়তন নির্ণয়ের সূত্রও আমার তৈরি।
প্রচুর সাবধানতার সঙ্গে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ মাপ নিলাম আমরা। আগামী পাঁচদিন পালাক্রমে নদীর পানির উচ্চতা এবং সময়ের হিসাব কষে জল-ঘড়ির সাথে মিলিয়ে দেখা হবে। পানির নমুনা থেকে জানা যাবে, কী পরিমাণ পলি আছে ওতে; এ সমস্তই চূড়ান্ত হিসেবে যোগ হবে।
পাঁচদিনের উপযুপরি পরিদর্শন শেষ হতে আরো তিনদিনের জন্যে হিসাব কষতে বসলাম আমরা। অনেকগুলো প্যাপিরাসের স্ক্রোল লাগলো তাতে। শেষমেষ, রাজার কাছে প্রদর্শনের জন্যে চূড়ান্ত হলো হিসাব । রাজকীয় সভাষদসহ মন্দিরে এলেন ফারাও, সাথে এলো অর্ধেক দ্বীপবাসী।
