দাস টাইটা, আমার জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে তুমি ছায়া হয়ে পাশে থেকেছে। তুমিই ছিলে আমার অভিভাবক, তুমিই আমার শিক্ষক। আমি লিখতে-পড়তে শিখেছি তোমার কাছে। নক্ষত্ররাজীর রহস্য থেকে শুরু করে শিল্পকলা সবকিছু তুমিই শিখিয়েছো। কেমন করে সুখ আর পরিতৃপ্তি খুঁজে পেতে হয়, এ আমি তোমার কাছে। শিখেছি। আমি কৃতজ্ঞ।
আবারো উসখুস করতে শুরু করে দিলো রাজ-বধূরা; জীবনেও কোনো দাসের জন্যে এতো প্রশংসা বাণী কেউ কখনো শুনে নি।
খামসিন-এর দিনে আমার জন্যে এমন কিছু করেছো তুমি, এর প্রতিদান দেওয়া তো আমার সাধ্যে নেই–তবে পুরস্কার দিতেই পারি। ফারাও তোমাকে প্রশংসার স্বর্ণ শেকলে ভূষিত করেছেন। আমিও তোমাকে কিছু দিতে চাই।
লম্বা আল্লাখল্লার মতো পোশাকের আড়াল থেকে রঙিন সুতায় কারুকাজ করা একটা প্যাপিরাস-স্ক্রোল বের করে লসট্রিস। একজন দাস হিসেবে তুমি আমার সামনে কুর্নিশ করেছে, এবারে মুক্ত একজন মানুষ হিসেবে উঠে দাঁড়াও! প্যাপিরাসের গুটানো কাগজটা আমার উদ্দেশ্যে বাড়িয়ে ধরে সে। রাজ্যের আইনজ্ঞদের তৈরি প্রত্যয়ন পত্র এটা। আজ থেকে তুমি মুক্ত।
প্রথমবারের মতো মাথা উঁচালাম আমি, চোখে অবিশ্বাস নিয়ে লসট্রিসের দিকে তাকিয়ে রইলাম। আমার বিবশ আঙুলে প্যাপিরাসের স্ক্রোলটা হস্তান্তর করলো সে, ঠোঁটে পরিতৃপ্তির হাসি।
অবাক হয়েছে, তাই না? মুখ দিয়ে কোনো কথা সরছে না? কিছু অন্তত বলো, টাইটা। বলো, কতোটা সুখী হয়েছো তুমি এই পুরস্কারে?
যেনো বিষমাখা তীরের মতো ওর প্রতিটি শব্দ আঘাত করলো আমাকে। মুখের ভেতর পাথরের মতো ভারী হয়ে গেছে জীভ। মুক্ত একজন মানুষ হলে, চিরদিনের জন্যে লসট্রিসের সঙ্গ হারাতে হবে আমাকে। আর কখনো ওর খাবার প্রস্তুত করতে পারবো না, তদারকি করতে পারবো না স্নানের । ঘুমানোর সময় হলে আর কখনো ওর গায়ের উপর চাদর টেনে দিতে পারবো না। প্রতিদিন ভোর হলে, যখন ওই গাঢ়-সবুজ চোখদুটি প্রথমবারের মতো খুলবে সে–আমি দেখবো না। কোনোদিনও আর গাইবো ওর সঙ্গে, খাবার পাত্র এগিয়ে দেবো না; সাহায্য করবো না পোশাক পরতে।
বজ্রাহত, নিপ্রাণ চোখে অসহায়ের মতো লসট্রিসের দিকে চেয়ে রইলাম।
খুশি হও, টাইটা, যেনো আমাকে আদেশ করলো মিসট্রেস। নতুন এই স্বাধীনতা, যা আমি তোমাকে দিলাম–অমূল্য নয় কি?
আর কোনোদিনও সুখী হতে পারবো না আমি, কান্না রুদ্ধ স্বরে বলে উঠলাম। তুমি আমাকে দূরে ঠেলে দিলে, মিসট্রেস। কেমন করে সুখী হবো, বলো?
নিমিষে হাসি মুছে গেলো লসট্রিসের, দ্বিধান্বিত চোখে আমার দিকে চাইলো সে। আমার ক্ষমতার মধ্যে সবচেয়ে মূল্যবান উপহার তোমাকে দিয়েছি-স্বাধীনতা দিয়েছি আমি তোমাকে।
মাথা নাড়লাম। সবচেয়ে খারাপ শাস্তি দিলে তুমি। আমাকে দূরে সরিয়ে দিলে তোমার কাছ থেকে। সুখ কী বস্তু–এ আমি কোনোদিনও আর জানবো না।
কিন্তু, এটা কোনো শাস্তি নয়, টাইটা। এ যে তোমার পুরস্কার। কেনো বুঝছো না?
একমাত্র পুরস্কার যা আমার কাছে মূল্যবান, তা হলো, চিরকাল তোমার পাশে থেকে সেবা করা। ভেতর থেকে যেনো কান্না উথলে উঠলো, অনেক কষ্টে আঁকাতে চাইলাম। দয়া করো, মিসট্রেস। আমাকে ক্ষমা করো। তোমার থেকে দূরে সরিয়ে দিয়ো না। যদি সত্যিই কিছু দিতে চাও, তোমার পাশে থাকতে দাও আমাকে।
কেঁদো না, লসট্রিস আদেশ করে। না হলে, সমস্ত অতিথিদের সামনে আমিও কেঁদে ফেলবো। আমার ধারণা, ততক্ষণ পর্যন্ত তার উপহারের প্রকৃতি অনুধাবন করতে পারে নি লসট্রিস স্বয়ং। চোখের পাতা উপচে অশ্রু গড়িয়ে পড়লো আমার গাল বেয়ে।
থামো! আমি–আমি এমন কিছু চাই নি। অঝোরে কাঁদতে শুরু করলো লসট্রিসও। আমি তোমাকে সম্মানিত করতে চাইছিলাম–ঠিক রাজা যেমন করেছেন।
টানো প্যাপিরাসটা বাড়িয়ে ধরলাম ওর দিকে। দয়া করে এই কাগজ ছিঁড়ে ফেলার অনুমতি দাও আমাকে। আবার তোমার সেবায় ডেকে নাও আমাকে! তোমার পেছনে–যেটা আমার উপযুক্ত স্থান দাঁড়ানোর অনুমতি দাও।
থামো, টাইটা! তুমি কষ্ট দিচ্ছো আমাকে! জোর করে কান্না গিলে ফেলতে চাইলো সে, কিন্তু আমি নির্দয়ের মতো বলে চললাম ।
তোমার কাছে একটা উপহারই চাই আমি–জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তোমার সেবা করার সুযোগ চাই। শোনো মিসট্রেস, অনুমতি দাও–এ কাগজ ছিঁড়ে ফেলি।
ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে মাথা ঝাঁকালোলসট্রিস। বাচ্চা বয়সে পড়ে গিয়ে হাঁটু ছিলে ফেললে এমন করে কাঁদতো ও। একটানে প্যাপিরাসের স্ক্রোলটা ছিঁড়ে ফেললাম আমি; তারপর আবার; আবার। যেনো এতে সন্তুষ্ট না হয়ে, বাতির শিখায় ওগুলোকে পুড়িয়ে কালো করে ফেললাম।
প্রতিজ্ঞা করো–আর কোনোদিন আমাকে তোমার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দিতে চাইবে না।
শপথ করো–কখনো আমাকে স্বাধীনতা চাপিয়ে দিতে চাইবে না।
কান্নার ভেতর মাথা নেড়ে সায় দিলো সে। কিন্তু আমি জোর করলাম।
বলো, জোরে বলো, যেনো সবাই শুনতে পায়।
তোমাকে আমার দাস হিসেবে রাখবো আমি, কখনো কোনোদিনও বিক্রি বা মুক্ত করে দেবো না। কান্নায় ভারী কণ্ঠে বললো মিসট্রেস। এরপর, সবুজ চোখ-দুটো থেকে দুষ্টুমীর ছটা বেরুলো। অবশ্য, যদি–আমার কথা না শোনো সাথে সাথে আইন লেখকদের ডেকে পাঠাবো! এক হাতে ধরে আমাকে দাঁড় করিয়ে দিলো সে। উঠে দাঁড়াও কাঁদুনে ব্যাটা। নিজের কাজ করো। আমার পাত্র খালি হয়ে গেছে।
