যখনই এমনটা করছিলো লসট্রিস, কথা বন্ধ করে ফেলছিলো ট্যানাস। হারিয়ে যাচ্ছিলো ওর গাঢ়-সবুজ চোখে। শেষমেষ, ডেকে বাস্তবে ফিরিয়ে আনতে হলো ওকে। এহেন আহ্বাদের সামনে আমার নিজস্ব অনুভূতিগুলো নিতান্তই খেলো মনে হলো, জোর করে ওদের আনন্দে শরিক হতে নিজেকে বাধ্য করলাম।
বেশ অনেকটা সময় লেগে গেলো কথা শেষ হতে। অবশেষে ট্যানাসকে বিদায় জানিয়ে আলিঙ্গন করলাম আমি, খচ্চরটা টেনে নিয়ে বাইরের মরুতে বেরিয়ে এলাম। মিহি বালুকণা এখনো বাতাসে ভাসছে। লসট্রিস থেমে দাঁড়াতে, নিচের উপত্যকায় নেমে ওর অপেক্ষায় রইলাম আমি।
পেছনে তাকাতে ওদের দু জনকে সুড়ঙ্গ-মুখ থেকে বেরিয়ে আসতে দেখলাম। বেশ ক মুহূর্ত পরস্পরের চোখে চোখে চেয়ে রইলো ওরা, স্পর্শ করলো না। এরপর একটি কথাও না বলে ঘুরে, হনহন করে হেঁটে চলে গেলো ট্যানাস। দৃষ্টিসীমায় ও থাকা পর্যন্ত সেদিকে চেয়ে রইলো আমার কী, তারপর নিচে নেমে এলো। যেনো স্বপ্নের ঘোরে আছে এখনো।
ওকে খচ্চরের পিঠে চড়তে সাহায্য করলাম, দড়িগুলো আঁটো করছি যখন; একটু ঝুঁকে আমার হাত নিজের হাতে নিলো লসট্রিস। ধন্যবাদ, টাইটা।
কৃতজ্ঞতা প্রকাশের কোনো প্রয়োজন নেই, জানালাম ওকে।
পুরো পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ আমি এখন। ভালোবাসা সম্পর্কে তোমার প্রতিটি কথা সত্যি। আমার সাথে একটু আনন্দ করো, যদিও আমি জানি– এই পর্যায়ে এসে থেমে গেলো সে। হঠাৎই বুঝতে পারলাম, আমার ভেতরের অনুভূতিগুলো ওর অজানা নয়। এতে আনন্দের মাঝেও আমার দুঃখ তাকে ছুঁয়েছে। সেই মুহূর্তে ওকে যতোটা ভালোবেসেছিলাম, জানি, সারা জীবনেও অতোটা বাসি নি।
খচ্চরের লাগাম হাতে নিয়ে নীল নদের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম আমি।
*
উঁচু একটা পাহাড়ের উপর থেকে আমাদের সনাক্ত করলো একজন রাজ-শিকারী । দ্রুত ধেয়ে এলো সে।
রাজা নির্দেশে আপনাদের খুঁজছি আমরা, হাঁপাতে হাঁপাতে বললো সে।
উনি অক্ষত আছেন? জানতে চাইলাম আমি।
গজ-দ্বীপের প্রাসাদে নিরাপদে আছেন তিনি। আমাদের উপর নির্দেশ আছে, কর্ত্রী লসট্রিসকে খুঁজে পাওয়া মাত্র তার কাছে নিয়ে যেতে হবে।
প্রাসাদের ঘাটে যখন পা ফেললাম আমরা, দেখি, আতন দাঁড়িয়ে ওখানে; থেকে থেকে প্রসাধন-চর্চিত গাল ফোলাচ্ছে অভিমানের আতিশায্যে। ঝড়ে মারা-পড়া তেইশজনের লাশ পাওয়া গেছে, স্বস্তির সাথে আমাদের জানালো সে। সবাই নিশ্চিত ছিলো, তোমরাও মরে গেছে। কিন্তু, আমি প্রার্থনা করেছি হাপির কাছে, যেনো নিরাপদে ফিরে আসো তোমরা। কেবল গা ধোয়া-মোছা আর সামান্য সুগন্ধি তেল মাখবার সময় পাওয়া গেলো। এরপরই, আমাদেরকে রাজ-দরবারে নিয়ে গেলো আতন।
মিসট্রেসের প্রত্যাবর্তনে সত্যিই আলোড়িত হলেন ফারাও। ঠিক অন্য সবার মতোই লসট্রিসকে ভালোবেসে ফেলেছেন উনি, সেটা কেবল এ জন্যে নয় যে তার অমরত্বের চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে ওর গর্ভে। তাঁর সামনে যখন ঝুঁকে কুর্নিশ করছিলো লসট্রিস, ভিজে উঠলো রাজার চোখ।
ভেবেছিলাম, তোমাকে হারিয়েছি আমি, ধরা গলায় বললেন ফারাও। রাজকীয় আভিজাত্য অনুমতি দিলে হয়তো আলিঙ্গনই করতেন লসট্রিসকে। কিন্তু এখন দেখছি, আগের চাইতে অনেক বেশি সৌন্দৰ্য্য আর প্রাণশক্তি নিয়ে ফিরে এসেছে। একদম সত্যি কথা। ভালোবাসার অমূল্য মুহূর্তগুলো বিশেষ জাদু দিয়েছে লসট্রিসের অবয়বে।
টাইটা বাঁচিয়েছে আমাকে, ফারাওকে বললো মিসট্রেস। পথ দেখিয়ে একটা আশ্রয়ে নিয়ে ভয়ঙ্কর বিপদের হাত থেকে বাঁচিয়েছে। ও না থাকলে, অন্য অনেকের মতো মরে পরে থাকতাম।
সত্যি, টাইটা? সরাসরি জানতে চাইলেন ফারাও। বিনয়ী ভঙ্গিতে বিড়বিড় করে বললাম, আমি তো কেবল উছিলা, এ যে দেবতাদের কৃপা।
হাসলেন ফারাও। জানি, আমাকেও অত্যন্ত পছন্দ করেন তিনি। তুমি বহুভাবে আমাদের সেবা দিয়েছে, হে দেবতাদের উছিলা! কিন্তু আজ যা করেছে, তার কোনো তুলনা হয় না। সামনে এসে দাঁড়াও! তাঁর নির্দেশে সামনে গিয়ে হাঁটু গেড়ে দাঁড়ালাম।
আমার পাশে দাঁড়িয়ে ছোট্ট সিডার কাঠের একটা বাক্স খুললো আতন। ভেতর থেকে স্বর্ণের একটা হার বের করলেন ফারাও। বিশুদ্ধ, অমিশ্রিত স্বর্ণ আছে ওতে । রাজ-স্বর্ণকারের প্রতীক অঙ্কিত, কম করে হলেও বিশ ডেবে হবে ওটার ওজন।
আমার গলায় হারটা পড়িয়ে দিয়ে রাজা বলে উঠলেন, তোমাকে প্রশংসার স্বর্ণ শেকল উপহার হিসেবে দিলাম আমি। এ হলো রাজ্যের শ্রেষ্ঠতম সম্মান, শুধুমাত্র সামরিক ব্যক্তিত্ব অথবা কূটনীতিকদের জন্যে বরাদ্দ করা হয়; অথবা রাজ-উজিরের মতো উচ্চ-পদস্থ লোকেদের ভাগ্যে জোটে। আমাদের এই মিশরের ইতিহাসে কখনো, কোনো দাসের গলায় ওটা শোভা পায় নি।
কিন্তু সেদিনে এ-ই আমার পুরুষ্কারের শেষ নয়। তখনো আমার কর্ত্রীর উপহার বাকি আছে। সেই সন্ধাতে, যখন ওর গোসল তদারকি করছিলাম, হঠাৎই সমস্ত দাসীদের তাড়িয়ে দিলো লসট্রিস। আমার সামনে সম্পূর্ণ নগ্ন দাঁড়িয়ে বললো, আমাকে পোশাক পরতে সাহায্য করো না, টাইটা। ও জানে, কতোটা উপভোগ করি আমি কাজটা।
তলপেটের গোড়ায় কোঁকড়া চুলগুলো যেনো ঝকমক করছে। মনে হলো, ট্যানাসের সঙ্গে দিনগুলো ওর সৌন্দৰ্য্যকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। ভেতর থেকে ঠিকরে বেরুচ্ছে রূপ-ছটা। লসট্রিস যেনো জ্বলছে রূপের আগুনে।
