এরপর, আচমকাই বুঝতে পারলাম, দৈত্যটার কোনো পাখা নেই; লম্বা পশমী টুপির প্রান্ত ওগুলো, বেদুঈনের পোশাক–বাতাসে উড়ছে। আতঙ্কে বিবশ; আমাদের চোখের সামনে দুই হাত উঠিয়ে মাথা থেকে মুখোশ খুলে ফেললো ওটা, ঠিক ঈগলের ঠোঁটের মতো আকৃতি আচ্ছাদনটার। মাথা ঝাড়া দিতেই একরাশ লাল-সোনালি চুল ছড়িয়ে পড়লো চওড়া দুই কাঁধে।
চড়াই-এর উপর থেকে ঝড়ের মধ্যে তোমাদের দেখেছি আমি, চিরপরিচিত স্বরে বলে উঠলো মানুষটা।
আবারো চেঁচালো লসট্রিস, এবারে বন্য-আনন্দের চিৎকার। ট্যানাস!
যেনো উড়ে গিয়ে ট্যানাসের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়লো ও। ঠিক বাচ্চা মেয়েদের মতোই কোলে তুলে নিলো ট্যানাস ওকে। ছটফট করে আলিঙ্গন ছাড়ালো লসট্রিস, পাগলের মতো খুঁজে ফিরছে প্রেমিকের ঠোঁট। আবেগের তীব্রতায় যেনো পরস্পরকে পিষে ফেলবে ওরা।
ছায়া ঘেরা সমাধি-প্রকোষ্ঠে নীরবে দাঁড়িয়ে রইলাম আমি। যদিও এই যুগলকে একত্র করার জন্যে সমস্ত ষড়যন্ত্রের মূলে ছিলাম আমি স্বয়ং; আজ, ওদের মিলনের দিনে কী অনুভূতি আমাকে তাড়া করে ফিরছিলো, তা লিখবো না বলে ঠিক করেছি। আমি বিশ্বাস করি, ঈর্ষা হলো আমাদের সবচাইতে খারাপ রীপু, কিন্তু এ-ও তো সত্যি, আমি ভালোবাসি লসট্রিসকে, ঠিক যেমন ট্যানাস ভালোবাসে ওকে। এ ভালোবাসা ভ্রাতৃসুলভ অথবা পিতৃসুলভ বাৎসল্য নয়। হতে পারে আমি অপুরুষ, একজন সাধারণ স্বাভাবিক মানুষের মতোই আমি কামনা করি ওকে। কোনো মানে হয় না। আমি জানি। হয়তো এ জন্যেই বড়ো তিক্ত এই অনুভূতি। ওখানে দাঁড়িয়ে ওদের দেখা সম্ভব ছিলো না আমার পক্ষে; মার-খাওয়া কুকুরের মতোই পিছিয়ে যেতে লাগলাম। কিন্তু ট্যানাস দেখে ফেললো আমাকে। আমার হৃদয় বিদীর্ণ করা চুমুটা ভেঙে, লসট্রিসের ঠোঁট থেকে নিজের ঠোঁট সরিয়ে নিলো সে।
টাইটা, রাজার পত্নীর সাথে একা ছেড়ে যেও না আমাকে। এখানেই থাকো। প্রলোভন থেকে বাঁচাও আমাদের। নিজের উপর কোনো আস্থা নেই আমার, জানি না কখন অপমান করে ফেলবো নিজেকেই। দেখো, আমি যেনো রাজ-পত্নীর কোনো অসম্মান না করি।
ভাগো, চিৎকার করে বলে উঠলো লসট্রিস, ট্যানাসের বাহুবন্ধনে। একা থাকতে দাও আমাদের। কোনো সম্মান-অসম্মান নিয়ে ভাবতে চাই না আমি। বহুদিন থেকে অপেক্ষা করে আছি, আমাদের ভালোবাসা অপেক্ষা করে আছে। কবে, কখন ইন্দ্রজাল সত্যি হবে এই আশায় বসে থাকতে পারবো না। আমাদেরকে একা থাকতে দাও, প্রিয় টাইটা।
সমাধি-প্রকোষ্ঠ থেকে পালিয়ে এলাম, যেনো আমার জীবন বিপন্ন হতো তা না হলে। আর একটু হলেই ঝড়ের মধ্যে বাইরে বেরিয়ে গিয়ে প্রাণ হারাতাম। হয়তো, সেটাই ঠিক হতো। কিন্তু কাপুরুষ যে আমি ঠিক ঠিক রয়ে গেলাম প্রবেশমুখের কাছে। সুড়ঙ্গের এক কোণায় বয়ে নিলাম নিজেকে। এখন আর বাতাসের গর্জন শুনছি না। মাথার উপর পশমী চাদরটা দিয়ে ঘিরে চোখ-কান বন্ধ রাখতে চাইলাম। কিন্তু, ঝড়ের উন্মত্ততা সত্ত্বেও সমাধি-প্রকোষ্ঠ থেকে ভেসে আসা অস্ফুট ধ্বনি পরিষ্কার পৌঁছুলো আমার কাছে।
সমস্ত হিংস্রতা নিয়ে একটানা দুই দিন বয়ে গেলো সেই ঝড়। জোর করে নিজেকে ঘুমাতে বাধ্য করেছিলাম আমি, কিন্তু যখনই জেগে বসে থাকতাম ওদের দুজনের প্রেম-মত্ত শীকার আমাকে নির্যাতন করতো। কী আশ্চৰ্য্য, রাজার শয্যায় কখনো এমন করে নি লসট্রিস; অবশ্য ওই বুড়ো মানুষটার শরীর নিঃসন্দেহে ওর উপযোগী নয়।
অদ্ভুত যন্ত্রণার এক জগতের বাসিন্দা হয়ে রইলাম আমি। ওদের চিৎকার, গোঙানো আর ফিসফিস আলাপন এঁফোড়-ওফোঁড় করে ফেললো আমার হৃদয়। নারী কণ্ঠের ছন্দোবদ্ধ শীকার, কাতর ধ্বনি আমাকে ধ্বংস করে দিতে চাইলো। খোঁজা-করা ছুরির চাইতেও বেশি বেদনাপূর্ণ ছিলো পুলকের শিখড়ে পৌঁছা লসট্রিসের আর্তনাদ।
শেষমেষ, ধরে এলো বাতাস। এখন আর গর্জন নয়, পাহাড়ের গায়ে লেগে মৃদু গোঙাতে লাগলো। ধীরে, আলো বাড়লো । ট্রাস-এর গোরস্থানে আমাদের আশ্রয়ের তিন দিন পেরিয়ে গেছে। উঠে দাঁড়িয়ে ওদের দুজনকে ডাকলাম আমি। ভয়ে সমাধি প্রকোষ্ঠে ঢুকলাম না–পাছে কি না কি দেখতে হয়। বেশ কিছুক্ষণ কোনো উত্তর পেলাম না; এরপর ভাঙা ভাঙা, ভারী কণ্ঠে আমার কী জানতে চাইলো, ওটা কী তুমি, টাইটা? আমি তো ভেবেছিলাম, মরে গিয়ে স্বর্গে পৌঁছে গেছি!
*
ঝড় থেমে গেছে, কাজেই আর বেশি সময় নেই আমাদের হাতে। নিশ্চই ইতিমধ্যে রাজ-শিকারীরা আমাদের খোঁজে বেরিয়ে পড়েছে। ঝড়ের কারণে অনুপস্থিতির একটা অজুহাত মিলে গেলো। আমার ধারণা, ঝড়ের কবল থেকে বেঁচে যাওয়া দলটা এলোমেলো ভাবে ছড়িয়ে পড়েছে উপত্যকায়। কিন্তু ট্যানাসের সঙ্গে আমাদের কেউ দেখে ফেললে বিপদ হবে।
ওদিকে, এই ক দিনে খুব কমই বাক্য বিনিময় করেছি আমি আর ট্যানাস। অনেক ব্যাপারে আলাপ করবার আছে। সুড়ঙ্গের প্রবেশমুখে দাঁড়িয়ে পরিকল্পনা সাজিয়ে নিলাম আমরা।
বেশ শান্ত-সৌম্য হয়ে গেছে লসট্রিস, কখনো এমন দেখি নি ওকে। মোটেও বকবক করছে না, নীরবে ট্যানাসের পাশে দাঁড়িয়ে অপলকে চেয়ে চেয়ে দেখছে ওকে। দেবতার মূর্তির সামনে দাঁড়ানো একজন মহিলা-পুরোহিতের কথা মনে করিয়ে দিলো ও আমায়। এক মুহূর্তের জন্যেও ট্যানাসের মুখ থেকে সরলো না তার দৃষ্টি, মাঝে-মধ্যেই ছুঁয়ে দেখছে যেনো নিশ্চিত হতে চাইছে ট্যানাস আছে ওর সম্মুখে।
