আরো একটা পাথুরে গা টপকে এলাম আমরা। এখন গ্যাজেল উপত্যকার থেকে বেশ নিরাপদ দূরত্বে চলে এসেছি; খচ্চর ঘুরিয়ে নিয়ে সোজা ট্রাস-এর গোরস্থানের দিকে চললাম। স্থির, ভীষণ গরম বাতাস; খচ্চরের খুড় মাটিতে লেগে ঠিক কাঁচ ভাঙার মতো শব্দ করছে। ঘামে ভিজে চটচটে হয়ে গেছে আমার পিঠ; বাতাস থমথমে নির্ঘাত বড়ো একটা ঝড় আসছে। সমাধিগুলোর কাছে পৌঁছার বেশ আগেই লসট্রিসকে জানালাম, বাতাস একেবারে মরা হাড়ের মতো শুষ্ক। কিছুটা পানি খেয়ে নিলে ভালো করতে–
আরে, রাখো তো! পরে অনেক সময় পাবে পেট ভরে পানি খাওয়ার জন্যে।
আমি শুধু তোমার কথা ভাবছিলাম, মিসট্রেস। প্রতিবাদ করে বললাম।
দেরি করা ঠিক হবে না। যতোটা সময় এখানে নষ্ট হবে, ট্যানাসের সঙ্গে থাকার সময়ও কমে যাবে। ঠিকই বলেছে লসট্রিস। কিছু সময়ের মধ্যেই আমাদের খোঁজ পড়ে যাবে ক্যাম্পে। আমার কর্ত্রী জনপ্রিয়তা এতো বেশি, শিকার শেষ হতে না হতেই ওর সঙ্গ পাওয়ার জন্যে উন্মুখ হয়ে পড়বে মহৎ প্রভু, সভাষদ।
পাহাড়ের খাড়া গায়ের যতো কাছাকাছি চলে আসছি আমরা, উত্তেজনা বাড়ছে লসট্রিসের; শেষমেষ খচ্চরের পিঠ থেকে নেমে দৌড়ে চড়াইয়ে উঠলো ও। ওই তো! ওখানেই আমার অপেক্ষায় থাকবে ও। চিৎকার করে সামনে দেখালো মিসট্রেস।
ঠিক তখনই, নেকড়ের গর্জনের মতো ধেয়ে এলো বাতাস; পাহাড়ের দেওয়ালে লেগে চাপা-স্বরে গুমগুম করছে। পতপত করে উড়তে লাগলো মিসট্রেসের চুল, মাথা মুখের চারপাশে জড়িয়ে যাচ্ছে। আঁটো জামাটা উঠে যেতে দৃশ্যমান হলো ওর মসৃণ, বাদামি উরু; হেসে উঠে বাতাসে হাত বোলালো লসট্রিস-যেনো প্রেমিকের সাথে খেলছে। ওর এই আনন্দে অবশ্য আমি শরিক হতে পারলাম না।
পেছনে তাকিয়ে, সেই সাহারা থেকে ধেয়ে আসা ঝড়টা দেখলাম। উঁচু, হলদেটে অবয়ব; পাক খেয়ে উঠছে বাতাস। প্রবাহিত বালুকণা দারুন আঘাত করছে পায়ে; খচ্চরের দড়ি হাতে দৌড়ে আড়াল নিতে ছুটলাম। পিঠে বাতাসের প্রচণ্ড ধাক্কায় আর একটু হলেই হুমড়ি খেয়ে পড়েছিলাম, সামলে নিয়ে চিৎকার করে ডাকলাম লসট্রিসকে।
তাড়াতাড়ি ছুটতে হবে, বাতাসের গর্জন ছাপিয়ে বললাম ওকে। গোরস্থানের আশ্রয় পেতে হবে, ঝড় আসার আগেই!
বিশাল বালির মেঘ আড়াল করে ফেললো সূর্য, দৃষ্টিসীমা খুবই কম এখন। স্নান, ঘোলাটে সূর্যের নিচে পুরো পৃথিবী যেনো ছায়াঘেরা। উন্মুক্ত হাত-পা, ঘাড়ে আঘাত হানছে ছুটে আসা বালুকণা। আমার গায়ের শাল খুলে মিসট্রেসের মুখ-মাথায় জড়িয়ে দিলাম, হাত ধরে টেনে নিয়ে চলেছি ওকে।
বালুর পুরু পর্দা আমাদের চারপাশ ঘিরে আছে, ভয় হলো, শেষমেষ না পথ হারাই। হঠাৎই, সামনের বালুর পর্দায় একটা ফুটো তৈরি হলো; ঠিক সামনেই একটা সমাধির কালো ছোট্ট মুখ দেখতে পেলাম। এক হাতে লসট্রিস, অপর হাতে খচ্চরটা টেনে নিয়ে সমাধির আশ্রয়ে ছুটলাম। শক্ত পাথর খুঁজে তৈরি করা হয়েছিলো সমাধির প্রবেশমুখ, ওটা ধরে একেবারে পাহাড়ের পেটে চলে এলাম আমরা। এরপর হঠাৎ বাঁক নিয়েছে পথটা, চলে এসেছে শতাব্দী প্রাচীন মমি-রাখার স্থানে। বহু বছর আগেই সমাধি চোরেরা নিয়ে গেছে শবদেহ আর সমাধি-সম্পদ। কেবল ঝাপসা হয়ে আসা দেয়ালচিত্র গুলো রয়েছে এখন দেব-দেবী আর দৈত্য-দানোর ছবি।
পাথুরে দেওয়ালে হেলান দিয়ে বসে পড়লো লসট্রিস, তার প্রথম চিন্তা ছিলো প্রেমিকের জন্যে। এখন আর কিছুতেই আমাদের খুঁজে পাবে না ট্যানাস। খচ্চরটার পিঠ থেকে মালপত্র নামিয়ে রাখলাম আমি। এক পাত্র পানি খাওয়ালাম ওকে।
বাকিদের ভাগ্যে কি ঘটবে, টাইটা? রাজা, সভাষদ? পানিতে চুমুক দেওয়ার ফাঁকে জানতে চাইলো লসট্রিস।
ওদের দেখভালের জন্যে শিকারীরা আছে। বললাম ওকে। তারা মরুকে হাতের উল্টো পিঠের মতোই চেনে। কেবল ঝড়ের পূর্বাভাস পায় নি, দুঃখের সাথে ভাবলাম । লসট্রিসকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্যে বলেছি কথাটা, আসলে ক্যাম্পের নারী এবং শিশুদের খুবই কষ্ট হবে এই ঝড়ে।
আর ট্যানাস? ওর কি হবে?
ট্যানাস ভালো করেই জানে, কী করতে হয় এমন অবস্থায়। ও হলো ঠিক বেদুঈনের মতো। নিশ্চিত থাকো, ঝড় ওর কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।
আমরা কখনো নদীর ধারে ফিরতে পারবে তো? ক্যাম্পের ওরা আমাদের খুঁজে পাবে এখানে? শেষমেষ, নিজের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত হলো মিসট্রেস।
আমরা এখানে নিরাপদ। বেশ ক দিন চলার মতো পানি আছে সঙ্গে। ঝড় থেমে গেলে, ফিরে যাবো। পানি এই মুহূর্তে মহা-মূল্যবান, ক দিন এখানে থাকতে হয় তার কোনো ঠিক নেই। পানির থলেটা খচ্চরের নাগালের বাইরে নিয়ে রাখলাম। ভীষণ অন্ধকার এখানে। বাক্স-পেটরা খুলে বাতি ধরালাম, হলদেটে আলো প্রাচীন সমাধিগুলোয় পরে অপার্থিব আলো ছড়াতে লাগলো।
লসট্রিসের দিকে পেছন ফিরে বাতি ধরাচ্ছিলাম, হঠাৎ ওর চিৎকারে চমকে গেলাম। এতো তীক্ষ্ণ, আতঙ্কিত স্বরে চেঁচিয়ে উঠেছিলো ও, শরীরের রক্ত যেনো জমে গেলো আমার। ঝট করে কোমড়ে গোঁজা ছোরাটা হাতে নিয়ে সমাধি-সুড়ঙ্গের প্রবেশপথে তাকিয়ে দেখি, বিশাল এক দৈত্যাকার অবয়ব প্রবেশমুখ আড়াল করে ফেলেছে। নড়তেও যেনো ভুলে গেছি। এমন আকারের বিরুদ্ধে ছুরি কোনো অস্ত্রই নয়।
বাতির ম্লান আলোয় ভাঙা-ভাঙা ভূতুড়ে দেখাচ্ছে বিশাল শরীরটা। মনে হলো, হয়তো মানুষেরই অবয়ব কিন্তু এতো লম্বা, বিশাল আকার কোনো মানুষের হতে পারে না। কুমীর সদৃশ মাথা, কোনো সন্দেহ নেই এ হলো অন্ধকার জগতের দৈত্য, যে মৃত মানুষের হৃদপিণ্ড খুবলে খায়। সরীসৃপের মতো আঁশ রয়েছে মাথায়; বাঁকানো ঠোঁটটা ঠিক ঈগলের মতো। গভীর গর্তের মতো চোখ দুটো দৃষ্টিহীন। কাঁধ থেকে বেরিয়ে এসেছে বিশাল পাখা। চরম আতঙ্ক নিয়ে ভাবলাম, এখনই ওই পাখায় ভর করে উড়ে এসে আমার কত্রর উপর চড়াও হবে ওটা। সমানে চেঁচিয়ে চলেছে লসট্রিস, উবু হয়ে বসে আছে দৈত্যটার পায়ের কাছে।
