অনেক গাছও আছে, মিসট্রেস, বললাম ওকে। ও হেসে আমার কথা উড়িয়ে দিতে পাথুরে মাটি থেকে টেনে তুলে দেখলাম অদ্ভুত লতাগুলো।
ওগুলো পাথর, মানতে চাইলো না লসট্রিস, যতক্ষণ পর্যন্ত না হাতে নিয়ে গুঁড়ো করে ফেললো কতোগুলো। আঠার মতো ভারী তরল ওর হাত বেয়ে গড়িয়ে পড়তে দেবতাদের ধূর্ততায় মুগ্ধ হয়ে গেলো সে। তো, এগুলো খেয়ে বাঁচে গ্যাজেল? কী অদ্ভুত।
শিকার শুরু হতে সেদিকে মনোযোগ ফেরালাম আমরা। দুজন রাজ-শিকারী খাঁচার দরোজা খুলে দিতেই লাফিয়ে মাটিতে নেমে এলো চিতা দুটো। আমার ধারণা ছিলো, ছাড়া পেতেই পালিয়ে যেতে চাইবে ওগুলো, কিন্তু পোষা বেড়ালের মতোই শিকারীর পায়ে গা ঘষতে শুরু করে দিলো জানোয়ারগুলো। হিংস্র, উন্মত্ত কোনো আওয়াজ নয়, পাখির মতো নরম আওয়াজ বেরুচ্ছে গলা থেকে।
প্রখর রৌদ্রে পুড়তে থাকা বাদামি উপত্যকার দূর প্রান্তে তাড়ুয়াদের দেখা যাচ্ছে। প্রচণ্ড দাবদাহে ভাঙা ভাঙা দেখাচ্ছে তাদের অবয়ব। ধীরে, হরিণগুলোকে আমাদের দিকে তাড়িয়ে আছে তারা।
শিকারীদের সহ উপত্যকার ঢাল বেয়ে নিচে নামতে লাগলেন ফারাও। গলায় বেঁধে রাখা চামড়ার ফিতে দিয়ে চিতাগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করছে দু জন। বেশিরভাগ সভাষদসহ আমরা পাহাড়ের উপরেই রইলাম। ইতিমধ্যেই একে-অপরের সাথে বাজি ধরতে মেতে উঠেছে সবাই। শিকারের ফলাফল দেখতে আমার উৎসাহও কম নয়, কিন্তু মিসট্রেসের এ দিকে কোনো মন নেই।
কখন যাবো আমরা? ফিসফিস করে জানতে চাইলো সে। মরুতে পালাবো কখন?
শিকার শুরু হলে সবার চোখ থাকবে সেদিকে। এই সুযোগটাই নিতে হবে আমাদের। হঠাৎই নদী থেকে বয়ে আসা ঠাণ্ডা বাতাস থেমে গেলো একেবারে। মনে হলো, যেনো এই মাত্র চুল্লীর দরোজা খুলে দিয়েছে কোনো কামার। এতো গরম বাতাস–শ্বাস নেওয়া দায়।
আবারো, পশ্চিম দিগন্তে চোখ রাখলাম আমি। গন্ধকের বর্ণ ধারণ করেছে ওখানকার আকাশ। আমার দৃষ্টির সামনে যেনো পুরো দিগন্ত ছেয়ে গেলো সেই রঙে। দারুন অস্বস্তি বোধ হতে লাগলো। কিন্তু আমি ছাড়া ব্যাপারটা আর কেউ লক্ষ্য করেছে বলে মনে হলো না।
দারুণ সুন্দর চিতাগুলোকে দূর থেকে দেখছিলাম। তাড়িয়ে নিয়ে আসা গ্যাজেলের পালের গন্ধ পেয়ে গেছে ওরা, এখন আর শান্ত পোষ্য নয়, সত্যিকারের শিকারীর মতো ফুসতে শুরু করে দিয়েছে। মাথা উচানো, সতর্ক; কানগুলো খাড়া, চামড়ার ফিতের সাথে সেঁটে আছে। প্রায় অবতল পেট ভেতরের দিকে চুপসে ঢুকে গেছে, শরীরের প্রতিটি পেশি টানা-দেওয়া তারের মতো শক্ত।
আমার আঁটো-জামা ধরে অধৈৰ্য্য ভঙিতে টানলো মিসট্রেস, জরুরি তাগিদ দিতে লাগলো। চলো পালাই, টাইটা। নিরাসক্তভাবে কাছের এক সারি পাথর খণ্ডের আড়ালে সরে যেতে লাগলাম আমরা দু জন । এতে করে আমাদের প্রস্থান কারো দৃষ্টি আকর্ষণ করবে না। ভারবাহী জানোয়ারগুলোর পরিচর্যককে একটা রুপোর মুদ্রা ঘুষ দিয়ে খচর তৈরি রাখার ব্যবস্থা করে রেখেছিলাম। দৃষ্টিচক্ষুর অন্তরালে, পাথরের সারির ওপাশে এখন দাঁড়িয়ে ওটা। প্রথমেই পরীক্ষা করে দেখে নিলাম, আমার নির্দেশ মতো সবকিছু দেওয়া হয়েছে কিনা–পানির থলে এবং সামান্য খাবার। সব ঠিকঠাক রয়েছে।
শিকার দেখার প্রচণ্ড আগ্রহে শেষপর্যন্ত বলেই বসলাম লসট্রিসকে, আর কিছুক্ষণ অপেক্ষা করো না। ও কিছু বলার আগেই হাঁচড়ে-পাঁচড়ে পাথরের গা বেয়ে উঠে নিচের উপত্যকার দিকে তাকালাম।
সবেচেয়ে অগ্রবর্তী অ্যান্টিলোপ হরিণটা, ফারাও-এর হাতে চামড়ার ফিতেয় আঁকানো চিতা জোড়ার থেকে প্রায় একশ গজ দূরত্বে রয়েছে এখন। ঠিক যেনো মুহূর্তে আমি পাহাড়ের চূড়ায় উঠলাম, ওগুলোকে ছেড়ে দিলেন তিনি। সহজ, দ্রুত ভঙ্গিমায় ছুটলো ওগুলো, মাথা সোজা, যেনো হরিণের পালের থেকে শিকার পছন্দ করছে। ওদিকে, চিতার আগমন টের পেয়ে গেছে হরিণগুলো, সাথে সাথেই বিশৃঙ্খলভাবে ছুটতে শুরু করলো ওরা। ধূলি-ধূসর মরুর বুকে দিক-বিদিগ ছুটছে।
দীর্ঘ শরীর আরো লম্বা হতে লাগলো চিতাগুলোর; সামনের পা জোড়া দিয়ে নাগাল পেতে চাইছে হরিণের পালের; পেছনের পায়ের ঘায়ে যেনো ধূলিঝড় শুরু হলো। সর্বোচ্চ গতিতে এখন ছুটছে জানোয়ারগুলো। জীবনেও কোনো প্রাণীকে এতো দ্রুত ছুটতে দেখি নি আমি। এর তুলনায় হরিণের গতি কিছুই নয়। অনায়াসে, রাজকীয় হিংস্রতায় গ্যাজেলের পালের উপর চড়াও হলো ওরা। প্রথমটায় টপকে গেলো হরিণের পালটাকে, এরপর ধস্তাধস্তি রত দুটোকে নিয়ে মাটিতে আঁছড়ে পড়লো।
আতঙ্কে বিদিশা, ভয়াল আক্রমণ থেকে এদিক-ওদিক সরে গিয়ে বাঁচতে চাইলো হরিণগুলো। লাফিয়ে শূন্যে উঠলো, দিক বদল করলো বাতাসে থাকা অবস্থাতেই মোচড় খেয়ে, ভজ হয়ে আঁছড়ে পড়লো মাটিতে। প্রতিটি বাক, দিক বদল নিশ্চিন্ত, অনায়াস ভঙ্গিমায় অনুসরণ করলো চিতাগুলো। সমাপ্তি হলো একপেশে লড়াইয়ের। পিছলে, পাক-খেয়ে-উঠা ধোয়ার মেঘের আড়ালে একটি করে হরিণকে মাটিতে শুইয়ে দিলো রাজকীয় বিড়ালগুলো, শ্বাসনালী কামড়ে ধরে ছিঁড়ে ফেলছে; মৃত্যু-যন্ত্রণায় শূন্যে চার পা ছুঁড়লো শায়িত শিকার, ধীরে স্থির হয়ে এলো।
উত্তেজনায় টলোমলো, রীতিমতো শ্বাস রোধ হয়ে গেছে আমার। কর্ত্রীর কণ্ঠস্বরে চমক ভাঙলো। টাইটা! এক্ষুনি নিচে নেমে এসো! পিছলে নেমে এসে ওর পাশে দাঁড়ালাম। লসট্রিসকে খচ্চরের পিঠে ঠিকমতো বসিয়ে লাগাম ধরে নেমে এলাম বন্ধ্যা মাটিতে। পেছনের পাহাড়ের কারণে এখন আর আমাদের দেখতে পাবে না কেউ। বারবার তাগাদা দিতে লাগলো মিসট্রেস, ট্যানাসকে দেখার জন্যে তর সইছে না একেবারে।
