হুই! বুকের ভেতরটা যেনো কেঁপে উঠলো যখন ছেলেটার দুষ্টু হাসি চিনতে পারলাম। কী করছো এখানে? ওকে উত্তর দেওয়ার সময় না দিয়ে বলে চললাম, এখন আমাকে দূর থেকে অনুসরণ করো।
বন্দরের পেছনের কানাগলিতে ছোট্ট একটা ছাপড়ায় নিয়ে গেলাম ওকে। এখানে সাধারণত আমোদ-উল্লাসে মত্ত হয় জাহাজীরা। বড়ো একটা তামার আংটিতে ভাড়া চুকিয়ে হুইয়ের জামা ধরে টেনে ওকে ভেতরে ঢুকালাম।
তোমার মনিবের থেকে কী খবর এনেছো? জিজ্ঞেস করতেই মুচকি হাসলো হুই।
এতো শুকিয়ে আছে গলাটা, কথাই বলতে পারছি না, ইতিমধ্যেই নীল কুমির বাহিনীর যোগ্য সদস্যের মতো কথার কলা শিখে গেছে সে। চিৎকার করে একজন লোক ডেকে মদ আনতে বললাম আমি। ঠিক তৃষ্ণার্ত খচ্চরের মতোই পুরো পাত্র সাবাড় করলো হুই; এরপর বিশাল একটা সেঁকুর তুললো।
দেবতা আকহ্ হোরাস শুভেচ্ছা জানিয়েছে, তোমাকে এবং অন্যদের যাদের নাম মুখে আনতে বারণ। সে আরো বলেছে, তার কাজ সম্পন্ন হয়েছে, সব পাখি এখন খাঁচায় বন্দী। মনে করিয়ে দিতে বলেছে, ওরিসিসের উৎসবের আর মাত্র কয়েক মাস বাকি; রাজার উপভোগের জন্যে নতুন কাব্যনাট্য রচনা করতে তাগিদ দিয়েছে তোমাকে।
কোথায় সে? ওর কাছে ফিরে যেতে কতদিন লাগবে তোমার? আগ্রহভরে জানতে চাইলাম আমি।
সূৰ্য্য-দেব আমন রা যতক্ষণে ওই পাহাড়ের আড়ালে অস্ত যাবে, ততক্ষণে তার কাছে পৌঁছে যাবো আমি। হুই জানালো। জানালা দিয়ে সূর্যের দিকে চাইলাম, প্রায় বিকেল হয়ে এসেছে। তারমানে, শহরের খুব কাছেই ঘাঁটি গেড়েছে ট্যানাস। ওর কর্কশ আলিঙ্গন, দরাজ হাসি শুনতে প্রাণ আঁই-ঢাই শুরু করে দিলো।
আপন মনেই হাসলাম। নোংরা মেঝেতে পায়চারী করতে করতে ট্যানাসের কাছে কী বার্তা পাঠাবো, তার খসরা তৈরি করতে লাগলাম মনে মনে।
*
প্রায় সন্ধ্যা ঘনিয়ে গেলো হারেমের ঘাটে ফিরে আসতে। সিঁড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে দেখলাম, একটা দাসী মেয়ে কাঁদছে দরোজায় দাঁড়িয়ে, কান ফুলে ঢোল বেচারীর।
ও মেরেছে আমাকে, বললো মেয়েটা। বোঝা গেলো, আঘাতের চেয়ে মর্যাদাহানী তাকে বেশি কষ্ট দিয়েছে।
কর্ত্রী লসট্রিস কে কখনো ও বলবে না, তাকে ভর্ৎসনা করে বললাম। আর কাঁদছো কেননা? দাস-দাসীদের জন্মই হয়েছে মার খাবার জন্যে।
কিন্তু, কারো উপরে হাত তোলা আমার কর্ত্রীর পক্ষে বিস্ময়কর বৈকি। নির্ঘাত বেশ খারাপ তার মনের অবস্থা, গতি ধীর হয়ে এলো আমার আপনাতেই। ভয়ে ভয়ে আরো কিছুদূর এগোতে আরো একটা দাসী মেয়েকে মিসট্রেসের প্রকোষ্ঠ থেকে কাঁদতে কাঁদতে বেরুতে দেখলাম। রাগে লাল, তার পেছন পেছন লসট্রিস বেরিয়ে এলো। আমার চুলগুলোকে খড়ের গাদা বানিয়ে দিয়েছে।
আমার উপর চোখ পড়তেই থেমে গেলো সে। এরপরে নিয়ে পড়লো আমাকে।
কোথায় ছিলেন? দুপুরের আগেই আপনার খোঁজে বন্দরে লোক পাঠিয়েছি। কতো সাহস তোমার, আমাকে অপেক্ষা করিয়ে রাখো? প্রায় তেড়ে এলো ও, নিজের অজান্তেই এক পা পিছিয়ে গেলাম আমি।
ট্যানাস এখানে, দ্রুত বললাম। গলার স্বর নামালাম, যেনো কোনো দাসী মেয়ের কানে না যায় কথাগুলো। পরশুদিন তোমাকে করা আমার প্রতিজ্ঞা রক্ষা করতে পারবো।
মুহূর্তেই লসট্রিসের মেজাজ পাল্টে গেলো, লাফিয়ে উঠে আমার গলা জড়িয়ে ধরলো সে। এরপর মার-খাওয়া মেয়েগুলোকে আদর করে সান্ত্বনা দিতে ছুটলো।
*
বার্ষিক উপহার হিসেবে লোহিতসাগরের ওপারের রাজ্যের ম্রাট এক জোড়া শিকারী চিতা পাঠিয়েছেন ফারাওকে। পশ্চিম তীরের মরুতে গ্যাজেলের পালের উপর সেগুলোকে চড়াও হতে দেখার খায়েশ হলো তার। পুরো সভাষদ, আমার কর্ত্রীসহ, আমন্ত্রিত হলো এই শিকার উৎসবে।
ছোটো নৌকায় চড়ে পশ্চিম তীরের উদ্দেশ্যে ভেসে পড়লাম আমরা, সাদা পালে বাতাস পেয়ে তড়তড় করে ছুটলো সেটা। হাসি-উচ্ছ্বাসের ফোয়ারা আর বাঁশি, সিট্রামের ছন্দবদ্ধ সুর আমাদের সঙ্গী হলো। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই বাৎসরিক বন্যা শুরু হবে, সাথে সাথে সূচনা ঘটবে নতুন ঋতুর; উৎসবমুখর পরিবেশে তাই শিকারে চললো ফারাও বাহিনী।
গ্যাজেলের চারণভূমি শিকারের জন্যে সংরক্ষিত এলাকা, পূর্ববর্তী সমস্ত ফারাও একে আইনের মাধ্যমে সুরক্ষিত করে গেছেন। উপত্যকার উপরের পাহাড়ে সব সময় মোতায়ান থাকে ফারাও-এর বিশেষ প্রহরী, যে কোনো প্রাণী-হত্যা প্রতিরোধ করাই তাদের দায়িত্ব। রাজকীয় অনুমতি ব্যতিরেকে শিকার করার শাস্তি হলো ফাঁসির দড়িতে ঝুলে মৃত্যুদণ্ড।
চওড়া, বাদামী উপত্যকার উপরের একটা পাহাড়ের চূড়োয় অবস্থান নিলো রাজকীয় সভাষদ। সাথে সাথেই তাঁবু তৈরি তোড়জোড় শুরু হয়ে গেলো, এতোটা সময় প্রখর রৌদ্রে দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব হবে না। বিস্ময়কর পরিমাণে শরবত, সুরার পাত্র নিয়ে আসা হয়েছে তাদের তৃষ্ণা মেটাতে।
এমন একটা জায়গা নির্বাচন করলাম মিসট্রেসের জন্যে, যাতে করে শিকার অভিযানের সম্পূর্ণ দৃশ্য তো দেখা যাবেই; আবার কারো দৃষ্টি আকর্ষণ না করে সটকে পড়া যাবে ইচ্ছে করলেই। তাপ-তরঙ্গে কাঁপছে উপত্যকার পিঠ; দূরে গ্যাজেলের পালের চলাচল চোখে পড়ে এখান থেকে । হাত তুলে মিসট্রেসকে দেখালাম আমি।
ওখানে খাবার মতো কী পায় ওরা? লসট্রিস জানতে চায়। একটু সবুজ পর্যন্ত নেই ওখানে। মনে হয়, পাথর খায়–ওটা ছাড়া তো আর কিছু নেই দেখছি।
