এবারে তৃপ্তিকর আতঙ্কে শিউড়ে উঠে আমার কর্ত্রী। জ্বলছে ওর চোখ-মুখ । অনেককে মেরেছে ও? জানতে চায় সে।
কেউ বলে পাঁচ হাজার, কেউ বলে পঞ্চাশ হাজার। অনেকে তো দাবি করে এক লাখ দস্যু মারা গেছে আমার ধারণা, সেটা অতিরঞ্জন।
আরো বলো আমাকে! বলো!
সবাই বলছে, ও ছয়জন শ্রাইক নেতাকে ধরে ফেলেছে—
আর তাদের মাথা কেটেছে! ছোট্ট হুঙ্কারে আমাকে উৎসাহ জোগায় লসট্রিস।
না, সে তাদের মারেনি, কিন্তু বেবুনে পরিণত করেছে! এখন খাঁচায় ভরে তামাশা দেখবে?
এগুলো সত্যি? খিলখিল হাসিতে ভেঙে পড়ে লসট্রিস।
দেবতাদের জন্যে অসম্ভব বলে কিছু নেই!
ও তো আমার দেবতা। ওহ, টাইটা, কবে ওকে দেখতে দেবে তুমি?
শি, প্রতিজ্ঞা করলাম। প্রতিদিন তোমার সৌন্দৰ্য্য রঙ ছড়াচ্ছে। আর অল্প দিনেই পুরো ফিরে পাবে।
তাহলে, এর মধ্যে আকহ্ হোরাস সম্পর্কিত সমস্ত গল্প-রটনা শুনে এসে আমাকে বলবে তুমি।
তো, এরপর থেকে প্রতিদিন আমাকে বন্দরে পাঠাতে লাগলো মিসট্রেস। উত্তর থেকে আসা প্রতিটি জাহাজে আকহ্ হোরাসের খোঁজ-খবর নিতে শুরু করলাম আমি।
সবাই বলছে, আকহ্ হোরাস-এর চেহারা কেউ কখনো দেখেনি, কেননা এমন একটা মাথার আচ্ছাদন পরে সে যাতে করে চোখ ছাড়া সবকিছু ঢাকা থাকে। কথিত আছে, যুদ্ধের ময়দানে আগুনের কুণ্ডে পরিণত হন তিনি, ওই আগুনে পুড়ে যায় শত্রুরা। একবার বন্দর ঘুরে এসে জানালাম মিসট্রেসকে।
সূর্যের আলোয় ট্যানাসের চুল সত্যিই আগুনের মতো জ্বলে, সায় দিয়ে জানালো লসট্রিস।
আরেকদিন সকালে, ওকে বললাম, সবাই বলে, প্রতিবিম্বের মতো নিজের শরীর বিভাজিত করতে পারে সে, একই সময়ে তাই বিভিন্ন জায়গায় একসাথে অবস্থান করতে পারে। একই সময়ে কেয়েনা এবং কম-ওম্বোতে দেখা গিয়েছে তাকে।
তা কী করে সম্ভব? জানতে চাইলো লসট্রিস।
কেউ বলে, এটা অসম্ভব। তাদের ধারণা, না ঘুমিয়ে দ্রুত চলাচল করে বলে এতো বিশাল দূরত্ব এতো তাড়াতাড়ি পাড়ি দেয় আকহু হোরাস। রাতে, সিংহের পিঠে করে চড়ে বেড়ায় সে; দিন হলে সাদা ঈগলের ডানায়।
হতে পারে, নিশ্চিত ভঙ্গিতে বলে লসট্রিস। প্রতিবিম্বের কথা আমি বিশ্বাস করি না, কিন্তু সিংহ আর ঈগলের কথা সত্যি হতে পারে। ট্যানাসের পক্ষে সম্ভব এমন কিছু করা।
আমার মনে হয়, সমগ্র মিশর ওর দর্শন পাওয়ার জন্যে এতো উতলা হয়ে উঠেছে, কাল্পনিক কথা বলছে তারা। প্রতিটি জংলার আড়ালে তাঁকে দেখছে মানুষজন। আর, গতির কথা বললে, রক্ষীদের সাথে আমি দৌড়েছি; কাজেই আমার জানা আছে আমাকে শেষ করতে দেয় না লসট্রিস; নিজেই বলে উঠে, তোমার আত্মায় কোনো কাব্য নেই, টাইটা। তুমি ধারণা করতে পারো, পুঞ্জ পুঞ্জ মেঘ হলো ওসিরিসের পশমী আচ্ছাদন, আর সূর্য হলো আমন রার মুখ; কেননা ওগুলোকে তুমি ছুঁতে পারো না। আমি বিশ্বাস করি, এ সবকিছুই ট্যানাসের পক্ষে সম্ভব।
এহেন কথা মেনে না নিয়ে আর কী উপায়? নীরবে মাথা ঝোঁকালাম আমি।
*
দেখতে দেখতে সেই দিন চলে এলো, যার ভয় করছিলাম। একদিন সকালে, স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি মনোযোগ দিয়ে আয়নায় নিজের অবয়ব পরীক্ষা করে লসট্রিস ঘোষণা করলো, এবারে ট্যানাসের সঙ্গে তার দেখা করার সময় এসেছে। আমাকে স্বীকার করতেই হচ্ছে, সত্যিই এর চেয়ে ভালো আর কখনো লাগে নি ওকে। এই কয়েক দিনের ধকল ওর সৌন্দর্য্যকে যেনো স্থায়িত্ব দিয়েছে। কিশোরীর ভীরুতার শেষ চিহ্ন পর্যন্ত মুছে গেছে ওর ব্যক্তিত্ব থেকে; পূর্ণবয়স্কা, রহস্যময়ী একজন নারীতে পরিণত হয়েছে লসট্রিস।
আমি তোমাকে বিশ্বাস করেছিলাম, টাইটা। এখন আমার আস্থার প্রতিদান দাও। ট্যানাসকে নিয়ে আসো আমার কাছে।
সাফাগা ছাড়ার সময় কীভাবে বার্তা আদান-প্রদান হবে দুজনের মধ্যে এ ব্যাপারে ট্যানাস এবং আমি কোনো সিন্ধান্তে পৌঁছি নি। গুজব বা গল্প ছাড়া ট্যানাসের অবস্থানের কোনো সঠিক খবর আমার কাছে নেই।
আবারো, আমাকে বাঁচানোর জন্যেই যেনো হস্তক্ষেপ করলেন দেবতারা। সেই দিন বাজারে নতুন একটা গুজব শোনা গেলো। উত্তরের রাস্তা ধরে আসা এক ক্যারাভান চালক জানালো, শহরের দেওয়ালের মাইল দুয়েক দূরে নরমুণ্ডু-এর তৈরি পিরামিড দেখে এসেছে সে খুব বেশিদিন আগের নয়। তাজা মাথাগুলো এমনকি গন্ধ পর্যন্ত ছড়াতে শুরু করে নি।
এর অর্থ হলো, লোকজন বলাবলি করতে লাগলো, আসূনের নিকটেই আছেন আকহ হোরাস। গজ-দ্বীপের দৃষ্টিসীমার ভেতরে। আখেকুর দলের বাকি সদস্যদের নিকেশ করতে এসেছে। শেষ দস্যুটিকে পর্যন্ত কতল করেছে আকহ্ হোরাস, এরপর হয়তো রাস্তার ধারে পিরামিড তৈরি করেছে। দক্ষিণ তাহলে শ্রাইকমুক্ত হলো?
এতো মধুর সংবাদ বহুকাল শুনি নি; মিসট্রেসকে জানানোর জন্যে ব্যাকুল হয়ে উঠলাম । নাবিক, বষিক, মাঝি-মাল্লার ভীড় ঠেলে এগুলাম, বন্দরের একটা নৌকা ভাড়া করে দ্রুত দ্বীপে ফিরতে চাইছি।
কেউ একজন আমার হাত টেনে ধরলো। এক ঝটকায় ওটা সরিয়ে দিতে চাইলাম। যতোই শ্ৰাইকমুক্ত হচ্ছে দেশটা, ভিক্ষুকের দল যেনো আরো বেপোরোয়া হয়ে উঠছে। এ ব্যাটাকে দেখছি তাড়ানোই যাচ্ছে না। রাগের সাথে ঘুরে দাঁড়ালাম আমি, ব্যাটাকে দাবড়ানো দিতে তৈরি ।
পুরোনো বন্ধুকে মেরো না! একজন দেবতার কাছ থেকে তোমার জন্যে বার্তা নিয়ে এসেছি আমি, কেঁদে ফেলে বললো ভিক্ষুক, অবাক চোখে ওর দিকে চেয়ে রইলাম আমি।
