অন্য আরেকটা পন্থা হল, বাছুর কিংবা বাচ্চাগুলোকে তাদের মায়েদের কাছাকাছি রাখা কিন্তু এমন কিছু ব্যবস্থা করা যাতে তারা খুব বেশি মায়ের দুধ খেতে না পারে। এটার একটা খুব সহজ উপায় হল বাছুরটাকে প্রথমে তার মায়ের দুধ খেতে দেয়া হবে, তারপর যখনি দুধ পুরো মাত্রায় পাওয়া যাবে, তখনি বাছুরটাকে সরিয়ে নেয়া হবে। এই পন্থা অবলম্বন করতে গিয়ে সাধারণত বাছুর আর গাভী দুইজনের কাছ থেকেই বেশ প্রতিরোধের মুখে পড়তে হয়। তাই কিছু কিছু রাখাল যেটা করত তা হল, বাছুরটাকে মেরে তার মাংস খেয়ে ফেলত কিন্তু তার চামড়াটা দিয়ে একটা বাছুরের মত দেখতে পুতুল তৈরি করত। তারপর সেটা গাভীটার সামনে রাখত যাতে গাভীর দুধ উৎপাদন বেড়ে যায়। সুদানের নয়ার (Nuer) উপজাতির লোকজন তো আরেক ধাপ এগিয়ে সেই নকল বাছুরের গায়ে তার মায়ের মূত্র ঢেলে দিত যাতে মা সেই পুতুলটাকে আরও বেশি আপন ভাবতে পারে! নয়ারদের আরেকটা পদ্ধতি ছিল বাছুরের মুখে কাঁটাওয়ালা একটা আংটা পরিয়ে দেয়া। এর ফলে বাছুর দুধ খেতে গেলে গাভীর গায়ে কাঁটা ফুটতো আর গাভী তখন নিজেই বাছুরকে দুধ খেতে দিত না।৯ ওদিকে, সাহারার তুয়ারেগ (Tuareg) উট প্রজননকারিরা উট শাবকদের নাকের বাইরের অংশ আর ঠোঁটের উপরের অংশটা কেটে দিত যাতে তাদের চুষতে কষ্ট হয়। এভাবেই তারা শাবকদের বেশি দুধ খাওয়া থেকে বিরত রাখত।১০
সকল কৃষিভিত্তিক সমাজই যে তাদের পোষ্য প্রাণীগুলোর প্রতি এমন আচরণ করত তা নয়। কিছু কিছু গৃহপালিত প্রাণীর জীবন হয়তো বেশ ভালোই ছিল। উলের জন্য পোষা ভেড়াটা, পোষা কুকুরটা আর বেড়ালটা বেশ আরামেই থাকতো। যুদ্ধে কিংবা প্রতিযোগীতায় লড়াই করার ঘোড়াগুলোও আরামে থাকতো। রোমান সম্রাট ক্যালিগুলা (Caligula) সচেতনভাবেই তার সবচেয়ে প্রিয় ঘোড়া ইনকিতাতুসকে (Incitatus) তার উজির হিসেবে নিয়োগ করার পরিকল্পনা করেছিলেন! রাখাল আর কৃষকেরা পুরো ইতিহাস জুড়েই তাদের পালিত প্রাণীদের বেশ খেয়াল রেখেছে, ঠিক যেমন দাসপ্রভুরা তাদের দাসদের প্রতি দয়া দেখিয়েছে। ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই, যুগে যুগে অনেক রাজা এবং ধর্মপ্রচারক নিজেদের রাখালের বেশে উপস্থাপন করেছেন। আর তারা তাদের প্রজাদের সেভাবেই খেয়াল রেখেছেন যেভাবে রাখালেরা খেয়াল রাখতো তাদের পশুপালের উপর। এখন নিশ্চয়ই বোঝা যাচ্ছে এটা কোন কাকতাল ছিল না!

রাখাল বা পশুপালকের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে না দেখে পশুদের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলে এ কথা মানতেই হয় যে, বেশির ভাগ গৃহপালিত পশুর জন্যই কৃষি বিপ্লব একটা ভয়ানক বিপর্যয় হিসেবেই এসেছিল। তাদের ঐ বিবর্তনীয় ‘সাফল্য’ আসলে অর্থহীন। একটা বিরল বুনো গণ্ডার যার সম্পূর্ণ প্রজাতি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার শংকার মধ্যে আছে, সেও ঐ বাছুরের চেয়ে অনেক শান্তিতে আছে যে কিনা তার ছোট্ট জীবনটা কাটিয়ে দিচ্ছে একটা ছোট্ট বাক্সের ভিতরে, মোটাতাজা হচ্ছে কিছু সুস্বাদু মাংসের টুকরোয় পরিণত হওয়ার জন্য। বিরল সেই গণ্ডারটি তার প্রজাতির শেষ কজন সদস্য হওয়ার কারণে এমন কিছু কম সুখী নয়। আবার সংখ্যার বিরাট সাফল্যও কিন্তু সেইসব বাছুরদের ব্যাক্তিগত যন্ত্রণার জন্য কোন সান্ত্বনা হতে পারে না।
বিবর্তনীয় সাফল্য আর ব্যাক্তিগত যন্ত্রণার মধ্যের এই দ্বন্দ্বটাই কৃষি বিপ্লব থেকে আমাদের পাওয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। যখন আমরা গম কিংবা ভুট্টার মত বিভিন্ন উদ্ভিদের ঐতিহাসিক অবস্থার পরিবর্তন বিবেচনা করি তখন হয়তো বা বিবর্তনীয় দৃষ্টিভঙ্গিটা মেনে নেয়া যায়। কিন্তু গরু, ভেড়া কিংবা মানুষের মত বড় প্রাণী যাদের অনুভূতি ও সংবেদনের এক জটিল জগত রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে বিবর্তনীয় সাফল্য কীভাবে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় রূপান্তরিত হয় সেটা আমাদের আগে বুঝতে হবে। সামনের অধ্যায়ে আমরা দেখব কীভাবে সময়ের সাথে সাথে নাটকীয় ভাবে আমাদের প্রজাতির সম্মিলিত ক্ষমতা বাড়তে থাকে, আর কীভাবে সেটা আমাদের ব্যাক্তিগত যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
————–
তথ্যসূত্র
1 The map is based mainly on: Peter Bellwood, First Farmers: The Origins of Agricultural Societies (Malden: Blackwell Publishing, 2005).
2 Jared Diamond, Guns, Germs, and Steel: The Fates of Human Societies (New York: W. W. Norton, 1997).