কিন্তু এই আশাবাদী যুক্তি আসলে তেমন গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ আমরা দেখেছি, নতুন নতুন আচরণ ও দক্ষতা মানুষকে উন্নততর জীবন দিতে পারে না। কৃষিবিপ্লবের সময়ে চাষাবাদ করতে শিখে মানুষের সমষ্টিগতভাবে পরিবেশকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতাও বেড়েছিল। অথচ একজন ব্যক্তি-মানুষের জীবন হয়ে গিয়েছিল আরও রুক্ষ। একজন সংগ্রাহকের তুলনায় একজন কৃষককে একদিকে কাজও করতে হতো অনেক বেশি, অন্যদিকে তার খাবারের বৈচিত্র আর পুষ্টিগুণও ছিল কম। রোগভোগের সম্ভাবনাও কৃষকদেরই বেশি ছিল। আবার ইউরোপের দিকে তাকালে দেখা যায়, সাম্রাজ্যবিস্তারের ফলে তাদের সমষ্টিগত ক্ষমতা অনেক বেড়েছে, তাদের আদর্শ, চিন্তাধারা, প্রযুক্তি আর বৈচিত্রময় খাবার ছড়িয়ে পড়েছে সারা পৃথিবীতে, বাণিজ্যের নতুন নতুন পথ তৈরি হয়েছে। অথচ আফ্রিকা, আমেরিকা আর অস্ট্রেলিয়ার কোটি কোটি আদিবাসী মানুষকে তা অন্তহীন দুর্ভোগ ছাড়া আর কিছুই দেয়নি। মানুষের মধ্যে ক্ষমতা পেলেই সেটা অপব্যবহার করার একটা প্রবণতা আছে। কাজেই ক্ষমতার চর্চার মাধ্যমে মানুষ সুখী হবে- এমনটা ভাবা বোকামি।
এই তত্ত্বের বিরোধীদের অবস্থান পুরোপুরি উলটো। তাদের মতে, মানুষের ক্ষমতা ও সুখের মধ্যে সম্পর্কটা আসলে বিপরীত। ক্ষমতা সবসময় মানুষকে দুর্নীতি ও অন্যায়ের পথে চালিত করে। তাই মানুষের হাতে যত ক্ষমতা আসছে, ততই এই পৃথিবীটা একটা শীতল যান্ত্রিক পরিবেশের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, যে পরিবেশ আমরা চাইনি। বিবর্তন মানুষকে দেহে-মনে একটা শিকারি-সংগ্রাহক প্রাণী হিসেবেই তৈরি করেছিল। সেখান থেকে প্রথমে কৃষিনির্ভর ও তার পরে শিল্পনির্ভর জীবনে প্রবেশ করে মানুষ তার প্রাকৃতিক জীবন হারিয়েছে। এই কৃত্রিম জীবন তার চাওয়াগুলো পূরণ করতে পারছে না, তার সহজাত প্রবৃত্তিকে প্রকাশিত হতে দিচ্ছে না। তাই তার সন্তুষ্টিও হচ্ছে না। আদিম মানুষের ম্যামথ শিকারের যে সুতীব্র উত্তেজনা আর বুনো উল্লাস, তা আজকের একটা শহুরে মধ্যবিত্ত পরিবার কল্পনাও করতে পারবে না। আমাদের প্রত্যেকটা নতুন আবিষ্কার আমাদেরকে আমাদের কাঙ্ক্ষিত স্বর্গ থেকে একটু একটু করে দূরে নিয়ে যাচ্ছে।
আবার সব আবিষ্কারই যে খারাপ- তাও নয়। এর বিপরীত উদাহরণও আছে। আমাদের ভিতর থেকে শিকারি-সংগ্রাহক সত্তাটা হারিয়ে গেছে, কিন্তু কিছু কিছু দিক থেকে দেখলে সেটা খুব খারাপও নয়। গত দুই শতাব্দীতে চিকিৎসা ব্যবস্থার যে উন্নতি হয়েছে তাতে শিশু মৃত্যুহার ৩৩ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশে নেমে এসেছে। এর ফলে মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে যাওয়া সেইসব শিশু ও তাদের পরিবারের জীবনে যে সুখ এসেছে, তা বিনা তর্কে মেনে নিতেই হবে।
তাই অনেকের অবস্থান এই দুরকম যুক্তির মাঝখানে। বৈজ্ঞানিক বিপ্লব আসার আগের সময়ে ক্ষমতা ও সুখের সম্পর্কটা অস্পষ্ট ছিল। মধ্যযুগের একজন কৃষক হয়তো তার শিকারি-সংগ্রাহক পূর্বসূরীর চেয়ে খারাপ অবস্থায় ছিল। কিন্তু গত কয়েকশ বছরে মানুষ তার ক্ষমতাকে আরও বিচক্ষণতার সাথে কাজে লাগাতে শিখেছে। তারই একটা উদাহরণ হলো চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নতি। আরও অন্যান্য দৃষ্টান্ত হিসেবে বলা যায় সহিংসতার পরিমাণ অনেকখানি কমে আসা, আন্তর্জাতিক যুদ্ধ-বিগ্রহ প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়া, মহামারী বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া- এসবের কথা।
কিন্তু এই ব্যাখ্যাও একদিক থেকে অতিসরলীকরণ দোষে দুষ্ট। কারণ এই ব্যাখ্যার ভিত্তি হল খুব অল্প কিছু সময়ের তথ্য। আধুনিক চিকিৎসা পৃথিবীর বেশিরভাগ মানুষের নাগালে এসেছে ১৮৫০ সালের পরে। আর শিশুমৃত্যুর হার কমে যাওয়া তো কেবল বিংশ শতাব্দীর ঘটনা। বিংশ শতকের মাঝামাঝি সময়েও পৃথিবীতে বিরাট মহামারী হয়েছে। ১৯৫৮ থেকে ১৯৬১ সালের মধ্যে যখন চীন দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে, ঠিক সেই সময়েই সেখানে ১ থেকে ৫ কোটি মানুষ মারা গেছে খেতে না পেয়ে। আর আন্তর্জাতিক যুদ্ধ বন্ধ হয়েছে কেবল ১৯৪৫ সালের পর, এর মূল কারণ অবশ্য পরমাণু অস্ত্রের ভয়। কাজেই গত কয়েক বছরকে মানুষের ইতিহাসের স্বর্ণযুগ মনে হলেও এত তাড়াতাড়ি নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না, এটা কি আসলেই সুন্দর সময়ের শুরু না কেবল ক্ষণস্থায়ী সুসময়। আধুনিক যুগের বিচার করতে গেলে কেবল একুশ শতকের পশ্চিমা দেশের মধ্যবিত্তের চোখ দিয়ে দেখলে হবে না, সাথে দেখতে হবে উনিশ শতকের ওয়েলসের কয়লাখনির শ্রমিক, চীনের আফিম-আসক্ত কিংবা তাসমানিয়ার আদিবাসী মানুষের দৃষ্টিকোণ থেকেও। কারণ, ইতিহাসের চোখে আমেরিকার জনপ্রিয় কার্টুন চরিত্র হোমার সিম্পসনের (Homer Simpson) চেয়ে তাসমানিয়ার নির্যাতিত আদিবাসীদের প্রতিনিধি ট্রুগানিনির (Truganini) গুরুত্ব কিন্তু একটুও কম নয়।
তাছাড়া আপাতদৃষ্টিতে বিগত অর্ধ-শতাব্দীকে মানুষের ইতিহাসের স্বর্ণযুগ বলে মনে হলেও এই সময়ের মধ্যেই কিন্তু মানুষ রোপণ করেছে তার ভবিষ্যৎ অমঙ্গলের বীজ। একসময় মানুষসহ সমগ্র জীবজগতই ছিল প্রকৃতির নিয়মের অধীন। সেখান থেকে ধীরে ধীরে পরিবেশের কর্তৃত্ব হাতে তুলে নিয়েছে মানুষ। ফলে নিজের প্রয়োজনে পরিবেশকে ইচ্ছামতো পরিবর্তন করার ক্ষমতাও এখন আমাদের আছে। কিন্তু সেই ক্ষমতার যথেচ্ছ ব্যবহারের কারণে আমরা লাভবান হলেও মোটের উপর পরিবেশের ক্ষতিই হয়েছে বেশি। আমাদের চাহিদা পূরণের মূল্য দিয়েছে অসংখ্য প্রাণী ও উদ্ভিদ প্রজাতি। বিশেষ করে গত কয়েক দশকে আমরা যে কতভাবে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করেছি তার হিসাব নেই। কিন্তু পরিবেশের ক্ষতি করে মানুষের লাভবান হওয়ার চিন্তা করাটা বোকামি। পৃথিবীজোড়া অগণিত মানুষের বর্তমানের প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে আমরা যে ভবিষ্যতের পৃথিবীকে সম্পদহীন করে ফেলছি, সে কথা ভাবার সময়ও কারো নেই। এর কঠিন পরিণতি এক সময় ভোগ করতেই হবে। ইতোমধ্যেই তার কিছু অশনি সংকেত দেখা যাচ্ছে।
