ধীরে ধীরে পরিস্থিতি খারাপ দিকে মোড় নিল। থিবল্ট এরই মধ্যে অনেকটাই শয়তানের কজায় চলে গেছে। অল্প যা একটু ভাল অবশিষ্ট ছিল, তা-ও ফিকে হতে বসেছে। সরাইখানা থেকে কত আর পায়। ওর মন যা চায়, একবছর ধরে টাকা জমালেও তা হবে না। বিবল্ট, শুরু করেছিল ব্যারনের হরিণ দিয়ে; তারপর অ্যানলেটকে চেয়েছিল। এরপর মাদাম পুলের মিলের আশা করেছিল। এখন কোন প্রাসাদ দুর্গ পেলেও কি ওর মন ভরবে? সুন্দর পা, নিখুঁত গোড়ালি, অভূতপূর্ব সৌরভ, দামী পোশাক, এসব বিলাসিতাও তো চাই ওর।
অবশেষে একদিন ও সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলল। হাতে এত ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও গরীব থাকাটা অন্যায়। ওর সব চুল যদি লাল হয়েও যায়, তবু পরোয়া করে না! ক্ষমতা ব্যবহার করে উচ্চাকাঙ্ক্ষা ওকে পূরণ করতেই হবে।
১০. সম্মানীয় ম্যাগলোয়া
দশম অধ্যায় – সম্মানীয় ম্যাগলোয়া
নতুন বছর শুরু হয়েছে, কিন্তু থিবল্ট কী করবে সেই সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। সরাইখানা থেকে দ্বিগুণ লাভের আশায় বেশি করে শিকার করাতে লাগল ও।
থিবস্টের শরীর ঠিক থাকলেও আত্মা বদলে যাচ্ছে। দিন দিন সংখ্যায় বাড়ছে মাথার লাল চুল। ভাল পোশাক, পকেটে পয়সা, সব মিলে এখন আর ওকে জুতো-কারিগর মনে হয় না। মনে হয় অবস্থাপন্ন কৃষক বা সচ্ছল নাগরিক, কোন ব্যবসার কাজে এসেছে।
একটা গ্রামের উৎসবে যোগ দিল ও। সেখানে বিল পেঁচার আয়োজন ছিল। বিল সেঁচার বিষয়টা বেশ উত্তেজনাকর। দূর দূরান্ত থেকে লোকে দেখতে আসে। অনেক আগে থেকেই ঘোষণা দেয়া হয়। এক থেকে তিন মাইল লম্বা বিলে একদিক থেকে পানি ছাড়া হয়, আরেকদিক দিয়ে বেরিয়ে যায় সেই পানি। শুধু মাছ থেকে যায়। সেই খালি বিলে ছোট বড় সব মাছ ধরার নামই বিল পেঁচা। এই কাজ সমাধা হতে অনেক সময় সাত দিনও লেগে যায়। প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী এবং দর্শকদের সবাই প্রস্তুত হওয়ার আগে মাছ ধরা শুরু হয় না।
অনুষ্ঠান শুরুর আগেই দর্শকেরা এসে হাজির হয়। যে যেখানে পারে, জায়গা করে নেয়। তারপর বিলে পানি ছাড়া শুরু হয়। প্রথমে পরিষ্কার পানি, তারপর একটু ময়লা, তারপর আরও ময়লা। একসময় মাছের জন্য টিকে থাকা কঠিন হয়ে ওঠে। স্রোতের উল্টোদিকে সাঁতরাতে থাকে মাছ। তখন একদল লোক নেমে সেই মাছ তুলতে শুরু করে। জীবিত মাছগুলো ঝুড়িতে ভরে ট্যাংকে জমা করা হয়; আর মরা মাছ ঘাসে ফেলা হয় দিন শেষ হবার আগেই বিক্রি করার জন্য।
সুইসগেট দিয়ে পানি বেরোতে থাকে। আসল খেলাটা শুরু হয় যখন মাছের চাপে পানি বেরোনো বন্ধ হয়ে যায়। মাছ তোলার দলকে তখন বিশাল সব মাছের সঙ্গে রীতিমতো যুদ্ধ করতে হয়! দর্শকরা এসময় এসে হাততালি দিতে থাকে।
এভাবে চলে পাঁচ-ছয় দিন। তারপর কাদার ভেতর থেকে বেয়োয় ঈল মাছগুলো। ওগুলোর জন্য পিস্তলধারীরা ঘুরে বেড়ায় পুকুরের কাছে।
থিবল্টও হাত-পা চালিয়ে বিলের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করল। পথে এক মহিলার জামা কুঁচকে দিল ও। মহিলা পরিপাটি জামা পরতে পছন্দ করে, তাই ঘুরেই একটা ঝাড়ি মেরে বসল। পাল্টা জবাব দিতে তাকিয়ে থিবল্ট আবিষ্কার করল, মহিলা খুবই সুন্দরী। পিছিয়ে গিয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করল ও।
সৌন্দর্যের জয় সবসময়। এমন যদি হত যে মহিলা খুব ক্ষমতাশালী, কিন্তু দেখতে সুন্দর না-তাহলেও থিবল্ট পাল্টা জবাব ঠিকই দিত। আবার এটাও হতে পারে, মহিলার সঙ্গীকে দেখে ও অবাক হয়ে গিয়েছিল। স্বাস্থ্যবান, ষাটোর্ধ্ব একজন মানুষ। কালো রঙের পোশাক পরা। লম্বায় এতই খাটো, মাথাটা কোনমতে মহিলার কনুই পর্যন্ত পৌঁছেছে। ভালই হয়েছে-লোকটার হাত ধরে রাখা মহিলার জন্য হত শাস্তির নামান্তর। লোকটার কাঁধের ওপর ভর দিয়ে আছে সে। বেখাপ্পা ধরনের কিছু আধুনিক চীনা মূর্তি আছে না? ছোট পা, বিশাল ভূঁড়ি, মোটা হাত, সুন্দর করে ঝুঁটি বাধা চুল? সেগুলোর কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে লোকটা। কিছু পোকাও আছে, যেগুলোর পা শরীরের তুলনায় এতই ছোট যে হাটার বদলে গড়িয়ে যাওয়াটাই তাদের জন্য সুবিধাজনক। সেই পোকাগুলোর আকৃতির সাথেও কেমন একটা সাদৃশ্য আছে লোকটার। তবে এসব সত্ত্বেও হাস্যোজ্জ্বল মুখ আর বন্ধুত্বপূর্ণ দৃষ্টি দেখে তার প্রতি যে কেউ আকর্ষণ বোধ করবে। লোকটা যেন জীবনটা উপভোগ করতেই ধরাধামে এসেছে। মহিলাকে থিবল্টের উপর ক্ষেপে উঠতে দেখে বাধা দিল সে।
ধীরে, মাদাম ম্যাগলোয়া, ধীরে। এই বেচারাকে এত কঠিন কথা বলার দরকার নেই, ও নিজে থেকেই যথেষ্ট দুঃখিত।
আমার এত সুন্দর জামাটা নষ্ট করার জন্য ধন্যবাদ দেব, তাই না? পায়ে পাড়া দেয়ার কথা তো বাদই দিলাম।
থিবল্ট বলল, ক্ষমা করবেন, মাদাম। আপনি যখন তাকালেন, এত সুন্দর মুখ দেখে খেয়াল করতে পারিনি কোথায় পা দিচ্ছি।
তিন মাস থিবল্ট নেকড়েদের সাথে ঘুরে বেড়িয়েছে। সে হিসেবে প্রশংসার ভাষাটাকে খারাপ বলা যাবে না। অবশ্য প্রশংসায় মহিলা গলল না। থিবল্ট ভাল পোশাক পরে আছে। কিন্তু তারপরও মেয়েদের কৌতূহলী অন্তদৃষ্টি দিয়ে সে বুঝে ফেলেছে-থিবল্ট তাদের সমপর্যায়ের মানুষ নয়।
মহিলার সঙ্গী অবশ্য তার খাটো হাতে হাততালি দিয়ে বসল।
বাহ! তোমাকে বেশ বুদ্ধিমান বলেই মনে হচ্ছে বন্ধু। মেয়েদের সাথে কীভাবে কথা বলতে হয় তুমি জানো। মহিলাকে উদ্দেশ্য করে বলল, কত সুন্দর করে তোমার প্রশংসা করল। আমাদের উচিত ওকে ড্রিংকের দাওয়াত দেয়া।
