একটু দম নেয়ার পর উঠে গিয়ে ছোট্ট জানালাটা দিয়ে সামনের বনের দিকে তাকাল থিবল্ট।
চলে যাওয়ার বদলে নেকড়েরা সব ওর বাড়ির সামনে বসে আছে।
অন্য কেউ হলে পশুগুলোকে দেখে ভয় পেত। কিন্তু থিবল্ট একটু আগেই ওগুলোর পাহারায় বাড়ি ফিরেছে। এখন ওগুলোর আর ওর মাঝে, যতই পাতলা হোক, একটা দেয়াল অন্তত আছে।
টেবিলে একটা লোহার বাতি রাখল থিবল্ট, তারপর আগুন জ্বালাল। কিন্তু এই নেকড়েগুলো অন্য জাতের। আগুন দেখেও নিজেদের জায়গা ছেড়ে নড়ল না ওরা। অস্বস্তি নিয়ে থিবল্টের আর ঘুমানো হলো না। রাত পেরিয়ে ভোর হলো। আকাশের তারাগুলো নিভতে শুরু করল। নেকড়েগুলো তখনও কীসের যেন অপেক্ষায় শুয়ে-বসে আছে। শেষ তারাটা নিভে যাওয়ার পর প্রথম সূর্যকিরণ এসে পড়ল। তখন সবগুলো নেকড়ে একসাথে উঠে দাঁড়াল। করুণ সুরে একসাথে ডাক ছেড়ে একেকটা একেক দিকে চলে গেল। এতক্ষণে বসে একটু চিন্তা করার সুযোগ পেল থিবল্ট। আচ্ছা, মিল মালকিন কেন ল্যান্ড্রির বদলে ওকে পছন্দ করল না? ও কি আর সুদর্শন থিবল্ট নেই? নাকি ওর চেহারায় কোন পরিবর্তন এসেছে? পরীক্ষা করে দেখার জন্য আয়নার সামনে এসে দাঁড়াল। প্রথম দর্শনেই মুখ দিয়ে একটা চিৎকার বেরিয়ে এল ওর। এখনও সেই সুদর্শন থিবল্টই আছে বটে, কিন্তু গতদিনের হুট করে বেরিয়ে যাওয়া ইচ্ছাগুলোর কল্যাণে মাথার একটা লাল চুল বেড়ে এক গোছ লাল চুলে পরিণত হয়েছে।
চুলগুলো কাটার বা তোলার চেষ্টা করে কোন লাভ নেই, জানে থিবল্ট। সাবধান থাকতে হবে যাতে আর কোন ইচ্ছে এভাবে বেরিয়ে না যায়। সবচেয়ে ভাল হয়, মন থেকে সব উচ্চাকাঙ্ক্ষা ঝেড়ে ফেলে নিজের আদি জীবিকায় ফিরে গেলে। নিজের কাজে লেগে যাবার চেষ্টা করল ও। কিন্তু কিছুতেই মন বসল না। আগে সুন্দর দিনগুলোতে মনের আনন্দে গান গাইত। কিন্তু কোন গানই মনে করতে পারল না। নিজের অভাবের দিনগুলোতে ফিরে যেতে চাওয়াটা কি ভাল, যখন চাইলেই ইচ্ছাপূরণ করে সুখী হওয়ার সুযোগ আছে? আগে রান্নার সখ ছিল ওর, কিন্তু এখন সেটাও ভাল লাগছে না। অবশেষে ক্ষুধার তাড়নায় কালো রুটি খেতে বাধ্য হলো থিবল্ট। মানুষের ওপর ওর রাগ আরও বেড়ে গেল। দিনটা এত লম্বা যেন কাটতেই চাইছে না। দরজার বাইরে নিজের বানানো বেঞ্চিটায় গিয়ে বসল ও। সন্ধ্যা নামতে শুরু করেছে, এমনি সময় একটা দুটো করে নেকড়ে এসে হাজির হতে শুরু করল। নির্দিষ্ট একটা দূরত্ব বজায় রেখে বসে পড়ল ওগুলো। কয়েকটা নেকড়ে চলে আসতেই আবার ঘরে গিয়ে দরজা দিল থিবল্ট। বেশ ক্লান্ত লাগছে, রাত জাগার শক্তি নেই। তাই সারারাতের জন্য আগুন জ্বেলে বিছানায় গা এলিয়ে দিল ও। ঘুমিয়ে পড়ল প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই। ঘুম যখন ভাঙল তখন দিন হয়ে গেছে। সূর্য উঠে গেছে অনেক আগেই।
জানালার কাছে গিয়ে দেখল নেকড়েগুলো মাটিতে ওদের রাত্রিযাপনের চিহ্ন রেখে গেছে।
পরের সন্ধ্যায় আবার নেকড়েরা এসে হাজির। ইতিমধ্যে ওদের উপস্থিতিতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে থিবল্ট। সম্ভবত কালো নেকড়ের সাথে ওর সম্পর্কের কারণেই ওগুলো ওর প্রতি সহমর্মিতা বোধ করছে। ওর প্রতি জম্ভগুলোর এই মনোভাব কতদূর গভীর জানার সিদ্ধান্ত নিল থিবল্ট। দা-বর্শা সঙ্গে নিয়ে, আত্মরক্ষার জন্য প্রস্তুত হয়ে দরজা খুলে বেরিয়ে এল বাইরে। নেকড়েগুলো তেড়ে না এসে বরং প্রভুভক্ত কুকুরের মতো লেজ নাড়তে লাগল। তখন কাছে গিয়ে দুয়েকটার পিঠ চুলকে দিল ও। এতে আরও খুশি হয়ে উঠল ওগুলো।
বাহ! একটু সুবিধা পেলেই কল্পনার ঘোড়ার লাগাম ছুটিয়ে দেয় থিবল্ট। এমন বাধ্য এবং দ্ৰ শিকারি দল কোন লর্ড ব্যারনেরও নেই। চাইলেই এখন আমি হরিণ শাবক দিয়ে রাতের খাবার সারতে পারি।
বলতে যা দেরি, দল থেকে চারটা বড়সড় নেকড়ে ছিটকে বনের মধ্যে হারিয়ে গেল। কয়েক মিনিট পর নেকড়ের ডাকাডাকি শোনা গেল। আধঘণ্টা পর একটা হরিণ শাবক নিয়ে ফিরে এল নেকড়েগুলো। শিকারটাকে থিবল্টের পায়ের কাছে ফেলল। খুশি হয়ে নিজের জন্য মাংস রেখে বাকিটুকু ভাগ করে দিল থিবল্ট। ওদের কাছে নিজের অবস্থান মেনে নিল। সম্রাটের মতো ওদের ইশারা করল চলে যেতে। পরের দিন যাতে আবার ফিরে আসে।
পরের দিন সরাইখানায় বেঁচে যাওয়া মাংসটুকু বিক্রি করে দিয়ে এল ও। তারপরের দিন বুনো শুয়োরের মাংস। অল্পদিনেই সরাইখানার সবচেয়ে বড় জোগানদারে পরিণত হলো থিবল্ট। জুতো তৈরির কাজ ছেড়ে ভাটিখানায় ঘুরে বেড়াতে লাগল ও। কেউ কেউ ওর লাল চুল নিয়ে ঠাট্টা করার চেষ্টা করত। কিন্তু ও পরিষ্কার বুঝিয়ে দিত-এই ব্যাপারে কোন রকম মশকরা ও বরদাশত করবে না।
এমন সময় ডিউক আর তার স্ত্রী লর্ড ব্যারনের বাড়িতে বেড়াতে এল। আশপাশের এলাকা থেকে অনেক অভিজাত লর্ড এবং লেডিরাও যোগ দিল। থিবল্টের উচ্চাকাঙ্ক্ষার পালেও হাওয়া লাগল। ব্যারনের শিকারের শিঙা আরও জোরে বাজতে শুরু করল। বিশাল দল নিয়ে সে প্রতি রাতে শিকারে বেরোত।
প্রায় রাতেই ভোজ আর নাচ-গান হত। কখনও কখনও দলবেঁধে ঘুরতে বেরোত সবাই। সাধারণ মানুষেরা তাকিয়ে দেখত এইসব জৌলুস। থিবল্ট আফসোস করত, কেন ও লর্ড হয়ে জন্ম নেয়নি। কেন সঙ্গী হিসেবে কোন লেডিকে ও পাবে না। অ্যানলেট তো হতদরিদ্র আর মাদাম পুলে একটা জরাজীর্ণ মিলের মালিক।
