নেপোমুশেন, তোমাকে আমি চিনি। সবসময় তুমি ড্রিংক করার তালে থাকো। উপলক্ষ না থাকলে সুযোগ তৈরি করে নাও। ভুলে গেছ, ডাক্তার তোমাকে মদ খেতে নিষেধ করেছে?
তা ঠিক। তাই বলে তো ভদ্রতা প্রদর্শন করতে নিষেধ করেনি। সুজান, এই রুক্ষ মনোভাবটা তোমাকে মানাচ্ছে না। বাইরের কেউ শুনলে ভাববে একটা গাউন নিয়ে ঝগড়া বাধিয়ে দিয়েছ। এই ভদ্রলোককে আমাদের সাথে বাড়ি যেতে রাজি করাও। যদি পারো, বাড়িতে পা দেয়া মাত্র তোমার পছন্দের সিল্কের জামা কেনার টাকা আমি দেব।
এই কথায় জাদুমন্ত্রের মতো কাজ হলো। মাছ ধরার পালাও শেষের পথে। মহিলা থিবল্টের বাড়িয়ে দেয়া হাত জড়িয়ে ধরল।
ওদিকে থিবল্ট তো মহিলার রূপে মুগ্ধ। স্বামী-স্ত্রীর কথা থেকে বুঝতে পারল, মহিলা একজন ম্যাজিস্ট্রেটের স্ত্রী। বেরোবার সময় ভিড় আলগা করার দায়িত্ব নিষ্ঠার সাথে পালন করল ও।
থিবল্ট ভাবছে এই বেইলিফের স্ত্রীর পছন্দের লোক হিসেবে কী কী সুবিধা ও ভোগ করতে পারবে। মহিলা তার নিজের সুখ কল্পনায় বিভোর। থিবল্টের দিকে তেমন একটা মনোযোগও দিচ্ছে না। মহিলার ক্ষুদে সঙ্গী ওদের পাশে হাস্যকর ভঙ্গীতে হাঁটছে আর গল্প করছে। বলতে গেলে যাত্রাপথটা সেই জমিয়ে রেখেছে।
একাদশ অধ্যায় – ডেভিড আর গোলাইয়াথ
ওরা হেঁটে হেঁটে বাড়ি পর্যন্ত গেল। বেইলিফ সাহেব সিঁড়ি টপকে গিয়ে বেশ কষ্ট করে ঘণ্টা বাজাল। বাড়ির কর্তা অতিথিসহ বাড়ি ফিরেছে। এক সুবেশী গৃহপরিচারিকা এসে দরজা খুলে দিল। তাকে নিচু কণ্ঠে খাবার আয়োজনের নির্দেশ দিয়ে ঘুরল ছোটখাটো মানুষটা। আসুন, বেইলিফ নেপোষুশেন ম্যাগলোয়ার বাড়িতে আপনাকে স্বাগতম।
মাদামকে আগে যেতে দিল থিবল্ট। তারপর ও ড্রইংরুমে ঢুকল।
থিবল্ট মুগ্ধ হয়ে ঘরের চাকচিক্য লক্ষ করছিল। এমন সুযোগ এর আগে কখনও পায়নি ও। মাদাম তাচ্ছিল্যের সঙ্গে লক্ষ করল ওর মুগ্ধতা। কিন্তু স্বামীর মন রক্ষার্থে অতিথিকে হাসিমুখে অভ্যর্থনা জানাল। একটু পর অবশ্য ক্লান্তির কথা বলে ঘরে চলে গেল সে। যাওয়ার আগে, থিবল্ট যেন ওদের বাড়িতে আবার আসে, এই আশা ব্যক্ত করে হাসিমুখে বিদায় নিল।
মাদাম চলে যেতেই মঁসিয়ে ম্যাগলোয়া সে উপলক্ষে পান করার তোড়জোড় শুরু করল। কোন জমায়েতে বা বল-রুমে মেয়েরা আকর্ষণীয় বটে, কিন্তু মদের আসরে, পুরুষের চেয়ে উত্তম সঙ্গী আর হয় না। কী বলে?
পরিচারিকা পেরিন এসে জানতে চাইল কোন ওয়াইনটা আনবে। কিন্তু ওয়াইনের ব্যাপারে কোন মেয়েকে বিশ্বাস করতে রাজি নয় বাড়ির কর্তা। তাই জবাবে পেরিনকে নিচু হতে বলল ম্যাগলোয়া। ও ঝুঁকতে একটা চুমু খেল ওর গালে। কিন্তু মোটেই লজ্জা পেল না মেয়েটা। সম্ভবত এটা অভিজাতদের স্বাভাবিক আচরণ।
মেয়েটা হাসিমুখে আবার জানতে চাইল, স্যার, কোটা আনব?
কোনটাই না, পেরিন। ভাল ব্র্যান্ড সংখ্যায় এত আছে, যে সঠিকটা তুমি খুঁজেই পাবে না। তাই আমিই সেলারে যাচ্ছি। ছোট ঘোট পায়ে দম দেয়া খেলনার মতো করে হেঁটে সেলারের উদ্দেশে রওনা হয়ে গেল সে। পার্থক্য, এই পুতুলটার দম ঈশ্বর নিজে দিয়েছেন! থিবল্ট নিজের ভাগ্যকে ধন্যবাদ দিল। নিতান্ত কপালগুণেই এমন বিলাসবহুল বাড়িতে বসবাসরত সৌহার্দ্যপূর্ণ স্বামী এবং সুন্দরী স্ত্রীর সাথে পরিচয় হয়েছে ওর। মিনিট পাঁচেক পর দরজা খুলে বেইলিফ দুহাতে আর দুবগলে দুটো দুটো চারটা বোতল নিয়ে ফেরত এল।
এরইমধ্যে সাপারের সময় হয়ে গেছে। যে সময়ের কথা, তখন ডিনার হত মধ্য দুপুরে এবং সাপার ছটা নাগাদ। ছটা বাজার আগেই অবশ্য সন্ধ্যা নেমে গেছে। তা ছটাই বাজুক কি বারোটা, যদি আলো জ্বালিয়েই খেতে বসতে হয়, তাহলে সেটাকে সাপার বলাই ভাল!
বোতল নামিয়ে ঘন্টা বাজাল বেইলিফ। পেরিন আবার এসে ঢুকল।
খাবার কখন সাজানো হবে? ম্যাগলোয়া প্রশ্ন করল।
যখন আপনি চাইবেন। জানি আপনি দেরি পছন্দ করেন না, তাই আমি সবসময় প্রস্তুত থাকি।
তাহলে যাও, মাদামকে জিজ্ঞেস করো আসবে কি না। এটাও বলল, আমরা অপেক্ষা করছি।
পেরিন চলে গেল।
চলো বন্ধু, খাবার ঘরে গিয়ে অপেক্ষা করি। নিশ্চয়ই তোমার ক্ষুধা পেয়েছে। আর ক্ষুধা পেলে পেট ভরাবার আগে চোখ ভরাই আমি!
মনে হচ্ছে আপনি বেশ পেটুক মানুষ!
ভোজনরসিক…ভোজনরসিক, পেটুক না! দুটোকে গুলিয়ে ফেলো না। আমি আগে যাচ্ছি, পেছন পেছন এসো।
মঁসিয়ে ম্যাগলোয়া তার অতিথিকে খাবার ঘরে নিয়ে এল। তারপর থিবল্টের পিঠ চাপড়ে জিজ্ঞেস করল, রাধুনী হিসেবে মেয়েটাকে তোমার কেমন মনে হচ্ছে? আয়োজনটা দেখো, খুবই সাধারণ। কিন্তু আমার মন ভরে গেছে। আমার বিশ্বাস, বালশাজারের ভোজও সামলাতে পারবে ও।
আপনি ঠিকই বলেছেন, মাননীয় বেইলিফ। দেখেই যে কারও মন ভরে যাবে। থিবল্টের চোখও উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
খুব জমকালো আয়োজন না হলেও, দেখে মনে হচ্ছে বেশ উপাদেয় হবে। টেবিলের এক মাথায় রাখা আছে নানা রকম মসলা দিয়ে সিদ্ধ করা বড়সড় একটা মাছ। অন্য প্রান্তে শোভা পাচ্ছে বন্য শূকরের মাংস আর পালং শাক দিয়ে প্রস্তুত করা সুস্বাদু চেহারার ঝোল। এছাড়াও রয়েছে দুটো তিতির পাখি দিয়ে বানানো একটা মাংসের পাই এবং আরও কিছু আনুষঙ্গিক ডিশ। থিবল্ট খাবার দেখে এতটাই মুগ্ধ হয়েছিল, পেরিনের ফিরে আসাটা লক্ষই করেনি। মাদাম অতিথির কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছে এই বলে যে তার খুব মাথা ধরেছে। পরেরবার এলে অতিথির উপযুক্ত সত্ত্বার করবে।
