মিল মালকিন মাথা নাড়তে লাগল। ওদিকে থিবল্ট বলে চলেছে, সংক্ষেপে, আপনার এমন কাউকে খুঁজে নেয়া উচিত যাকে আপনি সম্মান করতে পারবেন। যে মিলটাকে এখনকার চেয়েও লাভজনক ভাবে চালাতে পারবে, আপনার দেখাশোনা করতে পারবে।
এমন একটা লোক আমি কোথায় পাব? মহিলা উঠে দাঁড়াল। যেন চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিল থিবল্টের দিকে। মহিলার কথার সুরটা ধরতে না পেরে থিবল্ট ভাবল, এটাই হচ্ছে ওর ইচ্ছার কথা জানানোর সুযোগ।
এখন আমাকে বলতেই হচ্ছে। আপনার মতো সুন্দরীকে স্বামী খুঁজতে বেশিদূর যেতে হবে না। আমি যখন আপনার জন্য যোগ্য লোকের বর্ণনা দিচ্ছিলাম, তখন আসলে আমার কথাই বলছিলাম। আপনার স্বামী হতে পারলে নিজেকে সৌভাগ্যবান ভাবব আমি।
মহিলা চোখে বিবমিষা নিয়ে থাকল থিবল্টের দিকে। কিন্তু ওর সে খেয়াল নেই, বলে চলেছে, আমি কখনও আপনার ইচ্ছার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াব না। আমার একটাই নীতি এবং ইচ্ছা আছে। নীতি আপনার কথা অনুসারে চলা, আর ইচ্ছা আপনাকে সুখী করা। আপনার সম্পদ বাড়ানোর মতো ক্ষমতাও আমার আছে, সে ব্যাপারে আপনাকে পরে বলব… আর…
বক্তব্যটা শেষ করতে পারল না থিবল্ট।
কী! এতক্ষণ চেপে রাখায় রাগটা অনেক বেশি তীব্রভাবে প্রকাশ পেল মাদাম পুলের কণ্ঠে। তুই! যাকে আমি বন্ধু ভেবেছিলাম, আমার হৃদয় দখল করতে চাইছিস! তোর ভাইয়ের চিন্তা থেকে আমাকে দূরে সরিয়ে রাখতে চাইছিস! বেরিয়ে যা, বদমাশ! বেরিয়ে যা এখান থেকে! না গেলে লোক দিয়ে তোকে মিলের চাকার নিচে ফেলব!
হিবল্ট কোন জবাব দেয়ার সুযোগ পেল না। হতভম্ব হয়ে গেছে। নিজের পক্ষে বলার মতো কিছু মাথায়ই আসল না ওর। ওদিকে চিৎকার চেঁচামেচি শুনে মিলের কর্মচারীরা এসে হাজির। দেখল তাদের মালকিন হাতের কাছে যা পাচ্ছে-জগ, চেয়ার, ইত্যাদি, তা-ই ছুঁড়ে-মারছে থিবল্টের দিকে। আর থিবল্ট কোনমতে সেগুলোকে এড়িয়ে যাচ্ছে। মালকিন চেঁচাচ্ছে, মেরে ফেলল ওকে! বদমাশ! শয়তান!
বিধবার দল ভারি হতে দেখে ভোলা দরজা দিয়ে বেরিয়ে এল ও। ঠিক এমন সময় ঘুমিয়ে থাকা বড়-সড় শুয়োরটা জেগে উঠল। চিৎকার শুনে ভয় পেয়ে দৌড় দিল ওটা। এসে পড়ল থিবল্টের পায়ের ওপর। ডিগবাজি খেয়ে কাদায় গড়িয়ে পড়ল থিবল্ট। রেগেমেগে চেঁচিয়ে উঠল, নরকে যা হারামজাদা!
.
বলতে যা দেরি, শুয়োরটা দিগ্বিদিক জ্ঞান হারিয়ে সব ভেঙে-চুরে দৌড় শুরু করল। কর্মচারীরা ওটাকে ধরার জন্য পেছন পেছন ছুটল। কিন্তু সবাইকে ফেলে দিয়ে শুয়োরটা দৌড়ে গেল। তারপর মিলের চাকার নিচে ঝাঁপ দিয়ে হারিয়ে গেল ওটা। মিল মালকিন পুরো দৃশ্যটা অবিশ্বাস নিয়ে দেখল। থিবল্টের অভিশাপ দেয়া এবং তারপরের সব ঘটনা। চেঁচিয়ে বলল সে, থিবল্টকে ধরো! পালাতে দিও না! ও একটা জাদুকর। একটা নেকড়ে-মানব! এই বন-জঙ্গলে এটা একটা ভয়ঙ্কর অভিযোগ। মিলের লোকেরা মালকিনের কথা শুনে থমকে গিয়েছিল। যতক্ষণে ওরা হাতে লাঠিসোটা তুলেছে, ততক্ষণে থিবল্ট খামার থেকে বেরিয়ে গেছে। পাহাড়টা সরাসরি পার হয়ে গেল ও। এত দ্রুত পার হলো যে মিল মালকিনের অভিযোগটাই যেন তাতে সত্য প্রমাণিত হলো।
কী হলো! থেমে গেলে কেন? ওর পিছু নাও, ধরো ওকে! তাগাদা দিল মাদাম পুলে।
কর্মচারীরা কিন্তু নড়তে নারাজ, কী লাভ মাদাম। নেকড়ে-মানবের বিরুদ্ধে আমরা কী-ই বা করতে পারি?
নবম অধ্যায় – নেকড়ে-অধিনায়ক
পালিয়ে সোজা বনের দিকে গেল থিবল্ট। ওখানে কেউ পিছু নিতে আসবে না। আসলেও কালো নেকড়ের কল্যাণে ও যে ক্ষমতা পেয়েছে, তাতে শক্রর হাত থেকে মুক্তি পাওয়া কোন ব্যাপারই না। সমস্যা হচ্ছে, একটা শুয়োরকে যেভাবে শয়তানের ভোগ পাঠানো যায়, মানুষকে সেভাবে পাঠানোটা ঠিক হবে না। ম্যাকোটের মৃত্যুটা এখনও ওর হৃদয়কে ভারি করে রেখেছে। মাঝেমাঝেই পেছন ফিরে দেখছে ও-কেউ পিছু নিয়েছে কি না। শরতের অন্ধকার রাত। বাতাসের ধাক্কায় শুকনো পাতা খসে পড়ছে গাছ থেকে। হাওয়া এ গাছে ও গাছে ধাক্কা খেয়ে বিষণ্ণ সুর তুলছে।
থেকে থেকে পাচার ডাক শুনে মনে হচ্ছে পথ হারানো মানুষের আওয়াজ। এগুলো ওর খুবই পরিচিত শব্দ। এসবে কান না দিয়ে বনে ঢুকেই ডাল কেটে চার ফুট লম্বা একটা লাঠি বানিয়ে নিল ও। এখন শত্রুর মোকাবেলা করতে তৈরি থিবল্ট। মেয়েদের শাপশাপান্ত করতে লাগল ও। কোন যুক্তি ছাড়াই জলজ্যান্ত একটা পুরুষ মানুষকে ছেড়ে একটা বাচ্চা ছেলেকে পছন্দ করা-কোন মানে হয় না! হঠাৎ পেছনে পায়ের শব্দ পেল ও। ঘুরে দেখল অন্ধকারে একজোড়া চোখ জ্বলজ্বল করছে। ভালো করে লক্ষ করে দেখল একটা নেকড়ে ওর পিছু নিয়েছে। কিন্তু এটা সেই কালো নেকড়েটা নয়। এর রঙ লালচে বাদামি। আকারেও মিল নেই। সব নেকড়েই তো আর প্রথম নেকড়ের মতো ওর প্রতি বন্ধুভাবাপন্ন হবে না। হাতের লাঠিটা কয়েক পাক ঘুরিয়ে নিল বিল্ট, যাতে প্রয়োজনের সময় ব্যবহার করতে পারে। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে, নেকড়েটার মধ্যে আক্রমণের কোন লক্ষণ নেই। ওর সাথে সাথে দাঁড়িয়ে পড়ছে ওটা, ও এগোলে এগোচ্ছে। মাঝে মাঝে ডাক ছাড়ছে দল ভারি করার জন্য। এই ডাকগুলো থিবল্টকে অস্বস্তিতে ফেলে দিচ্ছে। একটু পর সামনেও একজোড়া উজ্জ্বল বিন্দু চোখে পড়ল। লাঠি উঁচিয়ে এগোতে গিয়ে হোঁচট খেল থিবল্ট। নিচে একটা নেকড়ে শুয়ে ছিল। কোন চিন্তা ভাবনা না করেই নেকড়েটার মাথায় একটা বাড়ি মেরে বসল ও। ব্যথায় চিৎকার করে উঠে গেল জটা। তারপর মনিবের হাতে মার খাওয়া কুকুরের মতো কান নাড়তে নাড়তে ওর আগে আগে হাঁটা শুরু করল। থিবস্ট ঘুরে দেখতে পেল যে প্রথম নেকড়েটা এখনও ওর পেছন পেছন আসছে। ডানে বামে আরও দুটো নেকড়ে এসে হাজির হলো-আরও আসছে। মাইলখানেক যাওয়ার আগেই সংখ্যাটা এক ডজনে পৌঁছে গেল। থিবল্ট টের পাচ্ছে, পরিস্থিতিটা জটিল হয়ে পড়ছে। গান গাওয়ার চেষ্টা করল ও; আশা, মানুষের গলার আওয়াজ শুনে হয়ত নেকড়েগুলো ভয় পেতে পারে। কিন্তু কাজ হলো না। সবগুলো নেকড়ে কম্পাসের কাটার মতো ওর সাথে সাথে হাঁটতে লাগল। মোটা ডাল দেখে কোন গাছে উঠে দিনের আলোর অপেক্ষা করার চিন্তা মাথায় এলেও পরে ওটা বাতিল করে দিল থিবল্ট। সিদ্ধান্ত নিল বাড়ির দিকেই এগোবে। এখন পর্যন্ত নেকড়েগুলোর হাবভাব শত্রুভাবাপন্ন নয়। যদি বেগতিক দেখে, তখন গাছে উঠে গেলেই হবে। ও এতটাই অন্যমনস্ক ছিল, কখন যে বাড়ি পৌঁছে গেছে টেরই পায়নি। প্রথমটা চিনতেই পারেনি নিজের বাড়ি। ওকে বিস্মিত করে দিয়ে সামনের নেকড়েগুলো সম্মানের সাথে দুভাগ হয়ে দুলাইনে বসে পড়ল। যেন রাস্তা করে দিল ওর জন্য। তবে সেজন্য আর নেকড়েগুলোকে ধন্যবাদ জানাতে গেল না থিবল্ট। বরং সোজা ঢুকে পড়ল ঘরের ভেতরে। শুধু খিল লাগিয়েই ক্ষান্ত দিল না, একটা ভারি আসবাবও এনে রাখল দরজার সামনে। রাতে যদি আক্রমণ আসে, কিছুক্ষণ অন্তত ঠেকাতে পারবে। অবশেষে চেয়ারে বসে স্বস্তির শ্বাস ছাড়ল ও।
