এরপর থেসেউস, অয়েদিপুস, পেলেউস, অরফেয়ুস, জাসন আর হারকুলিস–একে একে এদের সবাইকে পর পর সাজিয়ে ফেলতে হবে, কারণ পোশাকে নক্সা করা সুতোর মত আমার মনে এদের নানা ক্রিয়াকলাপ আড়া-তেরছা হয়ে আছে। মিরন আর ফিদিয়াসকে নিয়ে পড়ারও সময় এসেছে, যদি তাদের মধ্যে সঙ্গতি পেতে হয়। সাত আর নয় বছরের যুদ্ধ নিয়েও সেই এক ব্যাপার। এই হারে চললে সব খিচুড়ি পাকিয়ে যাবে। যার স্মৃতিশক্তির এই হাল তার আর করার আছে কী। ভেবে দেখ, যখন আমার আশী বছর বয়স হবে তখন আমি কি রকম বুড়ো হয়ে যাব!
এসব বাদে, ওহে, বাইবেল! এখনও কতদিন গেলে তবে গোসলরতা সুজানার দেখা পাব? সাডোম আর গোমোরার পাপকর্ম বলতে কী বোঝায়। ইস, জানবার বুঝবার কত কী যে আছে! ইতিমধ্যে ফার্স্-এর লিসোরোকে তো আমি সম্পূর্ণ গাডড়ায় ফেলে রেখে দিয়েছি।
কিটি, দেখতে পাচ্ছ তো আমার কি রকম হাঁসফাস অবস্থা?
এবার একটা অন্য প্রসঙ্গ, তুমি অনেকদিন থেকে জান আমার সবচেয়ে বড় ইচ্ছে একদিন সাংবাদিক হওয়ার এবং পরে একজন নামকরা লেখক হওয়ার। মহত্ত্বের (নাকি উন্মত্ততার) দিকে এই ঝোক শেষ পর্যন্ত বাস্তবে দাঁড়ায় কিনা সেটা পরে দেখা যাবে, কিন্তু বিষয়বস্তুগুলো নিশ্চিন্তভাবে আমার মনে গাথা আছে। যেভাবেই হোক, ‘হেটু আখুটেরহুইস নাম দিয়ে একটা বই আমি যুদ্ধের পর প্রকাশ করতে চাই। পারব কি পারব না, বলতে পারছি না; তবে ডায়রিটা আমার খুব কাজে লাগবে। ‘হেট আখটেরহুইস’ ছাড়া আমার আরও নানা আইডিয়া আছে। তবে ওসব নিয়ে অন্য কোনো সময়ে আরও সবিস্তারে লিখব–যখন জিনিসগুলো আমার মনে আরও স্পষ্ট আকার নেবে।
তোমার আনা।
.
শনিবার, ১৩ মে, ১৯৪৪
প্রিয়তম কিটি, কাল ছিল বাপির জন্মদিন। মা-মণি আর বাপির বিয়ে হয়েছে আজ উনিশ বছর। যে মেয়েটি নিচে কাজ করতে আসে সে ছিল না এবং ১৯৪৪ সালে এমন ঝকঝকে রোদ আর কখনও দেখা যায়নি। আমাদের বনগোর গাছে এখন ফুল ফুটেছে, ঝাঁকড়া ঝাঁকড়া পাতায় গাছ এখন ভর্তি। গত বছরের চেয়েও গাছটাকে এবার বেশি সুন্দর দেখাচ্ছে।
বাপি পেয়েছেন কুপহুইসের কাছ থেকে লিনেয়াসের একটি জীবনবৃত্তান্ত, ক্রালারের কাছ থেকে একটি প্রকৃতিবিষয়ক বই, ডুসেলের কাছ থেকে জলপথে আমস্টার্ডাম’; ফান ডানের কাছ থেকে একটি বিশাল বাক্স, সুন্দর ভাবে মাজাঘষা করা এবং প্রায় পেশাদারের মতো সুসজ্জিত, তার ভেতর তিনটে ডিম, এক বোতল বীয়ার, এক বোতল দই, আর একটা সবুজ রঙের টাই। এর পাশে আমাদের দেওয়া এক পাত্র সিরাপ একেবারেই সামান্য। মিপ আর এলির কার্নেশনের চেয়ে গন্ধে মাত করেছিল আমার গোলাপ; কার্নেশনের গন্ধ না থাকলেও ফুলগুলো দেখতে ভারি সুন্দর ছিল। আদরে বাপির মাথা খাওয়ার ব্যবস্থা। পঞ্চাশটি চিত্র বিচিত্র পেট্রি এল। স্বর্গীয় ব্যাপার! বাপি নিজে হাতে আমাদের গুড়-আদায় তৈরি মশালাদার কেক দিলেন, ভদ্রলোকেরা পেলেন বীয়ার আর ভদ্রমহিলারা দই। খুব আমোদ-আহাদ হল।
তোমার আনা।
.
মঙ্গলবার, ১৬ মে, ১৯৪৪
প্রিয়তম কিটি,
একঘেয়েমি কাটাবার জন্যে, তোমাকে মিস্টার আর মিসেস ফান ডানের মধ্যে কালকের এক ছোট্ট কথোপকথনের কথা বলব–এসব জিনিস অনেকদিন তোমাকে বলা হয়নি।
মিসেস ফান ডান–জার্মানরা নিশ্চয় আটলান্টিক প্রাচির খুবই শক্ত করেছে, ইংরেজদের ঠেকাতে ওরা যে সর্বশক্তি নিয়োগ করবে তাতে সন্দেহ নেই। জার্মানদের দূর্জয় শক্তি দেখে অবাক হয়ে যেতে হয়।
মিস্টার ফান ডান–’হ্যাঁ, সত্যি অবিশ্বাস্য রকমের!’
মিসেস ফান ডান–’হ্যাঁ-আ!’
মিস্টার ফান ডান–জার্মানদের শক্তি এত বেশি যে, সব কিছু সত্ত্বেও, শেষ পর্যন্ত ওরা জিতবেই জিতবে।’
মিসেস ফান ডান–হতেই পারে, এর উল্টোটা হওয়ার ব্যাপারে এখনও আমি নিঃসন্দেহ নই।’
মিস্টার ফান ডান–’আমি আর এর উত্তর দেব না।‘
মিসেস ফান ডান–আমার কথার ওপর কথা তো তুমি বলোই; প্রত্যেকবারই আমাকে টেক্কা না দিয়ে তুমি পারো না।
মিস্টার ফান ডান–’নিশ্চয় না, তবে আমার উত্তরগুলো হয় যথাসম্ভব ছোট্ট।
মিসেস ফান ডান—’তাও উত্তর দিতে তুমি ছাড়ো না এবং মনে করো তুমি যা বলবে তাই ঠিক! তোমার ভবিষ্যদ্বাণী সব সময় সত্যি হয় না।’
মিস্টার ফান ডান–’সেটা ঠিক নয়। ঠিক হলে গত বছরই সৈন্য নামত আর ফিরা এতদিনে লড়াই থেকে বেরিয়ে যেত। শীতের মধ্যেই ইতালি খতম, আর লেমবার্গ ইতিমধ্যেই রুশদের কজায়। উহ, উঁহু, তোমার ভবিষ্যদ্বাণীর ওপর আমার খুব ভরসা নেই।’
মিস্টান ফান ডান (উঠে দাঁড়িয়ে) আর তোমাকে বকবক করতে হবে না। আমি যে ঠিক একদিন তোমাকে তা দেখিয়ে দেব; আজ হোক কাল হোক, দেখবার অনেক কিছু পাবে। তোমার এই গজগজ করা স্বভাব আমার সহ্য হয় না। তোমার কাজ হল মানুষকে চটানো, নিজের কর্মদোষে একদিন তুমি ভুগবে।’
আমি সত্যি না হেসে পারি নি। মা-মণিও তাই। পেটার জোর করে ঠোট বন্ধ করে রেখেছিল। বড়রা এমন বেআক্কেল! ছোটদের সাতকাহান শোনাবার আগে ওঁদের উচিত নিজেদের হাতেখড়ির ব্যবস্থা করা।
তোমার আনা।
.
শুক্রবার, ১৯ মে, ১৯৪৪
আদরের কিটি,
কালকের দিনটা, খুবই বাজে গেছে। পেট ব্যথা এবং অকল্পনীয় যাবতীয় কষ্টে সত্যিই শরীরটা ভালো ছিল না। আজ আমি অনেক ভালো। চনচনে ক্ষিধে হয়েছে, তবে আজ আমাদের যে শিম রাধা হচ্ছে সেটা আমি মুখে দেব না।
