মিপ যদি আমাদের নেমন্তন্ন বাড়িতে নিয়ে যেতেন, তাহলে অন্য অতিথিদের আর টিকিয়া খেতে হত না–আমরাই সব সাবাড় করে দিতাম। তোমাকে বলছি, মিপের চারধারে গোল হয়ে বসে আমরা যেন তাঁর মুখের প্রত্যেকটা কথা গিলছিলাম যেন, এত এত সুখাদ্যের কথা, এত এত চৌকশ লোকের কথা জীবনে কক্ষনো শুনিনি।
আর এঁরা হলেন কিনা লাখপতিদের নানী। দুনিয়া এক আজব জায়গা।
তোমার আনা
.
মঙ্গলবার, ৯ মে,১৯৪৪
আদরের কিটি,
আমার এলেন পরীর গল্পটা শেষ করেছি। চমৎকার নোট কাগজে গোটাটা কপি করেছি। বেশ সুন্দর দেখতে লাগছে, কিন্তু বাপির জন্মদিনে এটা কি সত্যই যথেষ্ট? আমি জানি না। মারগট, মা-মণি, দুজনেই ওঁর জন্যে কবিতা লিখেছে।
মিস্টার ক্রালার আজ বিকেলে ওপরতলায় এসে খবর দিয়ে গেলেন যে, মিসেস ব-, ব্যবসায় যিনি প্রদর্শিকা হিসেবে কাজ করতেন, তিনি রোজ মধ্যাহ্নের পর দুটোর সময় এখানে অফিস ঘরে তার ডাবা এনে লাঞ্চ খাবেন। ভেবে দেখ! এরপর আর ওপরতলায় কেউ উঠে আসতে পারবে না, আলু যোগানো বন্ধ হবে, এলির লাঞ্চ খাওয়া হবে না, আমাদের শৌচাগারে যাওয়া চলবে না, আমাদের নড়াচড়া বন্ধ, ইত্যাদি ইত্যাদি। ভদ্রমহিলাকে ভাগাবার জন্যে আমরা যত রাজ্যের অবাস্তব সব ফন্দি আঁটতে লাগলাম। ফান। ডান বললেন ওঁর কফিতে ভালোমত জোলাপ মিশিয়ে দিলেই যথেষ্ট কাজ হবে। উত্তরে কুপহুইস বলনে, না, আমি ব্যর্থতা করছি ওটা করবেন না। তাহলে আর আমরা ডাব্বাটা কখনই ওখান থেকে সরাব না। মিসেস ফান ডান জিজ্ঞেস করলেন, ‘ডাব্বা থেকে সরানো? তার মানে কী? ওঁকে ব্যাখ্যা করে বলা হল। তখন উনি বোকার মতো জিজ্ঞেস করলেন, ‘আমি কি ওটা সব সময় ব্যবহার করতে পারি?’ এলি খিলখিল করে হেসে বলল, ‘বোঝ ঠেলা। বিয়েনক-এ (আমস্টার্ডামের একটা বড়ো দোকান) গিয়ে কেউ যদি জিজ্ঞেস করে, ওরা বুঝতেই পারবে না কী বলা হচ্ছে।’
ও, কিটি। কী চমৎকার আবহাওয়া আজ! শুধু যদি একটু বাইরে বেরোতে পারতাম!
তোমার আনা।
.
বুধবার, ১০ মে, ১৯৪৪
আদরের কিটি,
কাল বিকেলে চিলেকোঠায় বসে আমরা কিছুটা ফরাসী নিয়ে নাড়াচাড়া করছি, এমন সময় আমার পেছনে হঠাৎ ছ্যাড় ছাড় করে পানি পড়তে লাগল। আমি পেটারকে জিজ্ঞেস করলাম, কী ব্যাপার? কোনো কথা না বলে পেটার ছুটে মটকায় উঠে গেল। সেখান থেকেই পানিটা আসছিল। পেটার ওপরে উঠে মুশ্চিকে জোরসে এক ঠেলা দিয়ে ওর স্বস্থানে সরিয়ে দিল। মাটির টব ভিজে বলে মুশ্চি ওটার পাশে গিয়ে বসেছিল। এই নিয়ে বেশ খানিকটা হল্লা আর চটাচটি হল। মুশ্চি ততক্ষণে তার কাজ সেরে সা করে ছুটে নিচে চলে গেছে।
মুশ্চি ছোক ছোঁক করে তার টবের সমগোত্রীয় কিছু খুঁজতে গিয়ে কিছু কাঠের কুচি পেয়ে গিয়েছিল। তার ফলেই মটকায় ভাসাভাসি হয়ে তৎক্ষণাৎ তার ধারা, দুর্ভাগ্যক্রমে, চিলেকোঠায় আলুর পিপের মধ্যে আর আশপাশে গড়িয়ে গড়িয়ে পড়তে থাকে। সিলিং থেকে টপটপ করে চিলেকোঠার মেঝেতে পড়ে কোথায় কোন্ ফুটো ফাটা দিয়ে কয়েকটা হলদে ফোঁটা খাবার চায়ের টেবিলে রাখা ডাই করা মোজা আর কয়েকটা বইয়ের ওপর পড়ে। হাসতে হাসতে তখন পেটে খিল ধরে যাচ্ছে আমার, যাকে অট্টহাসি বলে তাই। একটা চেয়ারের নিচে মুশ্চি কুণ্ডলী পাকিয়ে বসে, পেটারের হাতে পানি, ব্লিচিং পাউডার আর ন্যাতা এবং ফান ডান চেষ্টা করছেন সবাইকে প্রবোধ দিতে। কিছুক্ষণের মধ্যেই বিপদ থেকে উদ্ধার পাওয়া গেল। কিন্তু বেড়ালের নোংরা পানিতে যে বিকট গন্ধ হয়, এটা সবাই জানে। আলুর ক্ষেত্রে তা পরিষ্কার দেখা গেল এবং বাপি পোড়াবার জন্যে বালতি করে কাঠের যে কুচিগুলো এনেছিলেন, তারও একই দশা। বেচারা মুশ্চি। ছাইগাদা মেলা এখানে যে অসাধ্য, সেটাই বা তুমি জানবে কেমন করে?
তোমার আনা।
পুনশ্চ : আমাদের প্রিয় মহারানী কাল আর আজ আমাদের উদ্দেশে বাণী প্রচার করেছেন। হল্যাণ্ডে যাতে শক্তি সঞ্চয় করে ফিরতে পারেন তার জন্যে তিনি অবকাশ যাপন করতে চলেছেন। শীগগিরই যখন আমি ফিরব, দ্রুত মুক্তি, বীরত্ব আর গুরুভার–এইসব শব্দ তিনি ব্যবহার করেন।
এরপর হয় জেরব্রাণ্ডির একটি বক্তৃতা। অনুষ্ঠান শেষ হয় ঈশ্বরের কাছে এক ধর্মযাজকের প্রার্থনা দিয়ে, তাতে তিনি বলেন, ঈশ্বর যেন ইহুদিদের, বন্দীনিবাসে জেলখানায় আর জার্মানিতে যারা আছে তাদের রক্ষা করেন।
তোমার আনা।
.
বৃহস্পতিবার, ১১ মে, ১৯৪৪
আদরের কিটি,
ঠিক এখন, আমার হাঁফ ফেলার সময় নেই। কথাটা তোমার কাছে পাগলামি বলে মনে হলেও, হাতের একগাদা কাজ কখন কিভাবে সারব ভেবে কূলকিনারা পাচ্ছি না। তোমাকে এই কাজগুলোর একটা সংক্ষিপ্ত ফিরিস্তি দেব কি? তাহলে শোনো। কালকের মধ্যে গালিলিও গ্যালিলি’ বইটা আমাকে শেষ করতেই হবে, কেননা ওটা তাড়াতাড়ি লাইব্রেরিতে ফেরত দেওয়ার কথা। আমি কাল সবে শুরু করেছি, তবে এর মধ্যে ঠিক শেষ করে ফেলব।
পরের হপ্তায় আমাকে পড়তে হবে ‘প্যালেস্টাইন অ্যাট দি ক্রসরোড’ আর ‘গালিলি’র দ্বিতীয় খণ্ড। এরপর কাল আমি ‘সম্রাট পঞ্চম চার্লস্’-এর জীবনীর প্রথম পর্ব পড়া শেষ করেছি এবং এ থেকে আমার সংগৃহীত সারনী আর বংশলতিকা তৈরির কাজ শেষ করতে হবে। এরপর বিভিন্ন বই থেকে যোগাড় করা যাবতীয় বিদেশী শব্দ পাঠ, আর লেখা রপ্ত করতে হবে। চার নম্বর হল, আমার চিত্রতারকারা সব তালগোল পাকিয়ে আছে এবং ওদের উদ্ধার করে গুছিয়ে না ফেললেই নয়। এইসব সারতে কয়েকটা দিন লেগে যাবে। যেহেতু প্রফেসর আনা, এই বলে এখনই ডাকা হচ্ছে, গলা পর্যন্ত কাজ–সেইজন্যে এই জট সহজে ছাড়বে না।
