পেটার আর আমার ব্যাপারটা নির্ঝঞ্ঝাটে চলেছে। পেটার বেচারার একটু ভালবাসা পাওয়া একান্তই দরকার আমার চেয়েও বেশি। রোজ সন্ধ্যেবেলায় আসার সময় ওকে যখন একটি চুমো খাই, ও লজ্জায় লাল হয়ে ওঠে এবং আরেকটি একেবারেই চেয়েচিন্তে নেয়। ভাবি আমি ঠিকমত বোখার জায়গা নিতে পেরেছি কি তাতে দুঃখ নেই, ও যখন এটা জেনে খুশি যে ওকে কেউ ভালবাসার আছে।
অনেক কষ্টার্জিত জয়ের পর এখন গোটা অবস্থাটা আমার হাতে এসে গেছে। আমি মনে করি না, আমার ভালবাসায় ভাটা পড়েছে। ও খুব মিষ্টি ছেলে, কিন্তু তবু আমি চটপট আমার ভেতরের সত্তায় তালা লাগিয়ে গিয়েছি। ও যদি সে তালা ভাঙতে চায়, ওকে আগের চেয়ে ঢের বেশি রকম কাঠখড় পোড়াতে হবে।
তোমার আনা।
.
শনিবার, ২০ মে, ১৯৪৪
আদরের কিটি,
কাল সন্ধ্যেবেলায় চিলেকোঠা থেকে নিচে নেমে এসে ঘরে ঢুকতে গিয়ে দেখি কার্নেশন। ফুলসুদ্ধ সুন্দর ফুলদানিটা মেঝেয় লুটোচ্ছে। মা-মণি হামাগুড়ি দিয়ে দিতে ন্যায় পানি মুচছেন আর মারগট মেঝে থেকে কয়েকটা কাগজ কুড়িয়ে নিচ্ছে।
আমি ভয়ে কাঁটা হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কী হয়েছে এখানে? এবং এমন কি উত্তরের জন্যে অপেক্ষা না করেই দূর থেকে ক্ষতির পরিমাণটা আঁচ করার চেষ্টা করলাম। আমার বংশপঞ্জীর পুরো ফাইল, খাতাপত্র, পড়ার বই সবকিছু ভিজে ঢোল। আমার তখন কাদো কাদো অবস্থা এবং রাগে আর ক্ষোভে কী যে বলেছি না বলেছি আমার ছাই মনেও নেই। মারগটের কাছে শুনলাম আমি ‘অপরিমেয় ক্ষতি’, ভয়ঙ্কর, সাংঘাতিক, এ ক্ষতি কখনও আর পূরণ হবে না। এবং আরও কি সব নাকি বলেছিলাম। বাপি হাসি চাপতে পারেননি, মা-মণি আর মারগটও তাই। আমার মাটি হওয়া এত পরিশ্রম আর এত খেটে করা সারনীগুলো তার জন্যে কিন্তু আমি অনায়াসে কাঁদতে পারতাম।
একটু খুঁটিয়ে দেখার পর বুঝলাম আমার ‘অপরিমেয় ক্ষতি’ আমি যতটা ভেবেছিলাম ততটা গুরুতর নয়। চিলেকোঠায় গিয়ে জুড়ে যাওয়া পাতাগুলো বের করে সেগুলো আলাদা করে ফেললাম। তারপর সমস্ত কাগজ নিয়ে কাপড় শুকোবার তারে টাঙিয়ে দিলাম। দেখতে যা মজার হল কী বলব; আমি নিজেই না হেসে পারিনি। পঞ্চম চার্লস, অরাঞ্জ-এর ভিলিয়াম আর মারী আঁতোয়ানেৎ এর পাশে মারিয়া দা মেদিচি। এ বিষয়ে মিঃ ফান ডানের রসিকতা হল–এটা একটা বর্ণবৈষম্যগত বলকার’। আমার কাগজগুলোর ভার পেটারকে দিয়ে আমি নিচের তলায় ফিরে গেলাম।
বইগুলো উল্টেপাল্টে দেখছিল মারগট। ওকে আমি জিজ্ঞেস করলাম, কোন বইগুলো নষ্ট হয়েছে? মারগট বলল, ‘বীজগণিত।’ তাড়াতাড়ি ওর কাছে গিয়ে দেখলাম বীজগণিতের বইটাও নষ্ট হয়নি। ওটা ফুলদানির ভেতরে পড়লেই ভালো হত; ঐ বইটা আমি দুচক্ষে পড়ে দেখতে পারি না। সামনের দিকে কম করে বিশটি মেয়ের নাম, বইটা আগে যাদের ছিল। পুরনো ঝরঝরে বই, পাতাগুলো হলদে হয়ে এসেছে, পাতায় পাতায় হিজিবিজি লেখা আর কাটাকুটি। এরপর কখনও যদি আমার মেজাজ খুব বিগৃড়ে যায়, বইটা আমি ছিঁড়ে কুটি কুটি করে ফেলব।
তোমার আনা।
.
সোমবার, ২২ মে, ১৯৪৪
আদরের কিটি,
২০শে মে মিসেস ফান ডানের সঙ্গে একটা বাজীতে বাপি হেরেছেন পাঁচ বোতল দই। আক্রমণ আজও হয়নি। এ কথা বললে অতিশয়োক্তি হবে না যে, সারা আমস্টার্ডাম, সারা হলান্ড, হ্যাঁ, একেবারে স্পেন পর্যন্ত ইউরোপের সারা পশ্চিম উপকূলে লোকে দিন রাত আক্রমণের কথা বলছে, তাই নিয়ে কথা কাটাকাটি করছে আর বাজী ধরছে আর… আশা করে আছে।
কী-হয় কী-হয় ভাবটা ক্রমশ চড়ছে। যাদের আমরা সাচ্চা ডাচ বলে মনে করলাম তারা সবাই ইংরেজদের প্রতি বিশ্বাসে অটল আছে, মোটেই তা নয়; প্রত্যেকেই যে ইংরেজদের ধোকা দেওয়াটাকে রণনীতির ক্ষেত্রে একটা ওস্তাদের মার বলে মনে করে, তাও নয়। আসলে লোকে শেষ পর্যন্ত দেখতে চায় কাজ, বড় দরের বীরত্বপূর্ণ কাজ। কেউই নিজের নাকের বাইরে কিছু দেখছে না, কেউ মনে করছে না ইংরেজরা তাদের নিজের দেশের জন্যে আর তাদের নিজ দেশবাসীর জন্যে লড়ছে; প্রত্যেকেই ভাবছে যত তাড়াতাড়ি পারে এবং যত ভালোভাবে পারে হল্যাণ্ডকে রক্ষা করাই ইংরেজদের কর্তব্য।
আমাদের জন্যে ইংরেজদের কিসের দায়? ডাচরা খোলাখুলি যে উদার সাহায্য চাইছে, সেটা তারা কী দিয়ে অর্জন করল? ডাচদের সেটা ভাবা ভুল হবে। ইংরেজরা যতই ধোকা দিয়ে থাকুক, অনধিকৃত ছোট বড় অন্য দেশগুলোর চেয়ে তাদের ঘাড়ে বেশি দোষ চাপানো ঠিক নয়। জার্মানি যখন নতুন করে নিজেকে অস্ত্র সজ্জিত করছিল, এটা আমরা অস্বীকার করতে পারি না যে, তখন অন্য সব দেশ, বিশেষ করে, যারা ছিল জার্মানির সীমান্তে, তারা সবাই নাক ডাকিয়ে ঘুমোচ্ছিল। সুতরাং ঐ বছরগুলেতে ইংরেজরা ঘুমোচ্ছিল বলে এখন যদি আমরা বকাঝকা করি, ওদের তার জন্যে ক্ষমা চাইতে ভারি বয়েই গেছে। উট পাখির মতো বালিতে মুখ গুঁজে থেকে আমাদের কোনোই লাভ হবে না। ইংল্যাণ্ড আর সারা দুনিয়া তা ভালোভাবে দেখেছে; সেই জন্যেই ইংরেজদের যে বিরাট ক্ষতি স্বীকার করতে হবে, সেটা অন্য কারো চেয়ে কিছু কম হবে না।
কোনো দেশই শুধু শুধু তার লোকবল খোয়াতে চায় না, অন্য কোনো দেশের স্বার্থে তো আদবেই নয়। ইংল্যাণ্ডও তা করবে না। স্বাধীনতা আর মুক্তি নিয়ে একদিন আক্রমণ এসে যাবেই; কিন্তু তার দিন ধার্য করতে ইংল্যাণ্ড আর আমেরিকা–সমস্ত অধিকৃত দেশ হাজার এক রা হয়েও তা পারবে না।
