‘হয়ত তুমি তা বলতে চাওনি, কিন্তু তুমি তা লিখেছ। না, আনা, তোমার কাছ থেকে এ ভৎসনা আমাদের প্রাপ্য নয়।’
ইস, আমি ডাহা হেরে গিয়েছি। আমার জীবনে সবচেয়ে উঁছা কাজ নিঃসন্দেহে এটাই। কেঁদেকেটে, চোখের পানি ফেলে আমি কেবল চেষ্টা করছিলাম দেখাতে, নিজেকে বড় বলে প্রতিপন্ন করতে, বাপি যাতে আমাকে মান্য করেন।
আমি অনেক দুঃখ পেয়েছি সন্দেহ নেই, কিন্তু যে পিম এত ভালো, যিনি বরাবর এবং আজও আমার জন্যে কী না করেছেন, তাকে দোষ দেওয়া না, সেটা এত নীচ যে। বলার নয়।
অগম্য পাদপীঠ থেকে একটি বার অন্তত আমাকে টেনে নামানো, আমার অহঙ্কারকে খানিকটা ডানা ধরে নাড়িয়ে দেওয়া–এটা ঠিক কাজ হয়েছে; কেননা নিজেকে নিয়ে আমি আবার অত্যন্ত বেশি রকম মাতামাতি করে ফেলছিলাম। মিস আনা যাই করে তাই সবসময় নির্ভুল নয়। অন্য কাউকে, বিশেষ করে যিনি ভালবাসেন বলেন, তার মনে ব্যথা দেওয়া এবং তাও ইচ্ছে করে–কাজটা গর্হিত, অত্যন্ত গর্হিত।
বাপি যেভাবে আমাকে ক্ষমা করে দিলেন, তাতে নিজের সম্পর্কে আমি আরও বেশি লজ্জিত হলাম; চিঠিটা বাপি আগুনে ফেলে দেবেন; আমার সঙ্গে তিনি এমন মধুর ব্যবহার করলেন যে, মনে হল যেন তিনিই দোষ করেছিলেন। না, আনা, তোমাকে এখনও অনেক কিছু শিখতে হবে, অন্যদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা আর দোষ দেওয়ার বদলে আগে সেই শেখার কাজ করো।
আমাকে দুঃখ পেতে হয়েছে বিস্তর; আমার বয়সী কাকে পেতে হয়নি? আমি ভাড়ও সেজেছি বিস্তর, কিন্তু ঠিক সজ্ঞানে নয়। নিজের সম্পর্কে আমার খুবই লজ্জিত হওয়া উচিত; আমি যথার্থই লজ্জিত।
যা হয়ে গেছে, আর তার চারা নেই। কিন্তু আর যাতে না হয়, তার ব্যবস্থা হতে পারে। আমি আবার গোড়া থেকে শুরু করতে চাই; পেটার রয়েছে, এখন আর সেটা শক্ত হবে না। ও যখন আমার সহায়, আমি পারব এবং করব।
আমি আর একা নই, পেটার আমাকে ভালবাসে। আমি পেটারকে ভালবাসি। আমার বই আছে, গল্পের বই আছে, ডায়রি আছে; আমি ভীষণ রকমের কুৎসিত নই, অসম্ভব বোকা নই; আমার হাসিখুশি মেজাজ; এবং আমি চাই ভালো রকম চরিত্রবল পেতে।
হ্যাঁ, আনা, তুমি এটা গভীরভাবে উপলব্ধি করেছ যে, তোমার চিঠিটা ছিল অত্যন্ত রূঢ় এবং সেই সঙ্গে অসত্য। তুমি তার জন্যে এমন কি গুমর করতে, ভাবো তো। আমি বাপিকে দৃষ্টান্ত হিসেবে নেব এবং আমি নিজেকে উন্নত করবই করব।
তোমার আনা।
.
সোমবার, ৮ মে, ১৯৪৪
আদরের কিটি,
আমাদের পরিবার সম্পর্কে তোমাকে কখনও কি সেভাবে কিছু বলেছি?
বলেছি বলে মনে হয় না; কাজেই এখন শুরু করব। আমার বাবার মা-বাবারা খুব বড়লোক ছিলেন। আমার ঠাকুরদা নিজের চেষ্টায় ছোট অবস্থা থেকে বড় হয়েছিলেন এবং আমার ঠাকুমা এসেছিলেন নামী পরিবার থেকে। ওঁরাও ছিলেন বড়লোক। সুতরাং কম বয়সে বাপি ঐশ্বর্যের মধ্যে মানুষ হয়েছিলেন; ছিল হপ্তায় হপ্তায় পার্টি, বল নাচ, উৎসব-পরব, সুন্দরী সুন্দরী মেয়ে, ভূরিভোজ, বিরাট একটা বাড়ি, ইত্যাদি, ইত্যাদি।
মা-মণির মা-বাবারাও পয়সাওয়ালা ছিলেন এবং আমরা প্রায়ই হাঁ হয়ে যাই তখন শুনি বাগ্দান উপলক্ষে আড়াইশো লোকের পার্টি, ঘরোয়া বল নাচ আর ভূরিভোজের গল্প। আজ আমাদের কেউই আর বড়লোক বলবে না, আমার সব আশা যুদ্ধ শেষ হওয়া পর্যন্ত শিকেয় তুলে রেখেছি।
তোমাকে এই বলে দিলাম, মা-মণি আর মারগটের মত চিড়েচ্যাপটা আর কোণঠাসা হয়ে বাঁচতে আমি মেটেই ইচ্ছুক নই। আমার কী ইচ্ছে করে এক বছর প্যারিসে আর এক বছর লন্ডনে ভাষা নিয়ে আর আর্টের ইতিহাস নিয়ে পড়াশুনো করে আসতে। সেখানে মারগটের ইচ্ছেটা কী দেখ–ও চায় প্যালেস্টাইনে গিয়ে ধাত্রীবিদ্ হতে। আমি সবসময় সুন্দর পোশাক আর মজাদার লোক দেখার জন্যে হেদিয়ে মরি।
আমি চাই দুনিয়াটা একটু ঘুরে দেখতে এবং এমন সব জিনিস করতে যা আমার প্রাণ মাতাবে। এ জিনিস আগেও আমি তোমাকে বলেছি। আর সেই সঙ্গে কিঞ্চিৎ পয়সা এলে পোয়া বারো।
আজ সকালে মিবললেন, কাল উনি এক বাগদানের দাওয়াতে গিয়েছিলেন। হবু-বর আর হবু-বউ, দুজনই খুব পয়সাওয়ালা ঘরের।
আয়োজন হয়েছিল খুবই বড় মাপের। আমাদের জিভে পানি এসে যাচ্ছিল মিপ যখন খাবারের ফিরিস্তি দিচ্ছিলেন–মাংসের বড়া দিয়ে সব্জির সুপ, পনির টিকিয়া, সেই সঙ্গে ডিম আর রোস্ট বীফ দিয়ে করা রুচিবর্ধক, চিত্রবিচিত্র কেক, শরাব আর সিগারেট–যে যত খেতে পারে (কালোবাজারী)। মিপ মদ নিয়েছেন দশ দফা–শুনি এই ভদ্রমহিলাই নাকি মদ ছোঁন না? মিপই যদি এই কাণ্ড করে থাকেন, ওঁর স্বামীটি তাহলে কত গ্লাস নামিয়েছেন? স্বভাবতই নিমন্ত্রিতরা সবাই খানিকটা মাতাল হয়েছিলেন। নিমন্ত্রিতদের মধ্যে ছিলেন ফাইটিং স্কোয়াডের দুজন পুলিস অফিসার; তাঁরা বাগদত্তদের ফটো তোলেন। মিপ্ তক্ষুনি ঐ দুজনের ঠিকানা লিখে নেন এই ভেবে যে, কখনও কিছু যদি হয় তো ঐ দুই ডাচ সজ্জনের সাহায্যে মিলতে পারে–এ থেকে বোঝা যায়, মিপ্ যখন যেখানেই থাকুন, আমাদের কথা ওঁর সবসময় মনে থাকে।
মিপের গল্পে আমাদের জিভে পানি এসেছিল। হায় রে, প্রাতরাশে আমাদের জোটে মাত্র দুই চামচ ডালিয়া; আমরা যাদের পেট এত খালি যে ক্ষিধের ভোঁচকানি লেগে যায়। আমরা যারা খেতে পাই–দিনের পর দিন শুধু আধসেদ্ধ পালং শাক (ভিটামিন বজায় রাখার জন্যে) আর পচা আলু; আমরা, যারা সেদ্ধ বা কাঁচা লেটুস, পালং এবং তারপর আবার পালং ছাড়া খালি পেটে দেবার আর কিছু পাই না। হয়ত এখনও পোপেইয়ের মতো পালোয়ান হয়ে ওঠার সময় আছে, কিন্তু বর্তমানে তার তো কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
