১৯৪২-এর জুলাই থেকে কয়েক সপ্তাহ আগে পর্যন্ত, সেই যবে থেকে আমরা এখানে আছি দিনগুলো আমার খুব সুখে কাটেনি। তুমি যদি জানতে, সন্ধ্যে হলে আমি কত যে কেঁদেছি, কত যে অসুখী ছিলাম আর কত যে নিঃসঙ্গ বোধ করেছি–তাহলে তুমি বুঝতে কেন আমি ওপরে যেতে চাই।
এখন আমি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছি যখন আমি সম্পূর্ণভাবে নিজের ভরসায় বাঁচতে পারি–মা-মণি বা, সেদিক থেকে, আর কারো ওপরই আমাকে নির্ভর করতে হবে না। কিন্তু এ জিনিস রাতারাতি ঘটেনি; লড়াইটা হয়েছে কঠিন আর তীব্র এবং আজ এই যে আমি আত্মনির্ভর হয়েছি তার পেছনে আছে অনেক অশ্রুজল। তুমি আমাকে ঠাট্টা করতে পারো এবং আমার কথা বিশ্বাস করতে পারো, নাও করতে পারো, তাতে আমার কোনো ক্ষতি হবে না। আমি জানি আমার কাছে এক পৃথক ব্যক্তিসত্তা এবং তোমাদের কারো কাছে আমার একটুও কোনো দায় নেই। আমি তোমাকে এটা বলছি তার একটাই কারণ; না বললে পাছে তুমি আমাকে মনে-এক, মুখে-আর এক ভাবো। কিন্তু আমি কী করি না করি তার জমা-খরচ আর কাউকে আমার দেবার নেই।
‘আমার কষ্টের সময় সবাই তোমরা চোখে ঠুলি আর কানে তুলো দিয়ে বসেছিলে, কেউ আমাকে সাহায্য তো করোই নি, উল্টে আঙুল নেড়ে বলার মধ্যে শুধু বলেছ আমি যেন হুড়মাতুনি না করি। যাতে সারাক্ষণ মুখ ভার করে থাকতে না হয় তারই জন্যে আমি হুড়মাতুনি করেছি। আমি গোয়ার্তুমি করেছি যাতে আমার ভেতরকার পরিত্রাহি স্বর সারাক্ষণ আমাকে শুনতে না হয়। দেড় বছর ধরে দিনের পর দিন আমি প্রহসন চালিয়ে গিয়েছি; গাইগুই করা, খেই হারিয়ে ফেলা, সেসব কখনও হয়নি–আর আজ, সে লড়াই আজ ফতে। আমার জিৎ হয়েছে। দেহে বলো, মনে বলো আমি এখন স্বাধীন। এখন আর আমার মায়ের। দরকার নেই, এইসব ঠোকাঠুকি আমাকে পোক্ত করে তুলেছে।
‘আর আজ, আমি আজ যখন এসব ছাড়িয়ে উঠেছি, আজ তখন জানি আমার যা লড়াই তা করেছি, সেই সঙ্গে এখন আমি চাই যাতে আমার নিজের রাস্তায় চলতে পারি, যে রাস্তা আমি ঠিক বলে মনে করি। আমাকে চৌদ্দ বছরের মেয়ে বলে মনে করলে চলবে না, কারণ এই সব কষ্ট দুঃখ আমার বয়স বাড়িয়ে দিয়েছে; আমি যা করেছি তার জন্যে আমি দুঃখবোধ করব না, বরং আমি যা পারি বলে মনে করি তাই করে যাব। বাপু-বাছা বলে আমার ওপরে যাওয়া তুমি আটকাতে পারবে না; হয় তুমি সেটা নিষিদ্ধ করে দেবে, নয় আমাকে তুমি সর্ব অবস্থায় বিশ্বাস করবে, কিন্তু সেক্ষেত্রে আমাকে সেই সঙ্গে শান্তিতে থাকতে দিও?’
তোমার আনা।
.
শনিবার, ৬ মে, ১৯৪৪
আদরের কিটি,
কাল সন্ধ্যেবেলায় খেতে বসার আগে বাপির পকেটে আমি একটা চিঠি রেখে দিই; কাল তোমাকে যেসব জিনিস খোলাসা করে জানিয়েছিলাম, চিঠিতে সেই সবই লেখা ছিল। চিঠিটা পড়ার পর, মারগট বলল, বাপি নাকি বাকি সন্ধ্যেটা খুবই বিচলিত হয়ে কাটিয়েছেন। (আমি ওপরতলায় তখন বাসন মাজতে ব্যস্ত) বেচারা পিম, আমার জানা উচিত ছিল ঐ ধরনের চিঠির ফল কী দাঁড়াবে। এমনিতেই যা স্পর্শকাতর! সঙ্গে সঙ্গে পেটারকে বলে দিলাম ও যেন এ নিয়ে কিছু জিজ্ঞেস না করে বা কিছু না বলে। পিম আমাকে এ নিয়ে আর কিছু বলেননি। পরে বলার জন্যে তুলে রেখেছেন না কী?
তা এখানে সবকিছুই আবার কমবেশি স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। বাইরে জিনিসের দরদাম আর মানুষজন সম্পর্কে যা সব শোনা যাচ্ছে, তা প্রায় অবিশ্বাস্য। আধ পাউণ্ড চায়ের দাম ৩৫০ ফ্লোরিন (এক ফ্লোরিন আনুমানিক আটাশ সেন্টের মতো) এক পাউও কফি ৮০ ফ্লোরিন, মাখন এক পাউণ্ড ৩৫ ফ্লোরিন, ডিম একটি ১.৪৫ ফ্লোরিন। বুলগেরিয়ায় এক আউন্স কিনতে লাগে ১৪ ফ্লোরিন। প্রত্যেকেই কালোবাজারি করে; যে ছেলেরা ফাইফরমাশ খাটে তাদের প্রত্যেকের কাছেই কিছু না কিছু কিনতে পাওয়া যাবে। আমাদের রুটির দোকানের ছেলেটা খানিকটা রেশমের সুতো জুটিয়েছে, সেই সরু একগাছা সুতোর দাম ০.৯ ফ্লোরিন; যে লোকটা দুধ যোগায়, সে যোগাড় করে আনছে চোরাই রেশন কার্ড; যে লোকটা গোর দেয়, সে পৌঁছে দিচ্ছে পনির। দৈনিক চলছে বাড়িতে সিঁদ কাটা, মানুষ খুন আর চুরি। পুলিশ আর রাতের চৌকিদাররা দাগী আসামীদের মতোই আদাজল খেয়ে লেগেছে, প্রত্যেকেই তার খালি পেটে কিছু না কিছু ভরতে চায়। মজুরি বৃদ্ধি নিষিদ্ধ হয়ে যাওয়ায় লোকে ঠগবাটপারি করবে না তো কী করবে। রোজই পনেরো, মোল, সতেরো এবং তারও বেশি বয়সের মেয়েরা বেপাত্তা হয়ে যাচ্ছে তাদের খোঁজে পুলিস ক্রমাগত পাড়ি দিয়ে চলেছে।
তোমার আনা।
.
রবিবার সকাল, ৭ মে, ১৯৪৪
আদরের কিটি,
কাল বিকেলে বাপির সঙ্গে আমার বহুক্ষণ ধরে কথা হল। আমি প্রচণ্ড কাঁদলাম, বাপিও না। কেঁদে পারেননি। জানো, কিটি, বাপি আমাকে কী বললেন? ‘আমার জীবনে ঢের ঢের চিঠি পেয়েছি, কিন্তু এমন অরুচিকর চিঠি আর পাইনি। তুমি, আনা, মা-বাবার কাছ থেকে কম ভালবাসা পাওনি; তোমার মা-বাবা সব সময়ই তোমাকে সাহায্য করার জন্যে তৈরি, যে বিপদই আসুক তারা সবসময় তোমাকে বুক দিয়ে রক্ষা করে এসেছেন তাঁদের প্রতি কোনো দায়িত্ব বোধ করো না, এ কথা তুমি বলো কী করে? তুমি মনে করো তোমার প্রতি অন্যায় করা হয়েছে এবং তোমাকে পরিত্যাগ করা হয়েছে; না, আনা, আমাদের প্রতি তুমি খুবই অবিচার করেছ।
