আজ এ পর্যন্ত থাক। কাল আবার কথা হবে।
তোমার আনা।
.
বুধবার, ৩ মে, ১৯৪৪
আদরের কিটি,
প্রথম, কেবল সপ্তাহের খবরাখবর। রাজনীতি থেকে আমরা একটি দিন ছুটি পেয়েছি। ঢাক পিটিয়ে বলবার মত একেবারেই কোনো খবর নেই। এখন আমিও আস্তে আস্তে বিশ্বাস করতে আরম্ভ করেছি যে আক্রমণ আসছে। শত হলেও, রুশরা সব চেঁছেছে নিয়ে যাবে, সেটা ওরা হতে দেবে না। সেদিক থেকে ওরাও এক্ষুনি কিছু করছে না।
রোজ সকালে আজকাল আবার কুপহুইস আসছেন। পেটারের ডিভানের জন্যে উনি নতুন স্প্রিং আনিয়েছেন। কাজেই পেটারকে এখন খানিকটা ডিভানে গদি লাগানোর কাজ করতে হবে। ব্যাপারটাতে ও-যে মোটেই উৎসাহী নয়, সেটা বিলক্ষণ বোঝা যায়।
আমি কি তোমাকে বলেছি, বোখার পাত্তা পাওয়া যাচ্ছে না? যাকে বলে, একেবারে নিখোঁজ। গত সপ্তাহের বৃহস্পতিবারের পর থেকে ওর আর টিকি দেখা যায়নি। আমার ধারণা, ও এখন গঙ্গাপ্রাপ্ত হয়ে বেড়ালের স্বর্গে এবং কোনো জীবপ্রেমিক ওটা থেকে রসালো পদ বানিয়ে আস্বাদন করছে। হয়ত ওর চামড়ায় তৈরি ফারের টুপি কোনো ছোট মেয়ের মাথায় শোভা পাবে। পেটারের এই নিয়ে খুব মন খারাপ।
শনিবারের পর থেকে আমাদের দ্বিপ্রহরিক খাবারের সময় বদলে সকাল সাড়ে এগারোটা করা হয়েছে; ফলে এক কাপ ভর্তি ডালিয়া খেয়ে আমাদের টিকে থাকতে হবে। এতে এক বেলার খাবার বাঁচবে।
তরিতরকারি এখনও খুব দুর্ঘট; আজ সন্ধ্যেবেলা আমাদের পচা লেটুসের পাতা সেদ্ধ খেতে হল। কাঁচা লেটুস পালংশাক আর লেটুস সেদ্ধ ছাড়া আর কিছু নেই। এর সঙ্গে আমরা খাচ্ছি পচা আলু, সুতরাং উপাদেয় মিশ্রণ।
সহজেই এটা কল্পনা করতে পারে যে, এখানে আমরা প্রায়ই সখেদে নিজেদের মধ্যে বলাবলি করি, ‘যুদ্ধবিগ্রহে কী লাভ, বলো তো, কী লাভ? লোকে কেন শান্তিতে একসঙ্গে বসবাস করতে পারে না? এত সব ধ্বংসকাণ্ড কেন?’
খুবই যুক্তিসঙ্গত প্রশ্ন; কিন্তু এ পর্যন্ত কেউ এর কোনো সদুত্তর খুঁজে পায়নি। এটা ঠিক, কেন ওরা বানিয়ে চলেছে আরও আরও রাক্ষুসে প্লেন, আরও ভারী ভারী বোমা, আর একই সঙ্গে, পুনর্গঠনের জন্যে পূর্বনির্মিত ঘরবাড়ি? কেন যুদ্ধের জন্যে খরচ হবে রোজ কোটি কোটি টাকার আর চিকিৎসার খাতে, শিল্পীদের আর গরিব মানুষদের কপালে একটি কানাকড়িও জুটবে না?
পৃথিবীর এক প্রান্তে যখন বাড়তি খাবার পচে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, কেন তখন কিছু লোককে না খেয়ে মরতে হচ্ছে? মানুষের কেন এমন মাথা খারাপ?
শুধু বড় বড় লোক, রাষ্ট্রনায়ক আর পুঁজিপতিরাই যে এর জন্যে দায়ী, আমি তা মনে করি না। যে কেউকেটা, সেও সমান দায়ী–নইলে দুনিয়ার মানুষ অনেক দিন আগেই বিদ্রোহে ফেটে পড়ত। লোকের ভেতর একটা প্রবৃত্তি রয়েছে ভেঙেচুরে ফেলার, আছে মেরে ফেলার, খুন করার আর ক্ষিপ্ত হওয়ার প্রবৃত্তি; যতদিন ব্যক্তি নির্বিশেষে সমস্ত মনুষ্য সমাজে বড় রকমের পরিবর্তন না আসে, ততদিন যুদ্ধ হতেই থাকবে, যা কিছু গড়া হয়েছে, বাড়ানো আর ফলানো হয়েছে–সবই ধ্বংস আর বিকল হয়ে যাবে, তারপর মানুষকে সবকিছু আবার কেঁচেগণ্ডুষ করতে হবে।
আমি অনেক সময় ম্রিয়মাণ হই, কিন্তু কখনও মুষড়ে পড়ি না। আমাদের এই অজ্ঞাতবাসকে আমি এক বিপজ্জনক সাহসী কাজ বলে মনে করি, যা একাধারে রঙদার আর রসালো। আমার ডায়রিতে অভাব-অনটন নিয়ে যা কিছু সবই আমি রসিয়ে রসিয়ে লিখেছি। এখন আমি ঠিক করে ফেলেছি যে অন্য মেয়েদের চেয়ে আলাদা রকম জীবন আমি যাপন করব এবং এরপর আমার জীবন হবে সাধারণ বাড়ির বউদের চেয়ে পৃথক। আমার আরম্ভটাই হয়েছে এত মজাদার ভাবে যে, শুধু সেই কারণেই সবচেয়ে বিপজ্জনক মুহূর্তগুলোর কৌতুকময় দিকটা নিয়ে আমাকে হাসতেই হয়।
আমার বয়স কম এবং আমার মধ্যে নিহিত অনেক গুণ আছে; আমার আছে তারুণ্য আর শক্তি সামর্থ্য। আমার বেঁচে থাকাটাই একটা রোমাঞ্চকর অভিযান। আমি এখনও তার মাঝখানে রয়েছি এবং আমার পক্ষে সারাদিন গাইগুই করা সম্ভব নয়। হাসিখুশি স্বভাব, প্রচুর খোশমেজাজের ভাব আর দৃঢ়তা–এমন অনেক কিছুই আমি পেয়েছি। আমি ভেতরে ভেতরে যে বেড়ে উঠছি, মুক্তির দিন যে এগিয়ে আসছে, প্রকৃতি কী যে সুন্দর, চারপাশের মানুষজন কী যে ভালো, এই দুঃসাহসিক অভিযান যে কী মজাদার–এটা আমি প্রতিদিন অনুভব করছি! তাহলে আমার কী হয়েছে যে, আমি মূষড়ে পড়তে যাব?
তোমার আনা।
.
শুক্রবার, ৫ মে, ১৯৪৪
আদরের কিটি,
বাপি আমার ওপর প্রসন্ন নন; উনি ভেবেছিলেন রবিবারে ওঁর সঙ্গে আমার কথা হওয়ার পর আমি আপনা থেকেই রোজ সন্ধ্যেবেলা ওপরে যাওয়া ছেড়ে দেব। উনি চান কোনো গলা জড়াজড়ি’ হবে না, কথাটা শুনলেই আমার পিত্তি জ্বলে যায়। এ নিয়ে বলাকওয়া করাটাই খারাপ, তার ওপর কেন উনি অমন বিশ্রী করে বলবেন? ওঁর সঙ্গে এ নিয়ে আজ আমি কথা বলব। মারগট আমাকে কিছু ভালো উপদেশ দিয়েছে। সুতরাং শোনো; মোটের ওপর আমি যা বলতে চাই তা এই
বাপি, আমার মনে হয় আমার কাছ থেকে তুমি একটা জবানবন্দী চাও; আমি তাই তোমাকে দেব। তুমি আমার কাছ থেকে আরও বেশি সংযম আশা করেছিলে, না পেয়ে আমার ওপর তুমি বীতশ্রদ্ধ হয়েছ। আমার ধারণা, তুমি চাও আমি চৌদ্দ বছর বয়সের খুকী হয়ে থাকি। কিন্তু সেইখানেই তোমার ভুল।
