তোমার আনা।
০৯. পেটারকে আমি জিজ্ঞেস করি
মঙ্গলবার, ২ মে, ১৯৪৪
আদরের কিটি
শনিবার সন্ধ্যেবেলায় পেটারকে আমি জিজ্ঞেস করি, বাপিকে আমাদের ব্যাপার কিছুটা জানানো আমার উচিত কিনা; খানিকটা আলোচনার পর এই মতে পৌঁছোয় যে, আমার জানানো উচিত। শুনে আমার ভালো লাগল, পেটার ছেলেটার মধ্যে সততা আছে। নিচে নেমে গিয়ে তৎক্ষণাৎ বাপির সঙ্গে আমি গেলাম খানিকটা পানি আনতে; সিঁড়িতে যেতে যেতে বাপিকে বললাম, বাপি তুমি হয়ত শুনেছ, পেটার আর আমি একসঙ্গে হলে আমরা দুজনের মধ্যে তেপান্তরের দুরত্ব রেখে বসি না। তুমি কি সেটা অন্যায় বলে মনে কর?’ বাপি একটু চুপ করে থেকে তারপর বললেন, ‘না, আমি অন্যায় মনে করি না। তবে তুমি একটু সাবধান হয়ো, আনা; এখানে এত বদ্ধ জায়গার মধ্যে তোমাদের থাকতে হয়। যখন আমরা ওপরতলায় গেলাম, একই বিষয়ে উনি অন্য কয়েকটা কথা বললেন। রবিবার সকালে বাপি।
আমাকে কাছে ডেকে নিয়ে বললেন, ‘আনা, তোমার কথাটা নিয়ে আমি আরও খানিকটা ভেবে দেখলাম-’ শুনেই তো আমার বুক ঢিপ ঢিপ করতে লাগল। এখানে এই বাড়িতে সত্যি বলতে, ওটা ঠিক উচিত কাজ নয়। আমি ভেবেছিলাম তোমরা দুজনে দুজনের নিছক প্রাণের বন্ধু। পেটার কি প্রেমে পড়েছে।
আমি বললাম, ‘উঁহু, একেবারেই নয়।’
‘তুমি জানো, তোমাদের দুজনকেই আমি বুঝি; কিন্তু এক্ষেত্রে তোমাকেই নিজের রাশ টেনে ধরতে হবে। অত ঘন ঘন তুমি ওপরে যেয়ো না, যতটা না দিলে নয় ততটাই ওকে উৎসাহ দেবে। এসব জিনিস ছেলেরাই সবসময় উদ্যোগী হয়; মেয়েরা তাকে ঠেকিয়ে রাখতে পারে। স্বাভাবিক অবস্থা হলে এসব কথা ওঠে না। যেখানে চলাফেরার স্বাধীনতা থাকে, সেখানে আর পাঁচটা ছেলেমেয়ের সঙ্গে দেখা হয়, কখনও কখনও দূরে কোথাও যেতে, খেলাধুলো করতে এবং আরও অনেক কিছু করতে পারো। কিন্তু এখানে, যদি কেবলই একসঙ্গে থাকো, কোথাও চলে যেতে চাইলে যেতে পারবে না; ঘণ্টায় ঘন্টায় দুজনে দুজনকে দেখছ–বলতে গেলে অষ্ট্রপ্রহর। নিজেকে বাঁচিয়ে চলো, আনা–এটাকে বড় বেশি গুরুত্ব দিও।’
‘আমি তা দিই না, বাপি। কিন্তু পেটার খুব ভদ্র ছেলে, সত্যিই খুব চমৎকার ছেলে।
‘হ্যাঁ, তা ঠিক। কিন্তু খুব একটা শক্ত ধাতুতে গড়া ছেলে সে নয়; যেমন সহজেই প্রভাব খাঁটিয়ে ওকে ভালোর দিকে নিয়ে যাওয়া যায়, তেমনি খারাপের দিকেও নিয়ে যাওয়া সম্ভব। ওর ভালোর জন্যে আমি আশাকরি ওর ভালো দিকটাই সব কিছু ছাপিয়ে উঠবে–কারণ, স্বভাবের দিক থেকে ও তাই।’
আমরা কিছুটা কথা বলার পর বাপি রাজী হলেন পেটারের সঙ্গেও এ নিয়ে কথা বলতে।
রবিবার সকালে পেটার আমাকে জিজ্ঞেস করল, ‘তোমার বাবার সঙ্গে কথা বলেছ, আনা?’
আমি বললাম, হ্যাঁ। কী কথা হল বলছি। বাপি এ জিনিসটাকে খারাপ বলে মনে করেন। কিন্তু ওঁর মতে, এখানে, সারাক্ষণ এত কাছাকাছির মধ্যে, সহজেই খটাখটি বেধে যেতে পারে।
‘কিন্তু মনে নেই, আমরা কথা দিয়েছিলাম কক্ষনো ঝগড়া করব না; আমি সে প্রতিজ্ঞা অক্ষরে অক্ষরে পালন করব।’
‘আমিও কথা রাখব, পেটার। কিন্তু বাপির বক্তব্য তা ছিল না, উনি কেবল ভেবেছিলেন। আমরা দুজনে প্রাণের বন্ধু; তোমার কি মনে হয়, এখনও আমরা তা হতে পারি?
‘আমি পারি–তুমি নিজের সম্পর্কে কী বলো?’
‘আমিও পারি। বাপিকে আমি বলেছি তোমাকে আমি বিশ্বাস করি; বাপিকে যতটা বিশ্বাস করি ততটা। তোমাকে আমি আমার বিশ্বাসের যোগ্য বলে মনে করি; ঠিক নয়, পেটার?’
‘আশা করি, ঠিক।’ (পেটার খুব লজ্জা পেয়েছিল, মুখটা ওর রাঙা হয়ে উঠেছিল।)
আমি বলতে লাগলাম, তোমার ওপর আমার ভরসা আছে পেটার। আমি মনে করি তোমার অনেক সদ্গুণ আছে এবং জীবনে তুমি উন্নতি করবে।
এরপর অন্যান্য বিষয় নিয়ে আলাপ করলাম। পরে বললাম, ‘যখন আমরা এ জায়গা ছেড়ে যাব, আমি ভালো করেই জানি তখন আর আমাকে নিয়ে তুমি মাথা ঘামাবে না।’
পেটার দপ করে জ্বলে উঠল। ‘মোটেই তা সত্যি নয়, আনা–মোটেই সত্যি নয়। আমার সম্বন্ধে তুমি এ রকম ভাববে, তা হয় না।’
এই সময় নিচের তলায় আমার ডাক পড়ল।
বাপি ওর সঙ্গে কথা বলেছেন। ও আমাকে আজ সে কথা বলল। ও বলল, তোমার বাবা বললেন আমাদের ভাব আজ হোক কাল হোক ভালবাসায় পরিণত হতে পারে। তার উত্তরে আমি বললাম নিজেকে আমরা সংযত করে রাখব।
বাপি আজকাল সন্ধ্যেগুলোতে আমাকে ওপরে যেতে দিতে ততটা চান না। সেটা আমার মনঃপূত নয়। পেটারের সঙ্গে সময় কাটাতে আমার ভালো লাগে বলে শুধু নয়–আমি ওকে বলেছি যে, আমি ওকে বিশ্বাস করি। আমি ওকে যে বিশ্বাস করি তাতে ভুল নেই এবং সেটা আমি ওকে দেখাতেও চাই–আমি যদি বিশ্বাসের অভাবের দরুন নিচে বসে থাকি, তাহলে আর সেটা হয় না।
না, আমি যাচ্ছি।
ইতিমধ্যে ডুসেলের নাটকটা সুভালাভালি চুকে গিয়েছে। শনিবার সন্ধ্যেবেলা খাওয়ার টেবিলে সুললিত ডাচ ভাষায় ডুসেল তার ভুলের জন্যে দুঃখ প্রকাশ করলেন।
ফান ডান তৎক্ষণাৎ সুন্দর ভাবে ব্যাপারটা মিটিয়ে নিলেন। ডুসেলের নিশ্চয়ই সারাটা দিন লেগে গিয়েছিল অন্তর থেকে ঐ ছোট্ট শিক্ষাটা মেনে নিতে।
রবিবার, ওঁর জন্মদিন, নির্ঝঞ্ঝাটে কেটে গেল। আমরা ওঁকে দিলাম ১৯১৯-এর এক বোতল ভালো পুরনো মদ, ফান ডানদের (এখনও ওঁদের উপহার দেওয়ার মুরোদ আছে) দেওয়া, এক বোতল আচার আর এক প্যাকেট দাড়ি কামানোর ব্লেড, ক্রালারের কাছ থেকে লেবুর জ্যাম এক বয়াম, মিপের দেওয়া একটি বই, ‘ক্ষুদে মার্টিন’ আর এলির কাছ থেকে একটি গাছের চারা। উনি আমাদের প্রত্যেককে একটি করে ডিম খাওয়ালেন।
