আদরের কিটি
পেটার ভেসেলকে আমি স্বপ্নে দেখেছিলাম (জানুয়ারির গোড়ায় দেখ), কখনও ভুলিনি। সে কথা চিন্তা করলে আমি এখনও অনুভব করতে পারি সে আমার গালে গাল রেখেছে; যে সুন্দর অনুভূতিটা সব কিছু রাঙিয়ে দিয়েছিল আমি তখন যেন তা মনের মধ্যে ফিরে পাই।
পেটারের বেলায়ও মাঝে মাঝে আমার একই রকম অনুভূতি হয়, কিন্তু তার ব্যাপ্তি কখনই অতটা নয়। কাল অন্য ব্যাপার হল। রোজকার মতো হাত দিয়ে পরস্পরের কোমর জড়িয়ে আমরা ডিভানে বসে ছিলাম। তারপর হঠাৎ দেখি সাধারণ যে আনা সে সরে পড়েছে এবং এসে তার জায়গা নিয়েছে দ্বিতীয় আনা; এই আনা বেপরোয়া আর পরিহাসপ্রিয় নয় এ শুধু চায় ভালবাসতে আর নম্র হতে।
আমি ওর গায়ে শক্ত সেঁটে রইলাম। আবেগের ঢেউ এসে আমার ওপর আছড়ে পড়ল, আমার চোখ দিয়ে ঝরতে লাগল অশ্রুর নিঝর, আমার বা চোখের পানি গড়িয়ে পড়ল ওর মোটা সুতির জামায়, ডান চোখের পানি আমার নাক বেয়ে ওর গায়ে। ও কি টের পেয়েছিল? ও নড়ল না এবং এমন কোনো চিহ্নও দেখাল না যাতে ও টের পেয়েছে সেটা বোঝা যায়। কে জানে ও ঠিক আমার মতোই অনুভব করে কিনা! ও প্রায় কোনোই কথা বলেনি। ও কি জানে যে, ওর সামনে আনা আছে দুটো? এসব প্রশ্নের কখনই কোনো উত্তর মিলবে না।
সাড়ে আটটায় আমি উঠে পড়ে জানালায় গেলাম; আমরা সবসময় এই জায়গায় ‘আসি’ বলে বিদায় নিই। আমি তখনও কাপছিলাম, তখন আমি দুই নম্বর আনা। পেটার আমার দিকে আসতে আমি দুই হাতে ওর গলা জড়িয়ে ওর বাম গালে একটা চুমো একে দিয়ে অন্য গালে চুমো খেতে যাব, এমন সময়ে আমার ঠোটে ওর ঠোট ঠেকে যাওয়ায় আমরা একসঙ্গে চাপ দিলাম। ঝট করে ঘুরে আমরা পরস্পরের আলিঙ্গনবদ্ধ হতে লাগলাম বার বার, কেউ কাউকে আমরা আর ছাড়তে রাজী নই। সত্যি স্নেহমমতা পেটারের এত বেশি দরকার। জীবনে সে এই প্রথম একটি মেয়েকে আবিষ্কার করেছে, এই প্রথম দেখেছে যে, এমন কি সবচেয়ে গা-জ্বালানো মেয়েদেরও একটা অন্য দিক থাকে, তাদের হৃদয় আছে এবং যখন তুমি তাদের নিয়ে একা থাকো তখন তারা অন্য মানুষ। পেটার জীবনে এই প্রথম স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে দিয়েছে এবং এর আগে কখনই তার ছেলে বা মেয়ে বন্ধু না থাকায় সে আসলে যা, সেটাকেই সে প্রকাশ করেছে। এবার আমরা পরস্পরকে খুঁজে পেয়েছি। বলতে কি, আমিও ওকে চিনতাম না; ওর যেমন কখনই কোনো বিশ্বস্ত বন্ধু ছিল না, তেমনি। আর আজ পানি কোথায় এসে গড়িয়েছে…
একটি প্রশ্ন আবারও আমাকে জ্বালিয়ে মারছে–এটা কি ঠিক? আমি যে এত আগে ধরা দিয়েছি, আমি যে এত উন্মত্ত, পেটার ঠিক নিজে যতটা উন্মত্ত আর ব্যাকুল ততটাই–এটা কি হওয়া উচিত? আমি একজন মেয়ে হয়ে, নিজেকে কি এই পর্যায়ে টেনে নামাতে দিতে পারি?’ এর একটাই উত্তর—‘আমি কত দীর্ঘদিন কত যে অপেক্ষা করেছি–আমি এত নিঃসঙ্গ–এতদিনে খুঁজে পেয়েছি সান্ত্বনা।’
সকালগুলোতে আমাদের আচরণ হয় মামুলি গোছের, বিকেলগুলোতে কম-বেশি তাই (ব্যতিক্রম শুধু মাঝে মধ্যে); কিন্তু সন্ধ্যেগুলোতে সারাদিনের চাপা বাসনা, পূর্বতন সময়গুলোর সুখস্মৃতি হুস্ করে ভেসে ওঠে এবং তখন আমাদের ভাবনায় দুজনের কাছে শুধু দুজন।
প্রতি সন্ধ্যার শেষে চুম্বনের পর আমার ভালো লাগে ছুটে পালাতে, ওর চোখের দিকে আর না তাকাতে ভালো লাগে একা অন্ধকারে দূরে চলে যেতে।
সিঁড়ি ভেঙে নিচে নেমে আমি কিসের মুখে পড়ব? জ্বলজ্বলে আলো, কোথায় কেন, হোহো-হিহি; মুখের ভাব প্রকাশ না করে আমাকে সব গিলতে হবে। আনা আসলে নম্র, বাইরে সেটা বিশেষ দেখায় না; সুতরাং কারো তাড়ায় নিজেকে সে হঠাৎ পেছনে পড়ে যেতে দেবে না। একমাত্র আমার স্বপ্ন বাদে–পেটার ছাড়া আর কেউ এত গভীরভাবে আমার আবেগকে স্পর্শ করেনি। পেটার আমাকে একেবারে সম্পূর্ণভাবে কজা করে ফেলেছে; না বললেও এটা নিশ্চয়ই বোঝা যায় যে, এমন একটা ওলটপালটের পর সামলে ওঠার জন্যে যে কারো একটু বিশ্রাম এবং একটু সময় চাই।
পেটার গো, আমাকে এ কী করেছ তুমি? আমার কাছে তুমি কী চাও? এরপর কী আমাদের পরিণতি? এখন হ্যাঁ, এইবার আমি এলিকে বুঝতে পারছি। এখন নিজে আঙুল পুড়িয়ে বুঝতে পারছি এলির কেন সংশয়। আমি যদি আরও বড় হতাম এবং পেটার যদি আমাকে বিয়ে করতে চাইত, আমি তাকে কী উত্তর দিতাম? আনা, বুকে হাত দিয়ে তুমি বল। তুমি ওকে বিয়ে করতে পারতে না, কিন্তু এও ঠিক, ওকে ছাড়াও তোমার পক্ষে কঠিন হত। পেটারের এখনও আশানুরূপ চরিত্র নেই, নেই যথেষ্ট ইচ্ছাশক্তি, সাহস আর শক্তিও বড় কম। এখনও অন্তরের অন্তস্থলে সে একজন শিশু, আমার চেয়ে আদৌ বড় নয়। তার অন্বিষ্ট শুধু প্রশান্তি আর সুখ।
আমার বয়স কি মাত্র চৌদ্দ? আমি কি আদতে এখনও ইস্কুলের বেকুব ছোট্ট মেয়ে? আমি কি সব কিছু সম্পর্কে এতই আনাড়ি? খুব কম মিলবে যার আমার মতো এত অভিজ্ঞতা। আমার বয়সী বোধহয় এমন কাউকেই পাওয়া যাবে না যাকে আমার মত এতকিছুর ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে। নিজের সম্বন্ধে আমার ভয় হচ্ছে, আমি ভয় পাচ্ছি অধীর হয়ে পড়ে বড় তাড়াতাড়ি নিজেকে আমি দিয়ে ফেলছি। পরে অন্য ছেলেদের বেলায় কখনও এটা কি শোধরাবে? সমস্ত সময় নিজের হৃদয় আর যুক্তির সঙ্গে লড়াই চালিয়ে যাওয়া যে কী দুঃসাধ্য বলার নয়; সময় এলে যখন বলার প্রত্যেকে বলবে, কিন্তু আমি কি এ ব্যাপারে নিঃসন্দেহ যে, ঠিক সময়ই আমি বেছেছি?
