তোমার আনা।
.
শুক্রবার, ২১ এপ্রিল, ১৯৪৪
আদরের কিটি,
গলা ছ্যানছেনে হওয়ায় কাল বিকেলে আমি বিছানায় শুয়ে ছিলাম, কিন্তু প্রথম দিন বিরক্ত হয়ে পড়েছিলাম এবং গায়ে জ্বর ছিল না বলে আজ ফের উঠে পড়েছি। ইয়র্কের মহামান্য রাজকুমারী এলিজাবেথের জন্মদিন আজ। বি.বি.সি. বলেছে সাধারণত বয়ঃপ্রাপ্তির ঘোষণা রাজপুত্র-রাজকন্যাদের বেলায় করা হয় বটে, কিন্তু এলিজাবেথের ক্ষেত্রে সেটা এখনও করা হয়নি। আমরা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করছিলাম, এই সুন্দরী কোন্ রাজকুমারের গলায় যে মালা দেবে! অনেক ভেবেও যোগ্য কোনো নাম আমরা মনে করতে পারলাম না। হয়ত এলিজাবেথের বোন মারগারেট রোজ-এর সঙ্গে বেলজিয়ামের রাজকুমার বুদুইনের একদা বিয়ে হতে পারে। এখানে আমাদের দুর্ভাগ্যের অন্ত নেই। বাইরের দরজাগুলো মজবুত করতে না করতে ফের মালখানাদার এসে হাজির। যতদূর মনে হয়, এ লোকটিই আলুর গুড়ো গায়েব করে এখন এলির ঘাড়ে দোষ চাপাতে চাইছে। গোটা গুপ্ত মহল’ আবার কেন খাপ্পা হয়েছে বোঝা যায়। এলি তো রেগে আগুন।
কোনো পত্রিকা বা কোথাও পাঠিয়ে দেখতে চাই আমার কোনো গল্প ওরা নেয় কিনা পাঠাবো অবশ্যই ছদ্মনামে।
আবার দেখা হবে, প্রিয় আমার।
তোমার আনা।
.
মঙ্গলবার, ২৫ এপ্রিল, ১৯৪৪
আদরের কিটি
আজ দশদিন হল ফান ডানের সঙ্গে ডুসেলের ব্যাক্যালাপ নেই। তার একটাই কারণ সিঁদ কাটার পর থেকে নতুন বেশ কিছু নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, যাতে ডুসেলের অসুবিধে হচ্ছে। ডুসেল বলে বেড়াচ্ছেন যে, ফান ডান ওঁর ওপর চোটপাট করেছে।
ডুসেল আমাকে বললেন, ‘এখানে যা হয় সব উল্টোপাল্টা। আমি যাচ্ছি, তোমার বাবাকে এ নিয়ে বলব।’ শনিবার বিকেলগুলোতে আর রবিবারগুলোতে নিচের তলার অফিসে এখন আর ওঁর বাবার কথা নয়; কিন্তু তাও উনি দিব্যি বসছেন। ফান ডান চটে লাল, বাবা নিচের তলায় গিয়েছিলেন কথা বলতে। স্বভাবতই উনি বানিয়ে বানিয়ে অজুহাত দেখালেন, কিন্তু এবার এমন কি বাবাকেও বোকা বানাতে পারলেন না। বাবা এখন পারতপক্ষে ওঁর সঙ্গে কথা বলেন না, কারণ ডুসেল ওকে অপমান করেছিলেন। কি ভাবে আমরা তা কেউই জানি না। তবে খুবই যে খারাপ ভাবে তাতে সন্দেহ নেই।
আমি একটা সুন্দর গল্প লিখেছি। নাম ঠুলিরাম গবেষক’। যে তিনজনকে পড়ে শুনিয়েছি, তারা বেজায় খুশি।
তোমার আনা।
.
বৃহস্পতিবার, ২৭ এপ্রিল, ১৯৪৪
আদরের কিটি,
আজ সকালে মিসেস ফান ডানের এমন মেজাজ খারাপ ছিল কী বলব। কেবল নালিশ, কেবল নালিশ।
প্রথম তো ওঁর সর্দি; চুষবেন যে, সে ওষুধ পাচ্ছেন না এবং নাক ঝাড়তে ঝাড়তে ওঁর জান কয়লা। তারপর, রোদের দেখা নেই, ইত্যাদি, ইত্যাদি।
ওঁর কথায় আমরা না হেসে পারিনি; আমুদে বলে উনিও তাতে যোগ দেন। ঠিক এখন আমি পড়ছি গোটিঞ্জেন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপকের লেখা ‘সম্রাট পঞ্চম চার্লস’; বইটি তাঁর চল্লিশ বছরের পরিশ্রমের ফল।
পঞ্চাশ পৃষ্ঠা পড়তে আমার পাঁচদিন লেগেছে; তার বেশি পড়া সম্ভব নয়। ৫৯৮ পৃষ্ঠার বই; সুতরাং এখন হিসেব করলে জানতে পারবে বইটি শেষ করতে আমার কতদিন লাগবে এর পর রয়েছে দ্বিতীয় খণ্ড। কিন্তু পড়তে খুব আগ্রহ লাগে।
মাত্র একদিনে একটি স্কুলের মেয়ের জ্ঞানলাভের একবার বহর দেখ। আমাকেই ধরো, কেন। প্রথমত, ডাচ থেকে নেলসনের শেষ লড়াই নিয়ে লেখা একটি রচনা আমি ইংরেজিতে তর্জমা করেছি। এরপর নরওয়ে (১৭০০-১৭২১), দ্বাদশ চার্লস, বলবান অগাস্টাস, স্তানিস্লাভ লেজিস্কি, মাসেপা, ফন গ্যোৎস, ব্ৰাণ্ডেনবুর্গ, পোমেরানিয়া আর ডেনমার্কের বিরুদ্ধে পিটার দি গ্রেটের যুদ্ধ এবং সেই সঙ্গে যেটির যা তারিখ।
এরপর অবতরণ করলাম ব্রাজিলে; পড়লাম বাহিয়া তামাক, কফির প্রাচুর্য এবং রিওদা জানেরো, পেনামবুকো আর সাও-পাউলোর পনেরো লক্ষ অধিবাসীদের কথা। সেই সঙ্গে আমাজন নদীর বৃত্তান্ত; নিগ্রো, মুলাটো, মেসূতিজো, শ্বেতাঙ্গ; জনসংখ্যার পঞ্চাশ শতাংশেরও বেশি নিরক্ষর; আর ম্যালেরিয়ার কথা।
হাতে তখনও সময় থাকায় চটপট একটা বংশপঞ্জীতে চোখ বুলিয়ে গেলাম। অগ্রজ ইয়ান, ভিলেম লোডাভিক, প্রথম আর্ন কাসিমির, হেরিক কাসিমির থেকে নেমে এসে ক্ষুদে মারগ্রিট ফ্রান্সিসকা (ওটাওয়াতে ১৯৪৩ সালে জন্ম) পর্যন্ত।
বারোটায় চিলেকোঠায়, গির্জার ইতিহাস সংক্রান্ত পড়াশুনো চালিয়ে গেলাম–ফুঃ! বেলা একটা অবধি।
ঠিক দুটোর পর, বেচারা আবার বসল বই নেয়ে (হুঁ-উঁ, হুঁ-উঁ), এবার তার পড়ার বিষয় টিকোলো নাকের আর থ্যাবড়া নাকের বানর কুল। কিটি, বলো তো চটপট–জলহস্তীর পায়ে কয়টা করে আঙুল আছে।
তারপর বাইবেল এল, নোয়া আর নেওকোটি, শেম, হাম আর জাফেৎ! এরপর পঞ্চম চার্লস। তারপর পেটারের সঙ্গে বসে–ইংরিজিতে থ্যাকারের ‘দি কার্নেল’। ফরাসী ক্রিয়াপদগুলো আওড়ানোর পর মিসিসিপির সঙ্গে মিসৌরির তুলনা করলাম।
আমার সর্দি এখনও সারেনি; মারগট আর সেই সঙ্গে মা-মণি আর বাপিরও আমার ছোঁয়া লেগেছে। পেটারের এখন না রাগলেই বাঁচি। পেটার আমাকে ওর ‘এলডোরাডো’ বলে ডেকে একটা চুমো চেয়েছিল। অবশ্যই আমি পারিনি। ছেলেটা যা মজার। কিন্তু হলেও, ও আমার বড় প্রিয়।
আজ ঢের হয়েছে; থাক। আসি।
তোমার আনা।
.
শুক্রবার, ২৮ এপ্রিল, ১৯৪৪
