আমরা সাড়ে আটটায় উঠে পড়লাম। পেটার ওর খেলতে যাওয়ার রবারের জুতোটা পরে নিল, যাতে বাড়িটা টহল দেবার সময় শব্দ না হয়। আমি ওর পাশে দাঁড়িয়ে। আমরা নিচে নামব, এমন সময় জানি না কোথা থেকে কী হয়ে গেল, হঠাৎ আমাকে ও চুমো খেয়ে বসল। আমার চুলের ভেতরে মুখ ডুবিয়ে, বা গালে অর্ধেক আর অর্ধেক আমার কানে। ওর হাত ছাড়িয়ে আমি আর কোনোদিকে না তাকিয়ে সোজা নিচে নেমে এলাম। আজ কেবলই আমার মন উচাটন হয়ে আছে।
তোমার আনা।
.
সোমবার, ১৭ এপ্রিল, ১৯৪৪
আদরের কিটি,
সাড়ে সতেরো বছরের এক ছেলে আর পুরো পঞ্চদশীও নয় এমন এক মেয়ে, আমি ডিভানে বসে ছেলেটিকে চুমো খাচ্ছি–এমন জিনিস আমার বাপি আর মা-মণি মেনে নেবেন বলে তুমি মনে করো? আমার ঠিক মনে হয় না ওঁরা মেনে নেবেন। তবে এ ব্যাপারে আমার নিজের ওপর ভরসা করতে হবে। নিরিবিলিতে আঁর প্রশান্তিতে ওর কোলের মধ্যে শুয়ে থাকা আর স্বপ্ন দেখা; শরীরে শিহরণ তুলে দুজনে গালে গাল ঠেকিয়ে রাখা; জেনে আনন্দ হওয়া যে কেউ একজন আমার জন্যে অপেক্ষা করছে। কিন্তু এর মধ্যিখানে বড় রকমের ‘কিন্তু’ একটা থেকেই যায়, কারণ, পেটার কি এইখানে ইতি টেনে দিয়েই সন্তুষ্ট থাকবে? আগেই যে ও কথা দিয়েছে, আমি সে কথা ভুলিনি। তবু… ও ছেলের জাত তো বটে!
নিজেই জানি, আমি অনেক আগে আগে শুরু করেছি, এখনও পনেরোও নয় এবং এরই মধ্যে এতখানি পাখা গজিয়েছে। অন্যদের পক্ষে এটা বুঝে ওঠা শক্ত; আমি এটা প্রায় নিশ্চিতভাবেই জানি যে, বাগদান বা বিয়ের কোনোরকম কথা না হয়ে থাকলে মারগট কখনই কোনো ছেলেকে চুমো খাবে না; সেদিক থেকে পেটার বা আমি আমরা কেউ তেমন কিছু ভাবিইনি। বাপির আগে মা-মণি যে কোনো পুরুষ মানুষকে ছোননি, সে বিষয়েও আমি নিশ্চিত। আমি যে পেটারের বুকে বুক ঠেকিয়ে, দুজনে দুজনের কাঁধে মাথা রেখে ওর কোলের মধ্যে শুয়েছি, আমার মেয়ে-বন্ধুরা সে কথা জানতে পারলে কী বলবে!
ইস, আনা, কী কেলেঙ্কারির কথা! আমি কিন্তু সত্যিই তা মনে করি না। এখানে আমরা ভয় আর দুর্ভাবনার মধ্যে, দুনিয়ার বের হয়ে, খাচায় বন্ধ হয়ে আছি, বিশেষ করে ইদানীং পরস্পরকে আমরা যখন ভালবাসি, তখন কেন আমরা পরস্পরের ছোঁয়া বাঁচিয়ে চলব? যোগ্য বয়স না হওয়া অব্দি কেন আমরা অপেক্ষা করব? কেন আমরা ও নিয়ে ভেবে মরব?
আমার ওপর খবরদারি করার ভার আমি নিজের কাঁধে নিয়েছি; পেটার কখনই আমাকে দুঃখ বা বেদনা দেবে না। আমরা দুজনেই যদি তাতে সুখী হই, কেন আমি আমার হৃদয়ের হাত ধরে চলব না? এসব সত্ত্বেও, কিটি, আমার মনে হয় তুমি ধরতে পারছ যে, আমি দ্বিধার মধ্যে আছি। আমি মনে করি, আমার মধ্যে যে সততা আছে, সেটা লুকিয়ে চুরিয়ে কিছু করতে গেলে বেঁকে বসে। তোমার কি মনে হয় আমি কী করছি সেটা বাপিকে আমার বলা কর্তব্য? তোমার কি মনে হয় তৃতীয় কাউকে আমাদের এই গোপন ব্যাপারটা জানানো উচিত? এর মাধুর্য তাতে অনেকখানি নষ্ট হয়ে যাবে, কিন্তু আমার বিবেক তো তুষ্ট হবে? আমি ওর সঙ্গে এ নিয়ে আলোচনা করব। হ্যাঁ, আরও অনেক কিছু নিয়ে ওর সঙ্গে আমার কথা বলার আছে; কারণ, পরস্পরকে শুধু জড়াজড়ি করে কাজ হবে না। দুজনে কে কী ভাবছি, তার আদান-প্রদান হওয়া দরকার; তাতে বোঝা যাবে পরস্পরের প্রতি পরস্পরের কতটা বিশ্বাস আর আস্থা। আমরা দুজনেই এতে নিশ্চিতই লাভবান হব।
তোমার আনা।
.
মঙ্গলবার, ১৮ এপ্রিল, ১৯৪৪
আদরের কিটি,
এখানে সবই সুভালাভালি চলেছে। বাপি এইমাত্র বললেন যে, বিশ তারিখের আগেই রাশিয়া আর ইতালি দুদেশেই, এবং পশ্চিমেও, বড় রকমের যুদ্ধাভিযান শুরু হয়ে যাবে। এখান থেকে মুক্তি পাওয়ার কথা কল্পনা করা আমার পক্ষে দিন দিন দুষ্কর হয়ে উঠছে।
গত দশদিন ধরে পেটারের সঙ্গে যে আলোচনাটা কেবলই করব করব করছিলাম, কাল পেটারের সঙ্গে বসে সেটা সেরে ফেলা গেল। ওকে আমি মেয়েদের ব্যাপারগুলো সব খোলাসা করে বললাম এবং যা সবাইকে বলা যায় না এমন জিনিসও বলতে বাধল না। সন্ধ্যেটা শেষ হল দুজনে দুজনকে চুম্বন করে, আমার ঠিক হাঁ-মুখের পাশেই ওর ঠোটে, সে এক রমণীয় অনুভূতি। কখনও হয়ত আমার ডায়রি নিয়ে ওপরে উঠে যেতে পারি, একটি বার হলেও আমি চাই আরও গভীরে যেতে। দিনের পর দিন শুধু পরস্পরের বাহুবন্ধনে থেকে আমার সুখ হয় না, আমি মনেপ্রাণে চাই ওর সঙ্গে একাত্মতা অনুভব করতে।
দীর্ঘ, বিলম্বিত শীতের পর আমাদের এখানে এখন অতুলনীয় বসন্ত; এপ্রিল মাস সত্যিই অসামান্য, খুব গরমও নয় আবার খুব ঠাণ্ডাও নয়। মাঝে মধ্যে ঝিরঝির করে বৃষ্টি। আমাদের চেস্টনাট গাছটা এরই মধ্যে বেশ সবুজাভ হয়ে উঠেছে, এমন কি তাকালে এখানে-সেখানে ছোট্ট ছোট্ট মুকুলও তোমার নজর আসবে।
শনিবার এলি এসে আমাদের যে কী খুশি করে গেলেন! এনেছিলেন চারগোছা ফুল, তিনগোছা নারগিস আর একগোছা কুমুদিনী–শেষেরটা আমার জন্যে।
আমাকে খানিকটা বীজগণিত করতে হবে, কিটি–এখন আসি।
তোমার আনা।
.
বুধবার, ১৯ এপ্রিল, ১৯৪৪
প্রিয় আমার,
খোলা জানলার ধারে বসে নিসর্গ সুখ অনুভব করা, পাখিদের গান শোনা, দুই গালে রোদ এসে পড়া আর তোমার বাহুডোরে এক প্রিয়জন–এর চেয়ে সুন্দর জিনিস পৃথিবীতে আর আছে নাকি? দুই হাত দিয়ে সে আমাকে ঘিরে রেখেছে–কী স্নিগ্ধ, কী প্রশান্ত সেই অনুভূতি; ও আমার কাছে রয়েছে জেনেও মুখে আমার কোনো কথা নেই; জিনিসটা খারাপ নয়, কেননা এই অচঞ্চলতা কল্যাণকর। আর যেন কখনও কেউ এসে শান্তি ভঙ্গ না করে, এমন কি মুশ্চিও নয়।
