ঈশ্বর যদি আমাকে বাঁচিয়ে রাখেন, মা-মণির চেয়ে আমি অনেক বেশি সার্থক হব, আমি হেঁজিপেঁজি হয়ে থাকব না, আমি দুনিয়া জুড়ে সব মানুষের জন্যে নিজেকে ঢেলে দেব।–এখন আমি জেনেছি, আমার পক্ষে সর্বপ্রথম এবং সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হল সাহস
আর চিত্তের প্রফুল্লতা।
তোমার আনা।
.
শুক্রবার, ১৪ এপ্রিল, ১৯৪৪
আদরের কিটি,
এখানকার আবহাওয়া এখনও বেজায় অস্বাভাবিক। পিমের এমন অবস্থা যে, আরেকটু হলেই ফেটে পড়বেন। মিসেস ফান ডান সর্দিজ্বরে পড়েছেন এবং হেঁচে-কেশে বাড়ি মাথায় করছেন। মিস্টার ফান ডান সিগারেটের অভাবে কেমন যেন ফ্যাকাশে হয়ে পড়ছেন, প্রচুর সুখস্বাচ্ছন্দ্য ত্যাগ করছেন যে ডুসেল, তাঁর টিকাটিপ্পনি লেগেই আছে, ইত্যাদি ইত্যাদি।
এ বিষয়ে সন্দেহ নেই যে, এখন আমাদের পাথর চাপা কপাল। শৌচাগারে ফুটো পানির কলের ওয়াশার বেপাত্তা, তবে যেহেতু আমাদের অনেক চেনাজানা, শীগগিরই এসব জিনিস আমরা ঠিকঠাক করে নিতে পারব।
জানি, মাঝে মাঝে আমি ভাবালু হয়ে পড়ি, তবে কখনও কখনও এখানে কারণ ঘটে ভাবালু হয়ে পড়ার, যখন আমি আর পেটার কোথাও রাবিশ আর ধুলোর রাজ্যে একটা শক্ত প্যাকিং বাক্সের ওপর কাঁধ ধরাধরি করে খুব ঘেঁষাঘেঁষি হয়ে বসি, আমার একথোকা কোকড়া চুলে থাকে ওর হাত; যখন বাইরে পাখিরা গান গায় আর তুমি দেখতে পাও গাছগুলো কেমন পাল্টে সবুজ হয়ে যায়, খোলা হাওয়ার আমন্ত্রণ জানায় ঝকঝকে রোদ, যখন আকাশ অসম্ভব নীল, তখন–হায়, তখন আমার কত কী যে ইচ্ছে হয়।
তাকালেই দেখা যাবে এখানে সবাই অখুশি, সকলেরই হাঁড়ি মুখ; শুধূ দীর্ঘশ্বাস আর। চাপা নালিশ। দেখে বাস্তবিকই মনে হবে আমরা যেন অকস্মাৎ, খুব দুরবস্থায় পড়ে গিয়েছি। যদি সত্যি বলতে হয়, যতটা খারাপ পুরোটাই তোমার নিজেরই তৈরি। এখানে ভালো জিনিস করে দেখাবার কেউ নেই; প্রত্যেকের দেখা উচিত সে যাতে তার বিশেষ মানসিক অবস্থা কাটিয়ে উঠতে পারে। রোজই তুমি শুনবে ‘এ সবের শেষ হলে বাঁচতাম।‘
আমার কাজ, আমার আশা, আমার ভালবাসা, আমার সাহস–এরই জোরে আমি পানির ওপর মাথা ভাসিয়ে রেখেছি এবং খুঁতখুঁত করার হাত থেকে বেঁচেছি।
আমি সত্যিই মনে করি, কিটি, আজ আমার মাথাটা একটু গুলিয়ে গিয়েছে। তবে, কেন তা জানি না। এখানে সবকিছু এত তালগোল পাকানো, কোনোটার সঙ্গে কোনোটারই আর কোনো যোগ নেই, এবং কখনও কখনও আমার খুবই সন্দেহ হয়, ভবিষ্যতে আমার এই আবোলতাবোলে কেউ কোনো আগ্রহ বোধ করবে কিনা।
এই সব আবোলতাবোলের শিরোনাম হবে ‘এক কুচ্ছিত হংসীশাবকের মনখোলা কথা।‘ আমার ডায়রি বস্তুত সর্বশ্রী বকেস্টাইন বা জেব্রাণ্ডির (লণ্ডনে নির্বাসনে গঠিত মন্ত্রিসভার দুই সদস্য) বিশেষ কাজে আসবে না।
তোমার আনা।
.
শনিবার, ১৫ এপ্রিল, ১৯৪৪
আদরের কিটি।
‘এক ধাক্কা সামলাতে না সামলাতে আরেক ধাক্কা। এ থেকে কি কোনো নিষ্কৃতি নেই?’ নিজেদের অকপটে এখন আমরা এ প্রশ্ন করতেই পারি। সর্বশেষ কী ঘটনা ঘটেছে বোধহয় জানো না। পেটার, করেছিল কি, সামনের দরজার হুড়কো খুলতে (রাত্রে ভেতর থেকে আগল দিয়ে রাখা হয়) ভুলে গিয়েছিল; এদিকে অন্য দরজাটার তালা বিগৃড়ে আছে। ফলে, ক্রালার আর অফিসের অন্য লোকজনের বাড়ির ভেতরে ঢুকতে পারেননি। ক্রালার তখন পাড়াপড়শীদের সাহায্য নিয়ে রান্নাঘরে জানালা ভেঙে পেছনের দিক দিয়ে বাড়িতে ঢোকেন। আমাদের এই আহাম্মকিতে ক্রালার রেগে আগুন হয়ে গেছেন।
পেটার জানো তা, এতে ভীষণ মনঃক্ষুণ্ণ হয়ে পড়েছে। খেতে বসে একসময়ে মা-মণি যেই বলেছেন যে, আর কারো চেয়ে পেটারের জন্যেই তার বেশি দুঃখ হয়েছে, সঙ্গে সঙ্গে পেটারের যেন চোখ ফেটে পানি বেরিয়ে আসার উপক্রম হল। এ ব্যাপারে পেটার একা নয়, আমরাও সমান দোষী; কারণ প্রায় প্রতিদিনই এ বাড়ির পুরুষেরা জিজ্ঞেস করেন দরজার হুড়কো ভোলা হয়েছে কিনা। আজই কেউ সেটা জিজ্ঞেস করেনি।
হয়ত পরে আমি ওকে খানিকটা বুঝিয়ে শান্ত করে তুলতে পারব। ওর জন্যে কিছু করতে পারলে আমি কী আনন্দ যে পাই!
তোমার আনা।
.
রবিবার, ১৬ এপ্রিল, ১৯৪৪
প্রাণপ্রতিম কিটি,
কালকের তারিখটা মনে রেখো, আমার জীবনে ছিল খুব স্মরণীয় একটি দিন। প্রত্যেকটি মেয়ের কাছেই সেই দিনটি নিশ্চয় খুব বড় হয়ে দেখা দেয়, যেদিন সে পায় জীবনের প্রথম চুম্বন? তাহলে আমার কাছেও এই দিনের ততটাই গুরুত্ব। আমার ডান গালে আমার ডান হাতে মিস্টার ওয়াকারের সেই চুম্বনটি।
হঠাৎ কী করে এই চুমো খাওয়ার ব্যাপারটা ঘটল? রসো, বলছি।
কাল সন্ধ্যেবেলায়, তখন ঘড়িতে আটটা, আমি পেটারের ডিভানে গিয়ে বসেছি তার খানিক পরেই ও আমাকে হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরল। আমি বললাম, একটু সরে বসলে ভালো হয়, তাহলে আর আলমারিতে আমার মাথা ঠুকে যাওয়ার ভয় থাকবে না। প্রায় কোণের দিকে ও সরে গেল! ওর হাতের ভেতর দিয়ে ওর পিঠের আড়াআড়ি আমি হাত বাড়িয়ে দিলাম; আমার কাধে ওর হাত ঝুলে থাকায় আমি প্রায় ওর কোলের মধ্যে চলে গেলাম।
আগেও আমরা এভাবে কয়েকবার বসেছি, কিন্তু কালকের মতন অতটা গায়ে গায়ে হয়ে নয়। ও বেশ শক্ত করে আমাকে ধরে রইল, আমার বাঁ কাঁধ ওর বুকের ওপর। ততক্ষণে আমার হৃদস্পন্দন দ্রুততর; কিন্তু তখনও আমরা শেষ করিনি। ওর কাঁধে যতক্ষণ আমি মাথা রাখলাম এবং যতক্ষণ দুজনে মাথায় মাথায় না হলাম পেটার ছাড়ল না। মিনিট পাঁচেক পরে আমি সোজা হয়ে বসেছি, খানিক পরে পেটার আরেকবার আমার মাথাটা ওর হাতের মধ্যে ধরে কাঁধে রেখে মাথায় মাথা ঠেকাল। ওঃ, কী যে ভাল লাগছিল বলবার নয়, আনন্দে গদগদ হয়ে আমি বিশেষ কথা বলতে পারছিরাম না। ও আমার গালে আর হাতে খানিকটা আনাড়ির মতো ঠোনা মারছিল, আমার কোঁকড়া চুলের থোকাগুলো নিয়ে খেলা করছিল এবং প্রায় সারাক্ষণ আমরা মাথায় মাথা দিয়ে ছিলাম। আমি তোমাকে বলে বোঝাতে পারব না, কিটি, সে যে কী আশ্চর্য অনুভুতি; আনন্দে আমার বারোধ হয়ে গিয়েছিল; আমার ধারণা, পেটারেরও তাই।
