হেংক তাঁকে ধন্যবাদ জানিয়ে চলে যান। আমরা এখানে আছি বোঝাই যায়, সব্জিওয়ালা সেটা আঁচ করেন; কারণ উনি দুপুরের খাওয়ার সময়টাতে বরাবর আলু এনে দেন। লোকটা কী ভালো!
হেংক চলে গেলেন এবং আমরা বাসন মাজা সেরে ফেললাম, ঘড়িতে তখন একটা। আমরা সবাই ঘুমোতে চলে গেলাম। পৌনে তিনটেয় আমার ঘুম ভাঙল, ততক্ষণে দেখি ডুসেল হাওয়া। ঘুম-ঘুম চোখে একেবারেই আলটপকা পেটারের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। পেটার তখন সবে নেমে এসেছে। কথা হল নিচের তলায় আমরা দেখা করব।
আমি ঠিকঠাক হয়ে নিচে গেলাম। পেটার জিজ্ঞেস করল, সামনের চিলেকোঠায় যাওয়ার এখনও বুকের পাটা আছে তোমার?’ আমি ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানালাম, তারপর আমার বালিশটা বগলদাবা করে চিলেকোঠায় উঠে গেলাম। আবহাওয়াটা ছিল দারুণ, একটু পরেই আর্তনাদ শুরু করে দিল সাইরেন। আমরা নড়লাম না। পেটার একটা হাতে আমার কাঁধ জড়াল, আমি একটা হাতে ওর কাঁধ হাত রেখে আমরা চুপচাপ বসে রইলাম যতক্ষণ চারটের সময় মারগট কফি খাওয়ার জন্যে আমাদের ডাকতে এল।
আমরা রুটি শেষ করে লেমোনেড খেলাম এবং হাসিঠাট্টা করলাম (আবার আমরা পারছি), বলতে গেলে সব সেই আগের মতোই স্বাভবিক ভাবে। সন্ধ্যেবেলায় পেটারকে আমি সাবাস জানালাম আমাদের মধ্যে পেটারই সবচেয়ে বেশি সাহস দেখিয়েছে।
সে রাতের মতো বিপদে আমরা কেউ কখনও পড়িনি। ঈশ্বর আমাদের প্রকৃতই রক্ষা করেছেন; একবার অবস্থাটা ভেবে দেখ–আমাদের আলমারির গুপ্তস্থলে পুলিস দাঁড়িয়ে ডানদিকে ঠিক তার সামনে প্যাট প্যাট করে আলো জ্বলছে, এবং এ সত্ত্বেও আমরা চোখের আড়ালে রয়ে গেলাম। যদি দেশ চড়াও হয়, সেই সঙ্গে বোমাবাজি চলে–সবাই তাহলে চাচা আপন প্রাণ বাচা বলে ছুটবে। কিন্তু অপকট রক্ষাকারী হিসেবে এক্ষেত্রে ভয় জিনিসটা আমাদের উপকারেও লেগেছে।
‘আমরা রক্ষা পেয়েছি, আমাদের রক্ষা করে চলো।’ এইটুকুই আমরা শুধু বলতে পারি।
এই ব্যাপারটা বেশ কিছু পরিবর্তন ঘটিয়েছে। মিস্টার ডুসেল আর এখন সন্ধ্যেগুলোতে নিচে গিয়ে ক্রালারের আপিস ঘরে বসেন না; তার বদলে বাথরুমে বসেন। সাড়ে আটটায় এবং সাড়ে নটায় পেটার একবার সারা বাড়ি চক্কর দিয়ে দেখে আসে। রাতে এখন আর পেটারকে তার জানলা খুলতে দেওয়া হয় না। বন্ধ ফাঁকফোকর সাড়ে নটার পর কেউ খুলতে পারবে না। আজ সন্ধ্যের দিকে একজন ছুতোর মিস্ত্রি আসছে মালখানার দরজাগুলো আরও মজবুত করতে।
‘গুপ্ত মহলে’ এখন সবসময় নানা বিষয়ে বাদানুবাদ চলেছে। অসতর্কতার জন্যে ক্রালার আমাদের বকেছেন। হেংকও বলেছেন যে, এ রকম ক্ষেত্রে আমরা যেন কখনো নিচের তলায় না যাই। আমাদের পই পই করে বলা হয়েছে যেন মনে রাখি আমরা লুকিয়ে আছি, আমরা হলাম পায়ে বেড়ি পরা ইহুদি, এক জায়গায় আটক, আমাদের অধিকার বলে কিছু নেই, কিন্তু আমাদের হাজারটা করণীয়। আমরা ইহুদিরা যেন কাউকে জানতে না দিই আমাদের মনে কী হচ্ছে, আমাদের সাহসী আর শক্ত হতে হবে। বিনা ওজর আপত্তিতে সব অসুবিধে মাথা পেতে নিতে হবে, ক্ষমতায় যতটা কুলোয় করে যেতে হবে এবং ঈশ্বরে বিশ্বাস রাখতে হবে। একদিন এই ভয়ঙ্কর যুদ্ধ থেমে যাবে। এমন একটা সময় নিশ্চয়ই আসবে যখন আমরা আবার মনুষ্য পদবাচ্য হব কেবল ইহুদি হয়ে থাকব না।
কে আমাদের ওপর এ জিনিস চাপিয়েছে? আর সব মানুষ থেকে আমাদের ইহুদিদের কে আলাদা করেছে? আজ অব্দি কার প্রশ্রয়ে আমাদের এমন জ্বালাযন্ত্রণা পেতে হয়েছে? ঈশ্বর আজ আমাদের এমন অবস্থায় ফেলেছেন, আবার সেই ঈশ্বরই আমাদের টেনে ওপরে তুলবেন। আমরা যদি তাবৎ লাঞ্ছনা সহ্য করতে পারি এবং এসব চুকেবুকে গেলে, ফৌত না হয়ে যে ইহুদিরা আখেরে বেঁচে থাকবে তাদের আদর্শ হিসেবে তুলে ধরা হবে। কে জানে, এমন কি এও হতে পারে যে, আমাদের ধর্ম থেকেই সারা দুনিয়ার সব জাতের মানুষ সৎ শিক্ষা পারে এবং সেই কারণে, শুধু সেই কারণেই, এখন আমাদের কষ্ট পেতে হবে। আমরা কোনাদিনই নিছক নেদারল্যাণ্ডীয়, কিংবা নিছক ইংরেজ বা সেদিক থেকে অন্য কোনো দেশীয় হতে পারব না; আমরা চিরদিই যে ইহুদিই থাকব। কিন্তু তাই তো আমরা চাই।
সাহসে বুক বাধো! এসো আমরা গাইগুই না করে আমাদের কর্তব্য সম্বন্ধে অবহিত থাকি, সমাধান একটা হবেই, ঈশ্বর আমাদের লোকজনদের কখনই ছেড়ে যাননি। যুগ যুগ ধরে ইহুদিরা আছে, সব যুগেই তাদের লাঞ্ছনা পেতে হয়েছে, কিন্তু তাতে তারা শক্তিমানও হয়েছে; যে দুর্বল সে মরে; যে সবল সে থেকে যায়, কখনও বরবাদ হয়ে যায় না।
সেদিন রাত্রে আমার সত্যিই মনে হয়েছিল আমি মরে যাব, পুলিস আসার অপেক্ষা করেছি, যুদ্ধক্ষেত্রের সৈনিকের মতোই আমি তৈরি ছিলাম। দেশের জন্যে প্রাণ দিতে আমি উৎসুক ছিলাম, কিন্তু এখন, এখন আমি আবার যমের মুখ থেকে ফিরে এসেছি, এখন আমার যুদ্ধান্তের প্রথম ইচ্ছে হল ওলন্দাজ হওয়া। ওলন্দাজদের আমি ভালবাসি, এই দেশ আমি ভালবাসি, এখনকার ভাষা আমার প্রিয় এবং আমি এখানে কাজ করতে চাই। এমন কি যদি রানীকে আমায় লিখতেও হয়, তবু লক্ষ্যে না পৌঁছুনো পর্যন্ত আমি হাল ছাড়ব না।
দিন দিন আমার মা-বাবার ওপর নির্ভরতা আরও কমছে; আমার বয়স কম বলে, মা মণির চেয়ে ঢের বেশি সাহস ভারে আমি জীবনের মুখোমুখি দাঁড়াতে পারি; ন্যায় বিচারের প্রতি আমার মনোভাব ওঁর চেয়ে ঢের অবিচল আর অকৃত্রিম। আমি আমার মন চিনি, আমার একটা লক্ষ্য আছে, মতামত আছে; আমার আছে একটা ধর্ম আর ভালবাসা। আমি যা, আমি যদি তাই হই তাহলেই সন্তুষ্ট হব। আমি জানি আমি একজন মেয়ে; এমন এক মেয়ে, যার আন্তরিক শক্তি আছে এবং যে প্রচুর সাহসী।
