‘মিসেস ফান ডান, সৈন্যদের মতো আমাদের আচরণ হওয়া উচিত। যদি আমাদের দিন ফুরিয়ে গিয়ে থাকে, তাহলে যাওয়া যাক রানী আর দেশের জন্যে, স্বাধীনতা সত্য আর ন্যায়ের জন্যে ইংল্যাণ্ড থেকে ডাচ খবর প্রচারের সূত্রে সব সময় যা বলা হয়। একটাই শুধু যাচ্ছেতাই ব্যাপার। আমাদের সঙ্গে সঙ্গে আরও গুচ্ছের লোক মুশকিলে পড়ে যাবে।‘
এক ঘণ্টা পরে মিস্টার ফান ডান তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে আবার জায়গা বদল করলেন। আর বাপি এসে আমার পাশে বসলেন। দুই পুরুষ মানুষ মিলে অবিরাম ধোয়া টেনে চললেন, থেকে থেকে একটি করে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে, তারপর একজন কেউ টুকরিতে গিয়ে বসে, তারপর আগাগোড়া আবার একই ভাবে চলে।
চারটে, পাঁচটা, সাড়ে পাঁচটা। তখন আমি গিয়ে পেটারের কাছে জানলার পাশে বসে কান খাড়া করে রইলাম। দুজনে দুজনের এত কাছাকাছি যে, আমরা পরস্পরের শরীরের কেঁপে ওঠা টের পাচ্ছি। পাশের ঘরে ওরা আলোয় পরানো ঠুলি সরিয়ে নিয়েছে। ওরা চেয়েছিল সাতটায় কুপহুইসকে টেলিফোনে ধরতে, যাতে তিনি কাউকে এদিকটাতে পাঠিয়ে দেন। টেলিফোনে কী বলা হবে, সেটা ওরা একটা কাগজে আনুপূর্বিক লিখে নেয়। দরজায় কিংবা মালখানায় কোনো পুলিশ পাহারায় থাকলে তার কানে টেলিফোনের আওয়াজ যাওয়ার সমূহ ভয়। কিন্তু পুলিস বাহিনী ফিরে এলে তাতে আরও বেশি বিপদের ভয়।
কুপহুইসকে এই এই জিনিস বলতে হবে–
সিঁদ কেটে চোর ঢুকেছিল; পুলিস এ বাড়িতে আসে; তারা ঝোলা-আলমারি পর্যন্ত যায়, তার বেশি এগোয়নি।
বোঝাই যায়, সিঁদেল-চোররা বাধা পেয়ে মালখানার দরজা ভেঙে বাগানের দিক দিয়ে চম্পট দেয়।
সদর দরজায় হুড়কো দেওয়া ছিল বলে বেরোবার সময় ক্রালার নিশ্চয় দ্বিতীয় দরজাটি ব্যবহার করেন। খাস কামরার অফিসে কালো কেসের মধ্যে টাইপরাইটার আর গণক যন্ত্রটি নিরাপদে রাখা আছে।
হেংককে যেন হুঁশিয়ার করা হয় এবং এলির কাছ থেকে চাবি আনিয়ে নিয়ে বেড়ালকে খেতে দেওয়ার অছিলায়–সে যেন অফিসে গিয়ে একটু টহল দিয়ে দেখে নেয়।
সব কিছু ঠিক প্ল্যান মাফিক হল। কুপহুইস ফোন পেলেন। যে টাইপরাইটারগুলো ওপর তলায় ছিল সেগুলো কেসের ভেতর ভরে রাখা হল। তারপর আমরা টেবিলে গোল হয়ে বসে হয় হেংক, নয় পুলিসের জন্যে অপেক্ষা করে রইলাম।
পেটার ঘুমিয়ে পড়েছিল। আমি আর ফান ডান মেঝের ওপর এলিয়ে রয়েছি। এমন সময় নিচের তলায় দুম দুম করে পায়ের আওয়াজ। আমি চুপচাপ উঠে পড়ে বললাম, ‘হেংক এসেছেন।
বাকি লোকদের কয়েকজন বলল, ‘না, না, পুলিস।‘
দরজায় খুট খুট করে কারো আওয়াজ, সেইসঙ্গে মিপের শিস্। মিসেস ফান ডান আর পারলেন না, তাঁর মুখ কাগজের মতো সাদা, হাঁটু ভেঙে ধপ করে চেয়ারের ওপর বসে পড়লেন। ওঁর স্নায়ুর ওপর চাপ যদি আর এক মিনিটও স্থায়ী হত, তাহলে উনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলতেন।
মিপ আর হেংক যখন আমাদের ঘরে ঢুকলেন, তখন সে এক দৃশ্যই বটে–শুধু টেবিলটারই অবস্থা ফটো তুলে রেখে দেওয়ার মতো। এক কপি ‘সিনেমা ও থিয়েটার’, তার ওপর জেবৃড়ে রয়েছে জ্যাম আর উদরাময়ের একটি দাওয়াই, খোলা পৃষ্ঠাটিতে নর্তকীর দল; জ্যাম রাখার দুটো বয়াম, আধ-খাওয়া দুটো পাউরুটি; একটা আরশি, চিরুনি, দেশলাই, ছাই, সিগারেট, তামাক, ছাইদানি, বই, গোটা দুই প্যান্ট, একটা টর্চ, টয়লেট পেপার ইত্যাদি, ইত্যাদি সব বিচিত্র জেল্লায় একসঙ্গে তালগোল পাকিয়ে।
হেংকক্ আর মিকে অবশ্যই হৈ হৈ করে এবং চোখের পানিতে স্বাগত জানানো হল। কয়েকটা তক্তা দিয়ে হেংক দরজার গর্তটা মেরামত করে দিলেন এবং খানিক পরেই সিঁদ কাটার ব্যাপারটা পুলিসকে এতেলা করতে চলে গেলেন। মিপ্ মালখানার দরজার তলা থেকে রাতের চৌকিদার স্লটারের লেখা এটা চিরকুট কুড়িয়ে পেয়েছিলেন; স্লাটার ঐ গর্তটা দেখতে পেয়েছিলেন এবং পুলিসকে জানিয়েছিলেন। হেংক তার সঙ্গেও দেখা করে আসবেন।
সুতরাং আধঘণ্টার মধ্যে আমাদের ফিটফাট হয়ে নিতে হবে মাত্র আধঘণ্টার মধ্যে এমন রূপান্তর ঘটতে এর আগে কখনও দেখিনি। মারগট আর আমি বিছানার চাদরপত্র নিয়ে নিচের তলায় শৌচাগারে চলে গেলাম; ধোয়াধুয়ি সেরে দাঁত মাজলাম আর চুল ঠিক করে নিলাম। তারপর ঘরটা খানিকটা গোছগাছ করে ওপরতলায় ফিরে এলাম। এসে দেখি। টেবিলটা ইতিমধ্যেই সাফসুফ করা হয়ে গেছে। খানিকটা পানি ফুটিয়ে কফি আর চা করে, দুধ ফুটিয়ে নিয়ে টেবিলে মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করে ফেললাম। পেটারকে সঙ্গে নিয়ে বাপি টুরিগুলো খালি করে, গরম পানি ক্লোরিন দিয়ে ভালো করে পরিষ্কার করে ফেললেন।
হেংক ফিরে এলে এগারোটায় আমরা তাকে নিয়ে টেবিলের চারধারে বসে গেলাম। ততক্ষণে স্বাভাবিক জীবন আর জমাটি ভাব ফিরে আসতে শুরু করেছে।
মিস্টার স্লাটার তখন ঘুমোচ্ছিলেন। কিন্তু তার স্ত্রী হেংককে বললেন, ক্যানেলের কাছ বরাবর টহল দিতে দিতে তাঁর স্বামী আমাদের দরজায় ফোকর দেখতে পান এবং তখন পুলিসের একটি লোককে ডেকে এনে ওঁরা দুজনে বাড়ির ভেতর ঢুকে খোঁজখবর করেন। স্লাগটার মঙ্গলবার ক্রালারের সঙ্গে দেখা করে আরও সবিস্তারে সব বলবেন। থানায় গিয়ে দেখা গেল তারা সিঁদ কাটার কথা জানে না, তবে সেখানে সঙ্গে সঙ্গে পুলিস সেটা নোট করে নেয় এবং বলে যে, মঙ্গলবার এসে সব দেখেশুনে যাবে। ফেরার পথে মোড়ের মাথায় হেংক এর সঙ্গে আমাদের সব্জিওয়ালার দেখা হয়; হেংক তাকে বাড়িতে সিঁদ কাটার কথাটা বলেন। উনি শান্ত গলায় বললেন, ‘আমি সেটা জানি। কাল সন্ধ্যেবেলা আমার স্ত্রীকে নিয়ে যখন বেরোই তখন দরজার গায়ে গর্তটা দেখতে পাই। আমার স্ত্রীর দাঁড়াবার ইচ্ছে ছিল না, কিন্তু আমি টর্চ জ্বেলে ভেতরটা একবার দেখে নিলাম; সঙ্গে সঙ্গে চোরগুলো তখন পিঠটান দেয়। যাতে বিপদ-আপদ না হয়, তার জন্যে আমি ফোন করে পুলিসে খবর দিইনি; কেননা তোমার সঙ্গে আমার যা সম্পর্ক, তাতে সেটা করা উচিত হবে না বলে মনে করেছি। আমি কিছু জানি না, তবে অনেক কিছু আঁচ করতে পারি।’
