টর্চ-হাতে সেই বিবাহিত দম্পতি, খুব সম্ভবত ওরা কথাটা পুলিসের কানে তুলেছিলেন। ঘটনাটা ঘটে রবিবার সন্ধ্যেবেলায়, ঈস্টারের রবিবারে; পরদিন ঈস্টারের সোমবার, অফিস ফাঁকা। কাজেই মঙ্গলবার সকালের আগে আমরা কেউ জায়গা ছেড়ে নড়তে পারিনি।
ভেবে দেখ, দুই রাত আর একটি দিন ভয়ে কাঁটা হয়ে অপেক্ষা করে থাকা! কেউ কিছু করবার কথা বলতে পারছে না; কাজেই ঘুটঘুটে অন্ধকারে বসে থাকা ছাড়া আমাদের কোনো কাজ নেই–কেননা মিসেস ফান ডান ভয়ের চোটে নিজের অজ্ঞাত বাতিটার বারোটা বাজিয়ে দিয়েছেন। উনি কথা বলছেন ফিফিস করে এবং ক্যাচ করে শব্দ হলেই বলে উঠছেন, ‘চুপ, একদম চুপ!’
সাড়ে দশটা বাজল, এগারোটা বাজল, তবু কোনো আওয়াজ নেই। বাপি এবং ফান ডান পালা করে আমাদের কাছে বসছেন। যখন সোয়া এগারোটা হল, নিচের তলায়। লোকজনের নড়াচড়া আর গলার আওয়াজ পাওয়া গেল। প্রত্যেকের শুধু নিঃশ্বাস পড়ার শব্দ হচ্ছে, নইলে নড়াচড়া একেবারে বন্ধ। বাড়ির মধ্যে পায়ের শব্দ–খাস কামরার দপ্তরে, রান্নাঘরে, তারপর… আমাদের সিঁড়িতে। সবাই এবার নিঃশ্বাস চেপে রেখেছে, সিঁড়ি বেয়ে কারা যেন উঠছে, তারপরই ঝোলা-আলমারিতে ঘট ঘটু শব্দ। সেই মুহূর্তটির কোনো বর্ণনা হয় না। আমি বললাম, ব্যস, এবার খতম।’ মনশ্চক্ষে দেখতে পাচ্ছি ঐ রাত্রেই গেস্টাপো আমাদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে। আলমারির কাছে বার দুই ঘট ঘট শব্দ হওয়ার পর সব চুপচাপ। সিঁড়ি দিয়ে নেমে যাওয়ার শব্দ। এ পর্যন্ত আমরা তরে গেলাম। একটা কাঁপুনি যেন সবার মধ্যে সংক্রামিত হল; আমার কানে এল কারো দাঁতে দাঁতে ঠক ঠক করার শব্দ; কারো মুখে কোনো কথা নেই।
বাড়িটা এখন একেবারে নিস্তব্ধ; শুধু সিঁড়ির নিচে আলমারিটার ঠিক সামনে ড্যাব ড্যাব করে একটা আলো জ্বলছে। ওটা একটা রহস্যপূর্ণ আলমারি বলে কি? হতেও তো পারে, পুলিস আলো নেভাতে ভুলে গেছে? কেউ কি ফিরে এসে নিভিয়ে দিয়ে যাবে? আস্তে আস্তে মুখে কথা ফুটছে। বাড়িটাতে এখন আর কেউ নেই, হয়ত কেউ বাইরে দাঁড়িয়ে পাহারা দিচ্ছে।
এরপর আমরা তিনটে জিনিস করলাম–আমাদের ধারণায় যা ঘটেছে, তার পুনরালোচনা করলাম; ভয়ে আমরা কাঁপতে লাগলাম; এবং আমাদের পায়খানায় যেতে হল। টুকরিগুলো ছিল চিলেকোঠায়; থাকার মধ্যে আমাদের ছিল পেটারের ভেঁড়া কাগজ ফেলার টিনের পাত্র। প্রথমে গেলেন ফান ডান, তারপর বাপি, কিন্তু মা-মণি লজ্জায় ও মুখো হলেন না। বাপি হেঁড়া কাগজের টুরিটা ঘরের মধ্যে এনে দিলে মারগট, মিসেস ফান ডান আর আমি সানন্দে সেটির সদ্ব্যবহার করলাম। শেষ পর্যন্ত মা-মণিও পথে এলেন। সকলে সমানে কাগজ চাইতে লাগল–ভাগ্যক্রমে আমার পকেটে কিছু ছিল।
টিনটা থেকে ভয়ঙ্কর গন্ধ বেরোচ্ছে; সবাই ফিস্ ফিস্ করে কথাবার্তা বলছে; আমরা ক্লান্তিতে এলিয়ে পড়লাম; বেলা তখন বারোটা। মেঝেতেই তবে লম্বা হয়ে ঘুমোও। মারগটকে আর আমাকে একটি করে বালিশ আর একটি করে কম্বল দেওয়া হল। মারগট গিয়ে শুলো ভাড়ার রাখার আলমারির কাছে আর আমি টেবিলের দুটোর পায়ার মাঝখানে। মেঝের ওপর গন্ধটা তত তীব্র নয়, কিন্তু এই সঙ্গেও মিসেস ফান ডান চুপচাপ। কিছুটা ক্লোরিন নিয়ে এলেন এবং দ্বিতীয় কৌশল হাত মোছার একটা তোয়ালে এনে টুরির ওপর চাপা দিলেন।
কথা, ফিসফাস, ভয়, কটুগন্ধ, বায়ু নিঃসরণ আর তার সঙ্গে সর্বক্ষণ কারো না কারো টুকরিতে বসা; ঘুমোও তো দেখি কেমন পারো! যাই হোক, আড়াইটা নাগাদ ক্লান্তিতে আমার চোখ আপনি বুজে এল। অঘোরে ঘুমোলাম সাড়ে তিনটে অব্দি। মিসেস ফান ডানের মাথা আমার পায়ে ঠেকতে ঘুম ভেঙে গেল।
আমি বললাম, ‘দোহাই, আমাকে পরবার একটা কিছু দিন। আমাকে দেওয়া হল, কিন্তু কী দেওয়া হল জানতে চেয়ো না–আমার পাজামার ওপর এক জোড়া পশমের নিকার, একটা লাল জাম্পার আর একটা কালো স্কার্ট, সাদা উপরতল্লা জুতো এবং খেলার মাঠের এক জোড়া শতচ্ছিদ্র মোজা। এরপর মিসেস ফান ডান চেয়ারে বসলেন আর তাঁর স্বামী এসে আমার পায়ের ওপর ধপ করে শুয়ে পড়লেন। সাড়ে তিনটে পর্যন্ত শুয়ে আমি আকাশ-পাতাল ভাবলাম। সারাক্ষণ আমি হি হি করে কাঁপছিলাম–ফলে, মিস্টার ফান ডানের ঘুম মাটি হল। পুলিশ ফিরে আসবে, তার জন্যে আমি মনে মনে তৈরি হচ্ছিলাম; তখন বলতে হবে আমরা লুকিয়ে ছিলাম; ওরা যদি সাধারণ ঘরের ভালো ডাচ হয়, তো আমরা বাঁচলাম; আর যদি ডাচ নাৎসী (ডাচ ন্যাশনাল সোশালিস্ট) হয়, তো ঘুষ খাওয়াতে হবে।
মিসেস ফান ডান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘সে ক্ষেত্রে রেডিওটা নষ্ট করে ফেল।’ ওঁর স্বামী বললেন, ‘বেশ বলেছ, উনুনে ফেলে দাও! দেখ, ওরা যদি আমারই পাত্তা পায়, তাহলে আর রেডিওর পাত্তা পেলে কী এল গেল!‘
বাপি তাতে জুড়লেন, ‘তারপর আনার ডায়রিটা ওরা দেখতে পারে।’ এ বাড়ির সবচেয়ে ঘাবড়ে-যাওয়া লোকটি বলল, ‘ওটা পুড়িয়ে ফেললেই তো হয়।‘ এই কথা যখন বলা হল আর পুলিস যখন আলমারি-দেওয়া দরজায় ঘট ঘট ঘট করে শব্দ করেছিল–এই দুটোই ছিল আমার সবচেয়ে খারাপ মুহূর্ত। আমার ডায়রি কিছুতেই না; ডায়রি চলে গেলে তার সঙ্গে আমিও বিদায় হব।’ কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে বাপি চুপ হয়ে গেলেন।
এত বেশি কথা হয়েছিল যে, যতটা মনে আছে, তার সব পুনরুদ্ধার করে লাভ নেই। মিসেস ফান ডান বেজায় ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন, ওকে আমি সান্ত্বনা দিলাম। পালিয়ে যাওয়া আর গেস্টাপোর জেরার মুখে পড়া সম্পর্কে, টেলিফোন করার বিষয়ে এবং সাহসে বুক বাধার ব্যাপারে দুজনের কথা হল।
