এর মধ্যে একটা ভালো জিনিস এই যে, খাবারদাবার যত নিকৃষ্ট এবং দমনপীড়ন যত জোরালো হচ্ছে, কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে অন্তর্ঘাত সমানে ততই বাড়ছে। খাদ্য দপ্তরগুলোতে যারা কাজ করে, পুলিস, রাজকর্মচারী, এরা সবাই হয় শহরের বাকি লোকদের সঙ্গে থেকে মেহনত করছে এবং তাদের সাহায্য করছে আর তা নয়তো মিথ্যে লাগানো-ভজানো করে তাদের শ্রীঘরে পাঠাচ্ছে। সৌভাগ্যের বিষয়, ওলন্দাজ জনসাধারণের খুব একটা নগণ্য অংশই বিপথে চালিত হয়েছে।
তোমার আনা।
.
শুক্রবার, ৩১ মার্চ, ১৯৪৪
আদরের কিটি,
ভাবো একবার, এখনও রীতিমত শীত, অথচ আজ প্রায় মাসখানেক হতে চলল বেশিরভাগ লোকেরই ঘরে কয়লা নেই–বড় আরাম, তাই না! রুশ রণাঙ্গনের ক্ষেত্রে সাধারণভাবে লোকের আশাবাদ আবার চাগিয়ে উঠেছে, কেননা সেখানে দারুণ ব্যাপার ঘটছে। তুমি জানো, রাজনীতির বিষয়ে আমি বেশি কিছু লিখি না, কিন্তু তোমাকে এটুকু জানতেই হবে ওরা এখন কোথায় এসেছে; ওরা একদম পোল্যাণ্ডের সীমানায় এবং রুমানিয়ার কাছে থেকে পৌঁছে গেছে। একটু হাত বাড়ালেই ওডেসা। প্রতি সন্ধ্যায় এখানকার লোকেরা আশা করছে স্তালিনের কাছ থেকে বিশেষ বিজ্ঞপ্তি এল বলে।
একটা করে জিৎ হয় আর মস্কোয় তোপ দেগে আনন্দধ্বনি করা হয়। এত বেশি তোপ দাগার ঘটনা ঘটছে যে, মস্কো শহর নিশ্চয় রোজ কড়াক্কড় কড়াকড় আওয়াজে কেপে সারা হচ্ছে। হয়ত ওরা ভাবছে যুদ্ধটা হাতের মধ্যে এসে গেছে, এই বলে মনকে চোখ ঠারতে কী মজা! কিংবা ওরা হয়ত আনন্দ প্রকাশের আর কোনো ভাষা জানে না। দুইয়ের কোনটা ঠিক আমি জানি না।
হাঙ্গেরি জার্মান সৈন্যদের দখলে। এখনও সেখানে লাখ দশেক ইহুদি আছে; সুতরাং ওরাও এবার টেরটি পাবে।
পেটার আর আমার বিষয় নিয়ে বকবকানি এখন খানিকটা কম। দুজনে এখন আমরা হলায়-গলায়, একসঙ্গে অনেকক্ষণ কাটে এবং দুনিয়ার হেন বিষয় নেই যা নিয়ে আমরা কথা বলি না। বিপদের জায়গায় এসে পড়লে অন্য ছেলেদের বেলায় যেটা হয়, পেটারের ক্ষেত্রে সেটা হয় না কখনই নিজের রাশ ধরে রাখার দরকার পড়ে না। এটা যে কী ভালো, কী। বলব। যেমন, আমরা রক্তের বিষয় নিয়ে কথা বলছিলাম, তাই থেকে আমরা ঋতুস্রাবের কথায় এসে গেলাম। পেটার মনে করে, আমরা মেয়েরা খুব শক্ত ধাতুতে গড়া। ব্যাপারখানা কী? এখানে এসে আমি ভালো আছি; অনেক ভালো। ঈশ্বর আমাকে একা ফেলে রেখে যাননি, একা ফেলে রেখে যাবেন না।
তোমার আনা।
০৮. আমি মরে যাচ্ছি একটি চুমোর জন্যে
শনিবার, ১ এপ্রিল, ১৯৪৪
আদরের কিটি,
আর এত করেও এখনও সবই কী দুষ্কর; আশাকরি বুঝতে পারছ আমি কী বলতে চাইছি; পারছ না? আমি মরে যাচ্ছি একটি চুমোর জন্যে, যে চুমো আসি-আসি করে আজও এল না। তবে কি সমতক্ষণ আমাকে সে আজও বন্ধুর আসনেই বসিয়ে রেখে দিয়েছে? আমি কি তার বেশি কিছু নই? তুমি জানো আর আমি জানি, আমি শক্ত মানুষ আমার প্রায় সব বোঝা আমি একাই বহন করতে পারি! আর কাউকে নিজের মাথাব্যথার অংশীদার করা, আমার মা র আঁচল ধরে থাকা–কখনই এটা আমার অভ্যেস নয়। কিন্তু এখন আমি আপনা থেকে চাই শুধু একটি বারের জন্যে তার কাধে মাথা রেখে চুপচাপ পড়ে থাকতে।
পেটারের গালে গাল রাখার সেই স্বপ্ন আমি জীবনেও ভুলব না, কী যে ভালো লেগেছিল। কী বলব! পেটারও কি তার জন্যে ব্যাকুল হবে না? শুধু কি বেশিরকম লজ্জার দরুনই সে তার নিজের ভালবাসা স্বীকার করতে পারছে না? কেন সে থেকে থেকেই আমাকে তার কাছে চায়? হায়, কেন ও মুখ ফুটে বলে না? আর নয়, আমাকে শান্ত হতে হবে, আমি শক্ত থাকব। এবং একটু ধৈর্য ধরে থাকলে অন্যটাও এসে যাবে, কিন্তু সবচেয়ে খারাপ ব্যাপার সেটাই দেখে মনে হচ্ছে আমি হন্যে হয়েছি ওর জন্যে; সবসময় শুধু আমিই ওপরে যাই, ও কখনই আমার কাছে আসে না। কিন্তু তার কারণ তো শুধু ঘর। ও সেই অসুবিধে নিশ্চয়ই বুঝবে।
বটেই তো, আরও অনেক কিছু আছে যা সে বুঝবে।
তোমার আনা।
.
সোমবার, ৩ এপ্রিল, ১৯৪৪
আদরের কিটি,
সাধারণত যা করি না আজ একবার তাই করব; খাবারের বিষয়ে বিস্তারিতভাবে লিখব, তার। কারণ বিষয়টা হয়ে দাঁড়িয়েছে অত্যন্ত গোলমেলে আর জরুরী–শুধু এই ‘গুপ্ত মহলে’ নয়। সারা হল্যাণ্ড, গোটা ইউরোপ এবং তারও বাইরে।
এখানে আমাদের বসবাসের এই একুশ মাসে অনেকগুলো খাদ্য চক্করের ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে। এর মানেটা, দাঁড়াও, এখুনি তোমাকে বুঝিয়ে দিচ্ছি। খাদ্য চক্কর’ হচ্ছে সেই সময়টা যখন শুধু একটি মাত্র পদ বা একটিমাত্র সব্জি ছাড়া আর কিছু খাবার জোটে না। একসময়ে দীর্ঘদিন আমাদের ক্রমাগত কাসনি শাক খেতে হয়েছে–বালি-কিচকিচ-করা কাসনি, বালি-ছাড়া কাসনি, কাসনির দমপুক্ত, কাসনি সেদ্ধ বা কাসনির বাটা-চচ্চড়ি। এরপর পালা করে এল পালং শাক, কচালু, শশা, টমেটো, টক-কপি, এইরকম আরও কিছু।
যেমন, রোজ এবেলা ওবেলা একগাদা টক-কপি খাওয়াটা কী যে অরুচিকর কী বলব, অথচ ক্ষিধের পেটে খেতে তো হবেই। যাই হোক, এখন আমাদের সবচেয়ে রমরমে সময়, কারণ টাটকা সব্জি একেবারেই পাওয়া যাচ্ছে না।
সন্ধ্যেবেলায় হপ্তাভর আমাদের খাদ্যতালিকা হল শিম, কড়াইশুটির সুপ, মালপুয়ার সঙ্গে আলু, আলু-পনির এবং ঈশ্বরের কৃপায়, মাঝেমধ্যে শালগমের মাথা আর পচ-ধরা গাজর আর তারপর আবার ঘুরে আসে শিম। পাউরুটির ঘাটতির জন্যে প্রাতরাশ থেকে শুরু করে বসলেই খাওয়ার পাতে আলু। আমরা তৈরি শিম বা শিমের কোয়া, আলু দিয়ে সুপ, প্যাকেটের জুলিনে সুপ, প্যাকেটের ফ্রেঞ্চ সুপ, প্যাকেটের শিম দিয়ে সুপ। রুটি বাদ দিলে সবেতেই শিম।
