সন্ধ্যেবেলায় থাকবেই সুরুয়ার সঙ্গে আলু আর–এখনও থেকে গেছে, ভাগ্যিস–বীট সালাড। সরকারী ময়দা, পানি আর খামির দিয়ে আমাদের তৈরি মালপুয়ার একটু গুণ বর্ননা করব। মালপুয়াগুলো এত শক্ত আর আঠা আঠা হয় যে, পেটে গিয়ে যেন পাথরের মতো চেপে বসে–ওহ্, সে যা জিনিস!
প্রতি সপ্তাহের মস্ত বড় আকর্ষণ হলো মেটে দিয়ে তৈরি সসেজ, আর জ্যাম মাখানো শুখা রুটি। তবু কিন্তু আমরা বেঁচে আছি এবং খাবার খারাপ হলেও প্রায়ই খেয়ে তৃপ্তি হয়।
তোমার আনা।
.
মঙ্গলবার, ৪ এপ্রিল, ১৯৪৪
আদরের কিটি,
অনেক দিন অব্দি আমার মনে হত কিসের জন্যে আর খেটে মরব। যুদ্ধ শেষ হওয়ার সম্ভাবনা সুদূর পরাহত, রূপকথার মতোই অবাস্তব। সেপ্টেম্বরের মধ্যে যুদ্ধ শেষ না হলে আমার ইস্কুল যাওয়ার দফারফা। কেননা আমি চাই না দুই বছর পেছনে পড়ে থাকতে। আমার দিনগুলো ভরে রাখতে পেটার–উঠতে পেটার; বসতে পেটার, শয়নে স্বপনে শুধুই সে। শনিবার পর্যন্ত এই চলেছে।
এই সময় আমি এমন মনমরা হয়ে পড়লাম কী বলব। সাংঘাতিক মন-মরা। পেটারের সঙ্গে যতক্ষণ ছিলাম চোখের পানি ঠেকিয়ে রেখেছিলাম; তারপর ফান ডানদের সঙ্গে লেবুর শরবত খেতে খেতে একটু হাসিগল্প করে মনটা ভালো আর চাঙ্গা হলো। কিন্তু যে মুহূর্তে একা হয়েছি–তখনই আমি জানি আমি কেঁদে কেঁদে সারা হব। কাজেই রাতের পোশাক পরা অবস্থায় আমি মেঝের ওপর ঢলে পড়লাম।
প্রথম আমি খুব মনপ্রাণ দিয়ে আমার দীর্ঘ প্রার্থনাটা সেরে নিলাম; তারপর খালি মেঝের ওপর হাঁটু মুড়ে পুঁটুলি পাকিয়ে বসে দুটো বাহুর মধ্যে মুখ ডুবিয়ে আমি কাঁদলাম। একবার ফুপিয়ে কাদার পরই আমার চৈতন্য ফিরে এল; আমি কান্না বন্ধ করে দিলাম, পাছে পাশের ঘরের লোকে শুনতে পায়। এরপর আমি চেষ্টা করলাম মনের মধ্যে খানিকটা জোর আনতে। আমি চাই, আমি চাই, আমি চাই…’ এর বেশি গলা দিয়ে আর স্বর বেরোল না। অস্বাভাবিক ভঙ্গির দরুন সম্পূর্ণ কাঠ হয়ে গিয়ে শরীরটা বিছানার ধারে গিয়ে পড়ল, তারপর থেকে চেষ্টা করতে করতে বিছানায় ওঠা শেষ পর্যন্ত সম্ভব হলো না ঠিক সাড়ে দশটার আগে। ততক্ষণে। নিজেকে সামলে নিয়েছি।
এখন আর তার কোনো জের নেই। আমাকে খাটতে হবে যাতে মূখ বনে না যাই, যাতে উন্নতি করি, যাতে সাংবাদিক হতে পারি–সেটা হওয়াই আমার বাসনা। আমি জানি আমার। লেখার হাত আছে, আমার লেখা গোটা দুই গল্প বেশ ভালো, ‘গুপ্ত মহলে’র বর্ণনাগুলো সরস, আমার ডায়রির বিস্তর জায়গায় যথাযথ ভাব ফুটেছে আমার সত্যিকার ক্ষমতা আছে কি নেই পরে বোঝা যাবে।
আমার সবচেয়ে ভালো রূপকথা ইভার স্বপ্ন’; অদ্ভুত ব্যাপার হলো, কোথা থেকে যে সেটা এসেছে আমি জানি না। ‘ক্যাডির জীবনের বেশ খানিকটা ভালো, কিন্তু সব মিলিয়ে কিছু নয়।
আমার নিজের লেখার সবচেয়ে ভালো এবং তীব্রতম সমালোচক আমি নিজে। আমি জানি কোটা সুলিখিত, কোনটা নয়। যে নিজে লেখক না, সে জানে না লেখা জিনিসটা কী অপূর্ব একটা ব্যাপার। আমি একেবারেই আঁকতে পারি না বলে আগে দুঃখ করতাম, কিন্তু অন্তত লিখতে পারি বলে আমি ঢের বেশি খুশি। বই লেখা বা কাগজে লেখার গুণ যদি আমার নাও থেকে থাকে, সেক্ষেত্রে আমি নিজের জন্য লিখতে পারি।
আমি চাই এগিয়ে যেতে। মা-মণি আর মিসেস ফান ডান এবং অন্য সব মহিলারা যে যার কাজ করেন আর তারপর বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যান, ঠিক তাদের মতো জীবন-যাপন করার কথা আমি ভাবতেই পারি না। স্বামী-পুত্র ছাড়াও আমার এমন কিছু থাকবে, যার হাতে আমি নিজেকে সঁপে দিতে পারব।
মৃত্যুর পরেও আমি চাই বেঁচে থাকতে। কাজেই ঈশ্বরদও এই ক্ষমতা নিজেকে ফুটিয়ে তোলার, লেখার, আমার অন্তরের সব কিছু ব্যক্ত করার এই সম্ভাবনা–এর জন্যে আমি কৃতজ্ঞ।
আমি লিখতে বসে সব কিছু মন থেকে ঝেড়ে ফেলতে পারি; আমার দুঃখ উবে যায়, আমার মনোবল ফিরে আসে। কিন্তু আমি কি মহৎ কিছু লিখতে পারব, কখনও কি হতে পারব সাংবাদিক বা লেখক? এটাই বড় প্রশ্ন। আমার আশা, খুব বড় রকমের আশা যে, আমি পারব; কারণ, আমি যখন লিখি, আমার চিন্তা আমার আদর্শ আর আমার স্ব-কপোলকল্পনা সমস্তই আমার স্মৃতিপথে ফিরে আসে।
‘ক্যাডির জীবন’ যতটা লিখেছিলাম, তারপর এতদিনেও আর এগোয়নি। কি ভাবে এগোতে হবে আমার মনের মধ্যে তার ছবিটা স্পষ্ট, কিন্তু কেন জানি না কলম থেকে তা স্বতোৎসারিত হচ্ছে না। হয়ত কোনোদিনই ওটা শেষ হব না। হয়ত ছেড়া কাগজের ঝুড়িতে, কিংবা অগ্নিগর্ভে ওর স্থান হবে…। ভাবতে খুবই খারাপ লাগে, কিন্তু আমি তখন আমার মনকে বলি, ‘চৌদ্দ বছর বয়সে, এত সামান্য অভিজ্ঞতা নিয়ে, কোন্ সাহসে লেখায় তুমি দর্শন আনো?’ অগত্যা নতুন সাহসে বুক বেঁধে আবার এগোই; আমার ধারণা, আমি সফল হব, কেননা আমি লিখতে চাই।
তোমার আনা।
.
বৃহস্পতিবার, ৬ এপ্রিল, ১৯৪৪
আদরের কিটি,
তুমি জানতে চেয়েছ কী আমার নেশা, কিসে আমার ঝোক। বলছি–আগে থেকে জানিয়ে রাখি, আমার নেশা আর ঝোক এত বেশি যে, তাই দেখে যেন আবার ঘাবড়ে যেও না।
সর্বপ্রথম : লেখা কিন্তু নেশার মধ্যে সেটা ঠিক পড়ে না।
দুই নম্বর : বংশপঞ্জী। বই, পত্রিকা, পুস্তিকা পেলেই আমি ফরাসী, জার্মান, স্প্যানিশ, ইংরেজ, অস্ট্রিয়ান, রুশ, নরওয়েজিয়ান আর ডাচ রাজবংশের কুলজী খুঁজে বেড়াই! ওদের অনেকের বেলাতেই এ কাজে আমি অনেক দূর এগিয়েছি; তার কারণ, আজ বহুদিন থেকেই যাবতীয় জীবনী আর ইতিহাস বই পড়ে তা থেকে টুকে রাখার কাজ করে আসছি। এমন কি ইতিহাসের অনেক ভালো ভালো জায়গা আমি টুকে রাখি। আমার তৃতীয় নেশা, তার মানে, ইতিহাস। বাপি আমাকে এ বিষয়ের অনেক বই আগেই কিনে দিয়েছেন। যেদিন কোনো সাধারণ পাঠাগারে গিয়ে কবে বই হাঁটকাতে পারব সেই আশায় অধীর হয়ে দিন গুনছি।
