তোমার আনা।
.
মঙ্গলবার, ২৮ মার্চ, ১৯৪৪
প্রিয়তম কিটি, রাজনীতি নিয়ে আরও একগাদা লিখে ফেলতে পারতাম, কিন্তু আজ অন্য নানা বিষয়ে অনেক কিছু তোমাকে আমার বলার আছে। প্রথমত,–মণি আমাকে অত ঘন ঘন ওপর তলায় যেতে একরকম বারণই করে দিয়েছেন, কারণ তার মতে মিসেস ফান ডানের তাতে চোখ টাটায়। দ্বিতীয়ত, পেটার মারগটকে বলেছে আমরা ওপর তলায় থাকব, সে যেন আসে; জানি না, এটা মৌখিক ভদ্রতা–না সে মন থেকেই বলেছে। তৃতীয়ত, আমি গিয়ে বাপিকে জিজ্ঞেস করেছিলাম যে, মিসেস ফান ডানের হিংসুটেপনা আমি গায়ে মাখব কিনা। তার দরকার আছে বলে উনি মনে করেন না। এখন কী করা যায়? মা-মণি চটিতং; বোধ হয় ওঁর চোখও টাটাচ্ছে। ইদানীং আমরা মেলামেশা করলে বাপি কিছু মনে করেন না এবং আমাদের মধ্যে এত যে ভাব, সেটা খুব ভালো বলে ওর ধারণা। মারগটও পেটারের ভক্ত; তবে ওর ভাবটা হল, দুইয়ে নিবিড় আর তিনে ভিড়।
মা-মণির ধারণা, পেটার আমার প্রেমে পড়েছে; সেটা হলে, সত্যি বলতে, আমি খুশিই হতাম। তাহলে শোধবোধ হয়ে যেত এবং আমরা পরস্পরকে সত্যিই চিনতে পারতাম। মা মণি এও বলেন যে, পেটার আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। এখন, আমি মনে করি সেটা সত্যি, কিন্তু ও যদি আমার টোল-খাওয়া গালের দিকে তাকায় এবং আমরা মাঝে মাঝে পরস্পরের দিক আড়চোখে চাই, তবে আমার কি করার আছে? করার কিছু আছে কি?
আমি আছি ভারি মুশকিল অবস্থায়। মা-মণি আমার বিরুদ্ধে, আমিও মা-মণির বিরুদ্ধে। বাপি চোখ বুজে থাকেন, যাতে আমাদের নিঃশব্দ লড়াই দেখতে না হয়। মা-মণির মন ভার হয়ে থাকে, কারণ আমাকে উনি প্রকৃতই ভালবাসেন; আমার কিন্তু একটুও মন খারাপ হয় না। কারণ আমি মনে করি না মা-মনি বোঝেন। আর পেটার–আমি পেটারকে ছেড়ে দিতে চাই না, ও আমার বড় আদরের। আমি ওকে অসম্ভব পছন্দ করি; ক্রমে আমাদের মধ্যে একটা সুন্দর সম্পর্ক গড়ে উঠতে পারবে; কেন যে বুড়োগুলো সারাক্ষণ নাক গলায়? ভাগ্যি ভালো, আমার মনের ভাব আমি লুকোতে পারি; আমি পেটার বলতে পাগল, কিন্তু অতি চমৎকার ভাবে আমি সেটা লোকচক্ষের আড়াল করে রাখি। ও কি কোনোদিন কিছু বলবে? স্বপ্নে, যেমন পেটেলের গালে গাল রেখেছিলাম, সেই রকম কখনও কি আমার গালে পেটারের গাল রাখার অনুভূতি পাব? ও পেটার ও পেটেল–তোমরা এক, তোমরা অভিন্ন। ওরা আমাদের বোঝে না; দুজনে মুখোমুখি বলে, কোনো কথা না বলে আমরা সুখ পাই এটা কি কোনোদিনই ওদের মাথায় ঢুকবে না? ওরা বোঝে না কিসের তাড়নায় আমরা এভাবে একঠাই হয়েছি। ইস্, কবে যে এইসব মুশকিলের আসান হবে? এবং মুশকিলের আসান হওয়াই ভালো, তাহলে পরিণতিটা হবে আরও সুন্দর। পেটার যখন হাতের ওপর মাথা রেখে চোখ বুজে শুয়ে থাকে, ও তখনও শিশুটি; বোখার সঙ্গে খেলা করার সময় ও স্নেহময়; ও যখন আলু বা ভারী কিছু বয়ে নিয়ে যায়, পেটার তখন বলবান; ও গিয়ে যখন গোলাগুলি চলতে দেখে, অথবা অন্ধকারে চোর ধরতে যায়, তখন ও সাহসী; আর ও যখন অসম্ভব এলোমেলো আর কাছাখোলা, তখন ওকে আদর করতে ইচ্ছে করে।
আমার অনেক ভালো লাগে আমি ওকে তালিম দেওয়ার চেয়ে ও যখন আমাকে কিছু ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে দেয়। প্রায় সব কিছুতেই ও আমার ওপরে হলে, আমি খুশি হই।
দুই মা-কে আমাদের কিসের পরোয়া? তবে এও ঠিক পেটার যদি, ইস, শুধু একটু মুখ ফুটে বলত।
তোমার আশা।
.
বুধবার, ২৯ মার্চ, ১৯৪৪
আদরের কিটি, লণ্ডন থেকে ওলন্দাজ সংবাদ পরিক্রমায় একজন এমপি বলকেস্টাইন কথা প্রসঙ্গে বললেন, যুদ্ধের পর সমস্ত ডায়রি আর চিঠির একটা সংগ্রহ হওয়া উচিত। তার ফলে তক্ষুণি ওরা সবাই আমার ডায়রির জন্যে আমাকে হেঁকে ধরল। একবার ভেবে দেখ ‘গুপ্ত মহল’ নিয়ে রোমাঞ্চকাহিনী যদি ছাপাই কী মজাদার ব্যাপার হবে। বইয়ের নাম (এই ডায়রির গোড়ার নামকরণ ছিল ‘হেট আখৃটেয়ারহুইস’; ইংরেজিতে এর কোন সঠিক প্রতিশব্দ নেই। সবচেয়ে কাছাকাছি হল ‘দি সিক্রেট অফ আনেক্স’–গুপ্ত মহল) দেখেই লোকে ধরে নেবে এটা একটা গোয়েন্দা-গল্প।
কিন্তু, ঠাট্টা নয়, যুদ্ধের দশ বছর পর আমাদের ইহুদিদের যদি বলতে হয় আমরা এখানে কী ভাবে থেকেছি, কী খেয়েছি, কী নিয়ে কথাবার্তা বলেছি, তাহলে তখন, সেসব হাস্যকর শোনাবে। তোমাকে আমি অনেক কিছুই বলি বটে, তবু যত যাই হোক, তুমি আমাদের। জীবনের কণামাত্র জানো।
হাওয়াই হামলার সময় মহিলারা যে কী ভয় পেতেন। যেমন, রবিবারে যা হল; ৩৫০টা ব্রিটিশ প্লেন এসে ঈমুইডেনের ওপর পাঁচ লক্ষ কিলো ওজনের বোমা ফেলে গেল; বাড়িগুলো তখন একগুচ্ছ তৃণের মতো তির তির করে কাঁপছিল; কে জানে কত মহামারীর প্রাদুর্ভাব ঘটেছে এখন। তুমি এ সবের কোনোই খবর রাখো না। তোমাকে সবকিছু সবিস্তারে জানাতে হলে আমাকে এখন সারাটা দিন বসে, লিখে যেতে হবে। তবিতরকারি আর অন্য যাবতীয় জিনিসের জন্যে লোকজনদের লাইনে গিয়ে দাঁড়াতে হচ্ছে, ডাক্তাররা রুগী দেখতে যেতে পারছে না, কারণ রাস্তায় রেখে যেই পেছন ফিরবে সঙ্গে সঙ্গে গাড়ি হাওয়া হয়ে যাবে; চুরি চামারি এত বেড়ে গেছে যে, তুমি অবাক হয়ে ভাববে, ওলন্দাজদের ঘাড়ে কী এমন ভূত চাপল যে, রাতারাতি তারা চোর হয়ে গেল। পুঁচকে পুঁচকে ছেলে, বয়স কারো আট–কারো এগারো, লোকজনদের বাড়িঘরের জানালা ভেঙে ঢুকে যা পাচ্ছে তাই হাতিয়ে নিয়ে চলে যাচ্ছে। পাঁচ মিনিট কেউ বাড়ি ছেড়ে যেতে পারে না; তুমি গেলে তোমার জিনিসপত্রও চলে যাবে। খোয়া যাওয়া জিনিসপত্র, টাইপরাইটার, পারসোর গালচে, ইলেকট্রিক ঘড়ি ইত্যাদি ফেরত পেলে পুরস্কার দেওয়া হবে–এই মর্মে রোজ কাগজে বিজ্ঞপ্তি বেরোচ্ছে। রাস্তার ইলেকট্রিক ঘড়িগুলো লোপাট, পাবলিক টেলিফোনগুলো টান মেরে তারসুদ্ধ তুলে নিয়ে গেছে। লোকজনদের মনোবল ভালো থাকা সম্ভব নয়–সাপ্তাহিক যা রেশন, তাতে কফির অনুকল্প ছাড়া আর কিছুই দুদিনের বেশি যায় না। সৈন্য নামানোর ব্যাপার তো সেই কবে থেকে শুনে আসছি; এদিকে লোকজনদের জার্মানিতে ঠেলে পাঠানো হচ্ছে। ছেলেপুলেরা হয় অসুখে পড়ছে, নয় পুষ্টিহীনতায় ভুগছে; প্রত্যেকেরই জামাকাপড় আর জুতোর জীর্ণ দশা। কালোবাজারে জুতোর একটা নতুন সোলের দাম সাড়ে সাত ফ্লোরিন; তার ওপর, মুচিরা কেউ জুতো সারাইয়ের কাজ হাতে নেবে না আর যদি নেয়ও, মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হবে তার মধ্যে অনেক সময় জুতো জোড়াই গায়েব হয়ে যাবে।
