তোমার আনা।
.
সোমবার, ২৭ মার্চ, ১৯৪৪
আদরের কিটি,
আমাদের লুকিয়ে থাকার ইতিহাসের বেশ একটা বড় অধ্যায় বস্তুত রাজনীতির প্রসঙ্গ নিয়ে হওয়া উচিত; কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে রাজনীতির প্রতি আমার তেমন টান না থাকায়, আমি তার মধ্যে যাইনি। সুতরাং আজ আমি একটিবারের জন্যে আমার পুরো চিঠিটাই রাজনীতি দিয়ে ভরে দেব। এই বিষয়টা নিয়ে যে নানা মুনির নানা মত, তা না বললেও চলে; এ রকম সংকটপূর্ণ সময়ে এটা আলোচনার এমন কি একটা মুখরোচক বিষয় হওয়াও খুবই যুক্তিসঙ্গত; কিন্তু এ নিয়ে এত রকমের ঝগড়াঝাটি থাকাটা স্রেফ বোকামি। ওরা অন্ধকারে ঢিল ছুঁড়ুক, হাসাহাসি করুক, গালাগালি দিক এবং গজগজ করুক; যতক্ষণ নিজের ল্যাজ নিজে পোড়াচ্ছে এবং ঝগড়া করছে না, ততক্ষণ তারা যা খুশি তাই করুক–কেননা সাধারণত পরিণতিগুলো হয় অপ্রীতিকর।
বাইরে থেকে লোকে এমন অনেক খবর নিয়ে আসে যা সত্যি নয়। অবশ্য আজ পর্যন্ত আমাদের রেডিও সেট কখনও মিথ্যে কথা বলেনি। হেংক, মিপ, কুপহুইস, এলি আর ক্রালার–এরা সবাই তাদের রাজনৈতিক মনমেজাজের চড়া-মন্দার পরিচয় দিয়েছে; সবচেয়ে কম হেংক।
‘গুপ্ত মহলে’র রাজনৈতিক সাড়া সবসময়ই প্রায় এক। উপকূলে সৈন্য নামানো, হাওয়াই হামলা, নেতাদের বক্তৃতা ইত্যাদি নিয়ে যখন কথার ঝড় ওঠে, সমানে তখন ‘অসম্ভব, ‘অসম্ভব’ বলে কত যে চিৎকার হয় তার ঠিক থাকে না; কিংবা শোনা যায় ‘ঈশ্বরের ইচ্ছায়, ওরা যদি এখন শুরু করে, তবে আরও কতদিন ধরে চলবে? ‘চলছে দারুণ, একের নম্বর, বহুৎ খুব।’ আশাবাদী আর নৈরাশ্যবাদী এবং সবার ওপরে সেই সব বাস্তববাদী, যারা অক্লান্ত উৎসাহে নিজেদের মতামত দিয়ে যায় এবং অন্যসব কিছুর মতোই, এ ব্যাপারেও তারা প্রত্যেকে নিজেকে অভ্রান্ত মনে করে। ব্রিটিশের ওপর অচলা ভক্তি দেখে ভদ্রমহিলাদের কেউ তার কর্তার ওপর বেজার হন এবং ভদ্রলোকদের কেউ নিজের প্রিয় স্বজাতি সম্পর্কে কটুকাটব্য করার দরুন তার ঘরনীকে ঠোকেন।
এ ব্যাপারে ওদের উৎসাহে যেন কখনও ভাটা পড়তে দেখা যায় না। আমি একটা জিনিস আবিষ্কার করেছি–ফল প্রচণ্ড; কারো গায়ে পিন ফোঁটালে যেমন আশা করা যায় তড়াক করে লাফাবে, এও ঠিক তাই। আমার কায়দা হল এই–মুখপাত করো রাজনীতি দিয়ে। একটি প্রশ্ন, একটি কথা, একটি বাক্য ব্যস্, সঙ্গে সঙ্গে বোমা ফাটবে।
যেন জার্মান ভেমাখটু-এর সংবাদ বুলেটিন আর ইংরেজদের বি.বি.সি.-ও যথেষ্ট নয়, তার ওপর এমন ওঁরা জুটিয়েছেন বিশেষ হাওয়াই হামলার ঘোষণা। এক কথায়, রাজসিক; কিন্তু অন্য দিক থেকে আবার হতাশাব্যঞ্জকও বটে। ব্রিটিশ এখন জার্মানদের মিথ্যের কারবারের মতন সমান উৎসাহে হাওয়াই হামলাকে একটা বিরতিহীন কাজ-কারবারে পরিণত করেছে। সুতরাং রাত পোহাতেই রেডিও শুরু হয়ে যায় এবং সারাদিন ধরে শুনতে শুনতে শেষ হয় রাত নটা, দশটা এবং প্রায়ই এগারোটা নাগাদ।
বড়দের বলিহারি ধৈর্য; কিন্তু সেই সঙ্গে এটাও বোঝায় যে, তাদের মস্তিষ্কের ধারণ ক্ষমতা বেশ কম; এর ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে–আমি কারো আঁতে ঘা দিতে চাই না। দিনে একটা কি দুটো সংবাদ বুলেটিনই যথেষ্ট। কিন্তু বোকা বাড়িগুলো, থুড়ি–আমার যা বলার ছিল বলে দিয়েছি।
আরাইটার-প্রোগ্রাম, রেডিও ‘ওরান্জে’, ফ্রাঙ্ক ফিলিপস্ কিংবা মহামান্য রানী ভিলহেলমিনা–প্রত্যেকে পালা করে আসে এবং তাদের কথা বরাবর একাগ্রচিত্তে শোনা হয়। যে সময়টা বা ঘুমোনো থাকে না, ওরা সারাক্ষণ রেডিওর চারপাশে গোল হয়ে বসে খাওয়া, ঘুমোনো আর রাজনীতি নিয়ে বকর বকর করে।
ইস! এত বিরক্তিকর লাগে। এর মধ্যে পড়ে ম্যাদামারা হওয়ার হাত থেকে নিজেকে বাঁচানোই শক্ত হয়। রাজনীতি মা-বাবাদের এর চেয়ে বেশি কী আর ক্ষতি করবে।
আমি এখানে একটি উজ্জ্বল ব্যতিক্রমের কথা উল্লেখ করব–আমাদের সবার প্রিয় উইনস্টন চার্চিলের বক্তৃতার সত্যি জবাব নেই।
রবিবার রাত নটা। টেবিলে রাখা টি-পটের গায়ে ঢাকা, অতিথিরা ঢুকছে। বাঁয়ে রেডিওর ঠিক পাশে ডুসেল। রেডিওর সামনাসামনি ফান ডান, তাঁর পাশে পেটার। মিস্টার ফান ডানের পাশে মা-মণি, পেছনে মিসেস ফান ডান। পিম বসেছেন টেবিলে, তার পাশে মারগট আর আমি। আমাদের বসার ধরনটা দেখছি আমি খুব পরিষ্কার ভাবে ফোঁটাতে পারিনি। ভদ্রলোকেরা পাইপের ধোয়া ছাড়ছেন, কষ্ট করে শোনবার চেষ্টা করতে গিয়ে পেটারের চোখ দুটো ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চাইছে। মা-মণির পরনে গাঢ় রঙের একটা লম্বা ঢিলেঢালা পিরান। মিসেস ফান ডান প্লেনের শব্দে কাঁপছেন; বক্তার তোয়াক্কা না করে প্লেনগুলো এসেনের দিকে পরমানন্দে ছুটে চলেছে। বাপি চায়ে চুমুক দিচ্ছেন। মারগট আর আমি, আমরা দু-বোন একঠাই হয়ে বসে; আমাদের দুজনেরই কোল জুড়ে মুশ্চি ঘুমোচ্ছে। মারগটের মাথায় চুল-কোঁকড়ানোর কল আঁটা; আমি যে রাত্রিবাস পরে আছি সেটা যেমনি ছোট, তেমনি আঁটো এবং তেমনি খাটো।
সব মিলিয়ে বরাবরের মতোই খুব ঘনিষ্ঠতার, আরামের আর শান্তির ছবি; এ সত্বেও পরিণামের কথা ভেবে আমি বিভীষিকা দেখছি। বক্তৃতা শেষ হওয়া পর্যন্ত তারা, আর অপেক্ষা করতে পারছে না, মেঝের ওপর পা টুকছে; কতক্ষণে তারা গজালি করতে থাকবে, সেই চিন্তাতেই তারা অধীর। তর্কের বিষয়গুলো যতক্ষণ না তাদের বিসম্বাদে আর ঝগড়ায় টেনে নিয়ে যায়, ততক্ষণ তারা ব্যাজর-ব্যাজর করে এ-ওকে সমানে তাতাতে থাকবে।
