পেটার যখন হাসে, যখন সামনের দিকে তাকায় ওকে এত ভালো দেখায়। ছেলেটা এত মিষ্টি, এত ভালো। আমার মনে হয়, আমার ব্যাপারে যেটা ওকে সবচেয়ে অবাক করেছিল, সেটা হল–যখন ও দেখল, বাইরে থেকে আনাকে যতটা হালকা, ঘোর সাংসারিক বলে মনে হয় আসলে তো তা নয়; আনা বরং পেটারের মতোই স্বপ্ন-দেখা লোক এবং তারও আছে হাজার সমস্যা।
তোমার আনা।
.
আমার উত্তর
আদরের মারগট,
আমার মনে হয়, এখন আমাদের পক্ষে সবচেয়ে ভালো কাজ হল–কী হয়, অপেক্ষা করে দেখা। আগের মতো চলবে, না আমরা অন্য রকম হব–সে বিষয়ে পেটার আর আমার নিশ্চিত সিদ্ধান্তে আসতে খুব দেরি হবে না। কী পরিণতি হবে আমি নিজেই জানি না; যা নাকের সামনে, তার বাইরে চেয়ে দেখার ব্যাপারে আমি মাথা ঘামাই না। তবে আমি নিশ্চয়ই একটা জিনিস করব–পেটার আর আমি যদি বন্ধু হব সাব্যস্ত করি, তাহলে ওকে বলব তুই ওরও খুব অনুরক্ত; আর যদি প্রয়োজন হয় তাহলে তুই ওকে সাহায্য করতে সব সময়েই রাজী। শেষেরটা তোর অভিপ্রেত না হতে পারে কিন্তু এখন আমি সেটা গ্রাহ্য করছি না; তোর সম্পর্কে পেটারের মনোভাব কী আমি জানি না; তবে সেটা তখন ওকে আমি জিজ্ঞেস করে নেব।
খারাপ নয়, এ বিষয়ে আমি নিশ্চিন্ত–বরং উল্টোটা। আমরা ছাদের ঘরে বা যেখানেই থাকি, সবসময় তুই আমাদের স্বাগত জানবি। সত্যি বলছি, তুই এলে আমাদের কোনো ব্যাঘাত হবে না। কেননা আমাদের মধ্যে একটা মৌন বোঝাঁপড়া আছে যে, সন্ধ্যেটা অন্ধকার থাকলে তবেই আমরা কথাবার্তা বলব।
মনোবল বজায় রেখো। যেমন আমি রাখি। অবশ্য সব সময় সেটা সহজ নয়। তুমি যা ভাবছ তার আগেই হয়ত তোমার কপাল খুলে যাবে।
তোমার আনা।
.
বৃহস্পতিবার, ২৩ মার্চ, ১৯৪৪
আদরের কিটি,
সব জিনিস কমবেশি আবার এখন স্বাভাবিক। যারা আমাদের কুপন যোগাত, ভাগ্য ভালো, আবার তারা জেলের বাইরে এসেছে।
মিপ কাল ফিরেছেন। এলি অনেক ভালো, তবে কাশি এখনও যায়নি। কুপহুইসকে এখনও বেশ কিছুদিন বাড়িতে থাকতে হবে।
কাল কাছাকাছি একটা জায়গায় প্লেন ভেঙে পড়েছে; ভেতরে যারা ছিল প্যারাসুট নিয়ে সময়মত লাফিয়ে পড়তে পেরেছে। বিমানযন্ত্রটা একটা ইস্কুলবাড়ির ওপর ভেঙে পড়ে, কিন্তু সে সময়ে ইস্কুলে বাচ্চারা ছিল না। এর ফলে, ছোটখাটো অগ্নিকাণ্ড হয় এবং তাতে দুজন লোক পুড়ে মরে। বৈমানিকরা নেমে আসবার সময় জার্মানরা সাংঘাতিকভাবে গুলিগোলা ছোড়ে। আমস্টার্ডামের যে সব লোক এটা দেখে, তারা ওদের এই কাপুরুষোচিত আচরণ দেখে রাগে আর বিরক্তিতে প্রায় ফেটে পড়ে। আমরা–আমি মেয়েদের কথা বলছি–আঁতকে উঠেছিলাম, গুলিগোলা আমার দুচক্ষের বিষ।
বেলাশেষে খাওয়ার পর আজকাল প্রায়ই আমি ওপরে যাই; গায়ে লাগাই ফুরফুরে সান্ধ্য হাওয়া। পেটারের পাশে একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে বসে থাকতে বেশ লাগে। আমি ওর ঘরে চলে গেলে ফান ডান আর ডুসেল খুব ক্ষীণ কণ্ঠে টিপ্পনি কাটেন; ওঁরা নাম দেন ‘আনার দোসরা মোকাম অথবা বলেন, ভদ্রঘরের ছেলেদের কি আধো-অন্ধকার ঘরে কমবয়সী মেয়েদের বসতে বলা উচিত?’ এই ধরনের তথাকথিত সরস আক্রমণের জবাবে পেটার অসাধারণ বাকপটুত্ব দেখায়। সেদিক থেকে মা-মণিও কিছুটা ছোঁকছোঁক করেন। পারলে জিজ্ঞেসই করে বসেন আমরা নিজেদের মধ্যে কী বলাবলি করি–পারেন না, কেননা মনে মনে ভয় পান পাছে থোতা মুখ ভোতা হয়। পেটার বলে, এটা বড়দের নিছক হিংসের ব্যাপার। কেননা আমাদের বয়স কম এবং ওদের গাত্রদাহ আমরা বিশেষ কেয়ার করি না। মাঝে মাঝে পেটার নিচে এসে আমাকে নিয়ে যায় এবং সমস্ত রকম সাবধানতা সত্ত্বেও লজ্জায় লাল হয়ে ওঠে, তার মুখ দিয়ে কথা সরে না। ভাগ্যিস, আমি লজ্জায় লাল হই না, ওটা নিশ্চয় একটা খুব বিচ্ছিরি অনুভূতি। বাপি সব সময় যে বলেন আমি শুচিবায়ুগ্রস্ত এবং অভিমানী, সেটা কিন্তু ঠিক নয়। আমি শুধুই অভিমানী। আমাকে কেউ বড় একটা বলেনি যে, আমাকে দেখতে ভালো। কেবল ইস্কুলে একটি ছেলে আমাকে বলেছিল হাসলে আমাকে সুন্দর দেখায়। কাল পেটারের কাছ থেকে একটা অকৃত্রিম প্রশংসা পেয়েছি। শুধু মজা করার জন্যে বলব মোটামুটিভাবে আমাদের কি রকম কী কথা হয়েছিল
পেটার আমাকে প্রায় দেখলেই বলে, ‘আনা, একটু হাসো।’ ব্যাপারটা অদ্ভুত ঠেকায় ওকে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘কেন বলো তো, সব সময় আমি হাসব?’
কারণ, আমার ভালো লাগে; হাসলে তোমার গালে টোল পড়ে; কেমন করে হয় বল
‘ওটা আমার জন্ম থেকে। আমার চিবুকেও একটা আছে। এটাই আমার একমাত্র সৌন্দর্য।’
‘মোটেই না, ওটা সত্যি নয়।’
‘হ্যাঁ, বলছি শোন। আমি ভালভাবেই জানি আমি সুন্দরী নই; কখনও ছিলাম না, কখনও হবোও না।
‘আমি মানছি না। আমি মনে করি তুমি সুন্দরী।
‘সেটা সত্যি নয়।’
‘আমি যদি বলি, তাহলে নিশ্চিতভাবে ধরে নিতে পার, সেটা তাই।‘
তখন স্বভাবতই আমি তার সম্পর্কেও একই কথা বললাম।
এই হঠাৎ বন্ধুত্ব নিয়ে চারদিক থেকে নানা কথা আমার কানে আসছে। ওদের মন্তব্যগুলো এত ফিকে যে, মা-বাবাদের এইসব বকবকানি আমরা তেমন গায়ে মাখি না। মা-বাবার দল দুটো কি নিজেদের যৌবনের কথা ভুলে গিয়েছে? মনে তো হয় তাই; অন্তত দেখতে পাই, আমরা হাসিঠাট্টা করলে ওঁরা মুখ গম্ভীর করেন আর আমরা গুরুগম্ভীর কিছু বললে ওঁরা হেসে উড়িয়ে দেন।
