আমার মনে হয় বদলেছে; তার মানে অবশ্যই এ নয় যে, আমরা হলায়-গলায় বন্ধ হয়ে উঠব, যদিও আমার দিক থেকে তাতে এখানে দিনগুলো ঢের সহনীয় হবে। কিন্তু তবু ও নিয়ে নিজেকে আমি বিচলিত হতে দেব না–ওর সঙ্গে আমার ঘন ঘন দেখা হয় এবং আমার অসম্ভব কষ্ট হয়, শুধু সেই কারণেই এ নিয়ে, কিটি, তোমার মন খারাপ করাতে আমি চাই না।’
শনিবার দুপুরের পর গুচ্ছের খারাপ খবর শুনে এমন আনচান লাগছিল যে, আমি গিয়ে। সটান শুয়ে পড়েছিলাম। শুধু মনটাকেও ফাঁকা করে দেবার জন্যে আমি চাইছিলাম ঘুমিয়ে পড়তে। চারটে অবধি ঘুমিয়ে তারপর বসবার ঘরে যেতে হল। মা-মণি এত কিছু জিজ্ঞেস করছেন যার উত্তর দেওয়া শক্ত, বাপির কাছে আমার লম্বা ঘুমের ব্যাখ্যা হিসেবে আমাকে একটা অজুহাত খাড়া করতে হল। আমি কারণ দেখালাম মাথাব্যথা; কথাটা মিথ্যে নয়, যেহেতু ব্যথা ছিল…তবে সেটা ভেতরকার।
সাধারণ লোকে, সাধারণ মেয়েরা, আমার মতো কুড়ির নিচে যাদের বয়স, তারা ভাববে আত্ম-দুঃখকাতরতায় আমি খানিকটা ভেঙে পড়েছি। হ্যাঁ, সেটা ঘটেছে, কিন্তু আমার হৃদয় মেলে ধরব আমি তোমার কাছে; দিনের বাদবাকি সময়টাতে আমি যথাসম্ভব চ্যাটা ফুর্তিবাজ এবং ডাকাবুকো হয়ে পড়ি–যাতে কেউ প্রশ্ন করতে বা পেছনে কাঠি দিতে না পারে।
মারগট মেয়েটা মিষ্টি, ও চায় আমি ওকে বিশ্বাস করি, কিন্তু তবু ওকে আমার সব কথা বলা সম্ভব নয়। সুন্দর ভালো মেয়ে সে, খুবই প্রিয়জন–কিন্তু গভীর আলোচনায় যেতে গেলে যে নিস্পৃহ ভাবের দরকার, সেটা তার নেই। মারগট আমার কথায় গুরুত্ব দেয়, যতটা দরকার তার চেয়েও বেশি; পরে অনেকক্ষণ ধরে সে তার অদ্ভুত ছোট বোনটির কথা ভাবে। আমার প্রত্যেকটি কথায় তন্ন তন্ন করে ও আমাকে দেখে আর ভাবতে থাকে, ‘এটা কি ওর নেহাত পরিহাস, না কি সত্যিই ওর মনের কথা?’ আমার ধারণা, এটা হয় আমরা সারাদিন একসঙ্গে থাকি বলে; কাউকে যদি আমি সম্পূর্ণভাবে বিশ্বাস করতাম, তাহলে আমি কখনই চাইতাম না তেমন লোক সর্বক্ষণ আমার সঙ্গে ঘুরঘুর করুক। কবে আমি শেষ পর্যন্ত আমার চিন্তার জট খুলে ফেলব, কবে নিজের মধ্যে আবার আমি শান্তি খুঁজে পাব?
তোমার আনা।
.
মঙ্গলবার, ১৪ মার্চ, ১৯৪৪
আদরের কিটি, আমরা আজ কী খাব সেটা শুনতে তোমার হয়ত মজা লাগবে, কিন্তু আমার আদৌ নয়। নিচের তলায় ঝি এসে ঘর ঝাট দিচ্ছে। এই মুহূর্তে আমি বসে আছি ফান ডানদের টেবিলে। একটা রুমালে ভালো সেন্ট (এখানে আসার আগে কেনা) ঢেলে নিয়ে মুখের ওপর দিয়ে নাকের কাছে ধরে রেখেছি। এ থেকে তুমি বিশেষ কিছু অনুধাবন করতে পারবে না। সুতরাং ‘গোড়া থেকে শুরু করা যাক’।
যেসব লোকের কাছ থেকে আমরা খাবার জিনিসের কুপন সংগ্রহ করতাম, তারা ধরা পড়ে গেছে। এখন আমাদের হাতে আছে মাত্র পাঁচটি রেশন কার্ড; বাড়তি কোনো কুপন নেই, চর্বি নেই। মিপ আর কুপহুইস দুজনেই অসুস্থ; এলির বাজার করবার মতো সময় নেই। ফলে খুব বিষন্ন, মন-মরা আবহাওয়া; খাবারও দ্রুপ। কাল থেকে চর্বি, মাখন বা মারগারিন এক ছিটেও থাকবে না। প্রাতরাশে আলুভাজা (রুটি বাচাতে) আর জুটবে না, তার বদলে খেতে হবে ডালিয়া; যেহেতু মিসেস ফান ডানের ধারণা আমরা না খেয়ে আছি, সেইজন্যে লুকিয়ে-চুরিয়ে কিনে আনা হয়েছে মাখন-না-তোলা দুধ। পিপের মধ্যে সংরক্ষিত বাধাকপি কুচনো–এই হল আজ আমাদের রাতের খাবার। আগে থেকে ঠেকানোর জন্যেই রুমালের প্রতিষেধক ব্যবস্থা। এক বছরের বাসী বাঁধাকপি যে কী গন্ধ ছাড়ে ভাবা যায় না। নষ্ট আলুবখরা, সংরক্ষণের কড়া ওষুধ আর পচা ডিম–এই সব মিলিয়ে মিশিয়ে ঘরের মধ্যে ভুরভুর কছে কটু গন্ধ। উহ, ঐ গন্ধওয়ালা জিনিসটা খেতে হবে ভাবলেই তো আমার পেট থেকে সবকিছু উঠে আসতে চাইছে। এর ওপর, আলুগুলোকে অদ্ভুত সব রোগে ধরেছে। দুই ঝুড়ির মধ্যে পুরো এক ঝুড়ি উনুনের আগুনে ফেলে দিতে হয়েছে। কোনটার কী রোগ হয়েছে দেখা, সেও হয়েছে একটা মজার ব্যাপার। শেষটায় দেখা গেল, ক্যানসার আর বসন্ত থেকে হাম পর্যন্ত, কিছু বাকি নেই। যুদ্ধের চতুর্থ বছরে অজ্ঞাতবাসে থাকা, না গো না, হাসির কথা নয়। এই জঘন্য ব্যাপারটা কেন যে শেষ হয় না।
সত্যি কথা বলতে গেলে, খাওয়ার ব্যাপারটা আমি কেয়ারই করতাম না। যদি অন্যান্য দিক দিয়ে এ জায়গাটা আরেকটু সুখকর হত। সেখানেই তো গণ্ডগোল; থোড়-বড়ি-খাড়া আর খাড়া-বড়ি-থোড় করে এইভাবে বেঁচে থাকার ফলে আমাদের সবাই মেজাজ ক্রমশ তিরিক্ষে হয়ে যাচ্ছে।
বর্তমান অবস্থায় পাঁচজন প্রাপ্তবয়স্কের মনোভাব এখন এই—
মিসেস ফান ডান–রান্নাঘরের রানী হওয়ার মোহ অনেকদিন আগেই কেটে গেছে। কাহাতক চুপচাপ বসে থাকা যায়। সুতরাং আবার আমি রান্নার কাজে ফিরে গিয়েছি। তবু বলে পারছি না যে, বিনা তেল-ঘিতে রান্না করা কিছুতেই সম্ভব নয়; আর এইসব জঘন্য গন্ধ নাকে গিয়ে আমার শরীর খারাপ করে। এত খাঁটি, কিন্তু তার বদলে আমার কপালে জোটে অকৃতজ্ঞতা আর কটু কথা। সবসময় আমিই এ বাড়ির কুলাঙ্গার, যত দোষ নন্দ ঘোষ। তাছাড়া আমার মতে, লড়াই খানিকটা যথা পূর্বং তথা পরং। তাও শেষমেষ জার্মানরাই জিতবে। আমার ভয় হচ্ছে, আমাদের না খেয়ে থাকতে হবে। যখন আমার মেজাজ খারাপ হয়, একধার থেকে সবাইকে আমি বকি।’
