চারপাশে বন্ধুর ভিড় অনেক পাতলা হয়ে আসবে আমি তা বিলক্ষণ জানি। কিন্তু তাতে কি আসে যায় যদি গুটিকয় সাচ্চা বন্ধু থাকে?
তবু সবকিছু সত্ত্বেও ১৯৪২ সালে মনে আমার ষোলআনা সুখ ছিল না; প্রায়ই নিজেকে পরিত্যক্ত বলে মনে হত; কিন্তু সারা দিনমান পায়ের ওপর থাকতে হত বলে ও নিয়ে বড় একটা ভাবতাম না এবং যতটা পারি হেসে খেলে কাটিয়ে দিতাম। যে শূন্যতা বোধ করতাম, রঙ্গরসিকতা দিয়ে আমি সজ্ঞানে বা অজ্ঞানে তা উড়িয়ে দেবার চেষ্টা করতাম। জীবন সম্পর্কে এবং আমাকে কী করতে হবে সে বিষয়ে এখন আমি গালে হাত দিয়ে ভাবি। আমার জীবনের একটি পর্ব বরাবরের মতো শেষ হয়ে গেছে। ইস্কুল-জীবনের গায়ে ফু দিয়ে বেড়ানো দিনগুলো বিদায় নিয়েছে, আর কখনই ফিরবে না।
এখন আর আমি মনে মনে তার জন্যে হতাশ হই না; আমি সে স্তর পেরিয়ে এসেছি; আমার গুরুতর দিকটা সর্বক্ষণ বজায় থাকে বলে শুধুমাত্র নিজের আমোদ-আহ্লাদ নিয়ে মজে থাকতে পারি না।
যেন একটা জোরালো আতস কাঁচ দিয়ে নববর্ষ পর্যন্ত আমি আমার জীবনটা দেখি। নিজেদের বাড়িতে হাসি আনন্দে ভরা দিন, তারপর ১৯৪২ সালে এখানে চলে আসা, হঠাৎ কোথা থেকে কোথায়, চুলোচুলি, মন কষাকষি। ব্যাপারটা আমার মাথায় ঢোকেনি, আমি কেমন যেন ‘থ’ হয়ে গিয়েছিলাম, নিজেকে কিছুটা খাড়া রাখার জন্যে ছ্যাটা হওয়াকেই একমাত্র পন্থা হিসেবে নিয়েছিলাম।
১৯৪৩-এর প্রথমার্ধ মাঝে মাঝে কান্নায় ভেঙে পড়া, নিঃসঙ্গতা, আস্তে আস্তে নিজের সমস্ত দোষত্রুটি আমার চোখে ধরা পড়তে লাগল; কোনাটাই ছোটখাটো নয়, তখন যেন। আরও বড় বলে মনে হল। দিনের বেলায় ইচ্ছাকৃতভাবে আমার ধারণাবহির্ভূত যাবতীয়। বিষয়ে আমি কথা বলতাম, চেষ্টা করতাম পিকে টানতে; কিন্তু পারতাম না। আমাকে একা ঘাড়ে নিতে হত নিজেকে বদলানোর কঠিন কাজ, ঠেকাতে হত নিত্যকার সেই সব গালমন্দ, যা বুকের ওপর জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসত; ফলে, হতাশার মধ্যে আমি একেবারে ডুবে গিয়েছিলাম।
বছরের শেষার্ধে অবস্থার সামান্য উন্নতি হল; আমি পরিণত হলাম তরুণীতে এবং আমাকে অনেক বেশি সাবালিকা বলে ধরে নেওয়া হল। আমি চিন্তা করতে এবং গল্প লিখতে শুরু করে দিলাম; ক্রমশ এই সিদ্ধান্তে পৌঁছুলাম যে, আমাকে বরাবরের বলের মত যথেচ্ছ ছোড়ার অধিকার আর অন্যদের নেই। আমি আমার আকাঙক্ষা অনুযায়ী নিজেকে বদলাতে চাইলাম। যখন এটা বুঝলাম যে, এমন কি বাপির কাছেও আমার মনের সব কথা খুলে বলা যাবে না। তখন সেই একটা জিনিসে আমার খুব খারাপ লেগেছিল। এরপর নিজেকে ছাড়া। আর কাউকে আমি বিশ্বাস করতে চাইনি।
নববর্ষের সূচনায় দ্বিতীয় বড় রকমের বদল, আমার স্বপ্ন…। এবং সেই সঙ্গে ধরা পড়ল আমার তীব্র বাসনা, কোনো মেয়েবন্ধুর জন্যে নয়, ছেলেবন্ধুর জন্যে। আমি আবিষ্কার করলাম আমার অন্তর্নিহিত সুখ আর সেইসঙ্গে বাহার চালি দিয়ে গড়া আমার আত্মরক্ষার বর্ম। যথাসময়ে আমার অস্থিরতার অবসান হল এবং যা কিছু সুন্দর, যা কিছু শুভ–তার জন্যে আমার সীমাহীন কামনা আমি অবিষ্কার করলাম।
আর সন্ধ্যে হলে বিছানায় শুয়ে শুয়ে এই বলে আমি যখন আমার প্রার্থনা শেষ করি, ‘যা কিছু ভালো, যা কিছু প্রিয়, যা কিছু সুন্দর–সেই সবকিছুর জন্যে, হে ঈশ্বর, আমার কৃতজ্ঞতা জেনো’, তখন আমি আনন্দে ভরে উঠি। তারপর অজ্ঞাতবাসে যাওয়ার ‘সুফল’, আমার শরীর স্বাস্থ্য নিয়ে ভাবতে বসি, আমার সমস্ত সত্ত্বা দিয়ে ভাবি পেটারের ‘মধুরতার কথা; ভাবি সেই জিনিস–যা এখনও অপরিণত এবং ভাসা-ভাসা হয়ে আছে, দুজনের কেউই যাকে সাহস করে আমরা ধরতে ছুঁতে পারি না, যা কোনো একদিন আসবে; প্রেম, ভবিষ্যৎ, সুখশান্তি আর ভূলোকস্থিত সৌন্দর্যের কথা; ভূলোক, নিসর্গ, সৌন্দর্য আর যা অপরূপ, যা রমণীয়, সব কিছু।
যাবতীয় দুঃখ কষ্ট কিছুই তখন আমার মনে স্থান পায় না; বরং আজও যে সৌন্দর্য রয়ে গেছে তাই নিয়ে আমি ভাবি। যে-সব বিষয়ে মা-মণির সঙ্গে আমার সম্পূর্ণ অমিল, এটা হল তার একটি। কেউ বিমর্ষ বোধ করলে মা-মনি তাকে উপদেশ দেন–’দুনিয়ার যাবতীয় দুঃখকষ্টের কথা মনে করো এবং তোমাকে যে তার ভাগ নিতে হচ্ছে না তার জন্যে ধন্যবাদ দাও।’ আমার উপদেশ—‘বাইরে বেরোও, মাঠে যাও, উপভোগ করো প্রকৃতি আর রোদ্দুর, ঘরের বাইরে গিয়ে আবার ফিরিয়ে আনো যে সুখ তোমার আপনাতে আর ঈশ্বরে। নিজের চারপাশে যতটা সৌন্দর্য এখনও আছে তার চিন্তা করো। তুমি সুখী হও।’
মা-মণির ধারণা ঠিক বলে আমার মনে হয় না, কারণ নিজে দুর্দশায় পড়লে সেক্ষেত্রে তোমার কী আচরণ হবে? তখন তো তুমি একেবারেই ডুবেছ। অন্যদিকে, আমি দেখেছি নিসর্গে, রোদের আলোয়, স্বাধীনতায়, নিজের সবসময় কিছু সৌন্দর্য থেকেই যায়; এসব তোমার সহায়সম্বল হতে পারে। চোখ চেয়ে এইসব দেখ, তাহলেই তুমি আবার খুঁজে পাবে তোমার আপনাকে, আর ঈশ্বরকে এবং তখন তুমি আবার ফিরে পাবে তোমার মানসিক স্থৈর্য।
যে নিজে সুখী, সে অন্যদেরও সুখী করবে। যার সাহস আর বিশ্বাস আছে সে কখনও দুঃখকষ্টে মারা পড়বে না।
তোমার আনা।
.
রবিবার, ১২ মার্চ, ১৯৪৪
আদরের কিটি,
ইদানীং যেন স্থির হয়ে বসতে পারছি না। তড়বড় করে সিঁড়ি ভেঙে কেবল উঠছি আর নামছি। পেটারের সঙ্গে কথা বলতে খুব ভাল লাগে, তবে ওকে পাছে জ্বালাতন করি আমার সারাক্ষণ সেই ভয়। ওর মা-বাবা আর ওর নিজের সম্বন্ধে পুরনো কথা একটুখানি বলেছে। পুরো অর্ধেকও নয়; বুঝতে পারি না কেন সব সময় আরও কথা শোনবার জন্যে আমি মরে যাই। আগে ও আমাকে অসহ্য বলে মনে করত; ওর সম্বন্ধে আমিও ওকে একই কথা বলেছিলাম। এখন আমি আমার মত বদলেছি; পেটারও কি বদলেছে তার মত?
