মিস্টার ফান ডান–ধোয়া টেনে যাব, ধোয়া টেনে যাব, ধোয়া টেনে যাব, তারপর খাওয়া, রাজনৈতিক হালচাল, আর কেলির মেজাজটা তত খারপ নয়। কের্লি বড় আদরের বউ।
কিন্তু ধুমপানের জিনিস কিছু না জুটলে, তখন সবই বেঠিক, এবং তখন শোনা যাবে ‘আমি দিন দিন কাহিল হয়ে পড়ছি, আমরা তেমন ভালোভাবে থাকতে পারছি না। মাংস ছাড়া আমার চলবে না। আমার স্ত্রী কেলি আহাম্মকের একশেষ।’ এরপর শুরু হয়ে যাবে দুজনের তুমুল ঝগড়া।
মিসেস ফ্রাঙ্ক খাওয়াটা অতি জরুরি নয়, যার প্রচণ্ড ক্ষিধে পেয়েছে, এই সময় এক টুকরো বাইরের রুটি পেলে খাসা হয়। আমি ফান ডানের বউ হলে ওর ঐ সারাক্ষণ ভস্ ভস্ করে ধোয়া বের করা অনেককাল আগেই বন্ধ করে দিতাম। নিজেকে একটু চাঙ্গা করার জন্যে আমার কিন্তু এখন একটা সিগারেট বিশেষ দরকার। ইংরেজরা দাগাগুচ্ছের ভুল করা সত্ত্বেও লড়াই এগোচ্ছে। আমার দরকার, বসে একটু কথাবার্তা বলা; আমি যে পোল্যাণ্ডে নেই, তার জন্যে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ।
মিস্টার ফ্রাঙ্ক–’সব ঠিক আছে। আমার কিছু চাই না। ঘাবড়ানোর কোন কারণ নেই; আমাদের হাতে যথেষ্ট সময়। আমার ভাগের আলু পেলেই আমার মুখ বন্ধ হবে। আমার রেশন থেকে কিছুটা এলির জন্যে সরিয়ে রাখো। রাজনৈতিক অবস্থা খুবই সম্ভাবনাময়। আমি হলাম একান্তভাবে আশাবাদী!
মিস্টার ডুসেল–আমাকে আজকের কাজ হাতে নিতে হবে, সব কাজ ঘড়ি ধরে শেষ করতে হবে। রাজনৈতিক অবস্থার দরুন, আমাদের ধরা পড়া অসম্ভব।
‘আমি, আমি, আমি…!
তোমার আনা।
বুধবার, ১৫ মার্চ, ১৯৪৪
আদরের কিটি,
বাপ রে বাপ, বুক-চাপা দৃশ্যগুলো থেকে মুহূর্তের জন্যে ছাড়ান পেয়েছি। আজ শুধু কানে এসেছে–এই ঐ যদি ঘটে, তাহলে আমাদের মুশকিলে পড়তে হবে…যদি ইনি বা উনি অসুখে পড়েন, তাহলে আমরা একদম একা পড়ে যাব; এবং তখন যদি…।’ সংক্ষেপে এই। বাকি কথাগুলো কী আশা করি তুমি জানো–অন্তত এটা আমি ধরে নিতে পারি, গুপ্ত মহলবাসীদের এতদিনে তুমি এত ভালোভাবে জেনেছ যে, তাদের কথাবার্তার ধারাটা তুমি আঁচ করে নিতে পারবে।
এক যদি–যদির কারণ হল, মিস্টার ক্রালারকে মাটি খোড়ার জন্যে তলব করা হয়েছে। এলির প্রচণ্ড সর্দি, কাল বোধ হয় এলিকে বাড়িতেই থাকতে হবে। মি এখনও ফু থেকে সম্পূর্ণ সেরে ওঠেনি; কুপহুইসের পাকস্থলী থেকে এমন রক্তস্রাব হয় যে, উনি অজ্ঞান হয়ে যান। শুনে এত মন খারাপ লাগল।
মালখানায় যারা কাজ করে, কাল তাদের ছুটি; এলিকে আসতে হবে না। কাজেই কাল আর দরজার তালা খোলা হবে না; ইঁদুরের মতো নিঃশব্দে আমাদের চলাফেরা করতে হবে, যাতে পাড়াপড়শিরা না টের পায়। হেংক একটায় আসছেন পরিত্যক্ত মানুষগুলোকে দেখতে–তার যেন চিড়িয়াখানা-পালকের ভূমিকা। আজ বিকেলে কত যুগ পরে তিনি এই প্রথম আমাদের কিছুটা বাইরের দুনিয়ার কথা বললেন। আমরা আটটি প্রাণী যেভাবে তাকে ঘিরে ধরেছিলাম যদি তুমি দেখতে; ছবিতে যেরকম ঠানদিদি গল্প বলেন সেই রকম। কৃতজ্ঞ শ্রোতাদের কাছে অবশ্য তার ডজনে উনিশটাই ছিল খাবার-দাবারের কথা, এবং তারপর মিপের ডাক্তার, আর আমাদের সবরকম প্রশ্নের উত্তর। উনি বললেন, ডাক্তার? ডাক্তারের কথা আর বলবেন না। আজ সকালে ডাক্তারকে ফোন করতে ওঁর অ্যাসিস্টেন্ট এসে ধরলেন। ফুর জন্যে কী ওষুধ খাব জিজ্ঞেস করলাম। আমাকে বলা হল সকাল আটটা থেকে নটার মধ্যে গিয়ে আমি যেন ব্যবস্থাপত্র নিয়ে আসি। যদি একটু বাড়াবাড়ি রকমের ফু হয়, তাহলে ডাক্তার নিজে এসে ফোন ধরে বলেন, জিভ বের করুন তো, বলুন আ-আ-আ, ঠিক আছে। আমি শুনেই বুঝতে পারছি আপনার গলাটা টাটিয়ে উঠেছে। আমি ওষুধ লিখে দিচ্ছি দোকান থেকে আনিয়ে নেবেন। আচ্ছা, আসি। ব্যস, হয়ে গেল। মজার প্র্যাকটিস তো, টেলিফোনেই কাজ ফতে।
আমি কিন্তু ডাক্তারদের নিন্দেমন্দ করতে চাই না; যত যাই হোক, তার তো দুটোর বেশি হাত নেই এবং আজকের দিনে ডাক্তার কয়টা যে এত রুগীকে সামাল দেবে। তবু হেংক এর মুখে টেলিফোন-ভাষ্যের পুনরাবৃত্তি শুনে আমরা না হেসে পারিনি।
এখনকার দিনে ডাক্তারের বসার ঘরে ছবি আমি মনে মনে কল্পনা করে নিতে পারি। এখন আর কেউ তালিকাভুক্ত রুগিদের দিকে তাকায় না; যাদের ছোটখাটো অসুখ, তাদের দঙ্গলের দিকে তাকায় আর ভাবে–’ওহে, তুমি ওখানে কী করছ, দয়া করে পেছন গিয়ে দাঁড়াও; জরুরি কেসগুলো আগে দেখা হবে।’
তোমার আনা।
.
বৃহস্পতিবার, ১৬ মার্চ, ১৯৪৪
আদরের কিটি, আজকের আবহাওয়াটা কী সুন্দর, আমার বর্ণনার ভাষা নেই; ছাদের ঘরে আমি এলাম বলে।
পেটারের চেয়ে কেন আমি বেশি ছটফটে, এখন সেটা বুঝি। পেটারের নিজের ঘর আছে সেখানে কাজ করা, স্বপ্ন দেখা, ভাবনা-চিন্তা করা, ঘুমুনো–সবই সে করতে পারে। আমাকে ঝাটা খেয়ে একবার এ-কোণ একবার ও-কোণ করতে হয়। আমার ডবল-বেড় ঘরে আমি থাকি না বললেই হয়, অথচ থাকতে ভীষণ ইচ্ছে করে। সেই কারণেই আমি বার বার পালিয়ে চিলেকেঠোয় চলে যাই। সেখানে এবং তোমার কাছে, আমি কিছুক্ষণের জন্যে, খুবই কিছুক্ষণের জন্যে, নিজেকে ফিরে পাই। তবু আমি নিজেকে নিয়ে বুক চাপড়াতে চাই না, বরং উল্টো বুকের পাটা দেখাতে চাই। ভালো হয়েছে, অন্যেরা আমার মনের ভেতরে কী হয় বলতে পারে না। শুধু জানে, দিনকে দিন আমি মা-মণি সম্পর্কে নিস্পৃহ হয়ে পড়ছি, বাপির প্রতি আমার আর আগের মতো টান নেই এবং মারগটকে আমি কোনো কথাই আর বলি না। আমি এখন একেবারে চাপা। সবচেয়ে বড় কথা আমি আমার বাইরের গাম্ভীর্য বজায় রাখব, লোকে যাতে কিছুতেই না জানে যে, আমার মধ্যে নিরন্তর লড়াই চলেছে। কামনা-বাসনার সঙ্গে সহজ বাস্তববোধের লড়াই। পরেরটা এ যাবৎ জিতে এসেছে; তবু এই দুইয়ের মধ্যে আগেরটা কি কখন প্রবলতর হয়ে দেখা দেবে? দেখা দেবে বলে মাঝে মাঝে আমার ভয় হয় এবং কখনও কখনও আমি তারই জন্যে ব্যাকুল হই।
