পেটারের মুখ দেখে বলতে পারি ও সমানে আমারই মতন চিন্তা করে। মিসেস ফান ডান কাল সন্ধ্যেবেলায় যখন মুখ ঝামটা দিয়ে বললেন, ‘ভাবুক মশাইকে, দেখ।’ আমার খুব রাগ হয়েছিল। পেটারের মুখ লজ্জায় লাল হয়ে উঠেছিল। আমি আরেকটু হলেই যা-তা বলে ফেলতাম।
এই লোকগুলো মুখ বুজে থাকলেই তো পারে!
ও কী অসম্ভব একা, অথচ কিছু করবারও ওর ক্ষমতা নেই–দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এ জিনিস দেখা যে কী সাংঘাতিক, তুমি ধারণা করতে পারবে না। ওর জায়গায় নিজেকে রেখে আমি ওর অবস্থাটা আঁচ করতে পারি, ঝগড়ায় আর ভালবাসায় মাঝে মাঝে ওর যে কী অসহায় অবস্থা হয় আমি বেশ ঠাহর করতে পারি। বেচারা পেটার, ভালবাসা ওর একান্তভাবে দরকার।
যখন ও বলেছিল ওর কোনো বন্ধু চাই না, ওর কথাগুলো আমার কানে এত রূঢ় হয়ে বেজেছিল। ইস্, কী করে ও এমন ভুল বুঝল! ও যে জেনে বুঝে বলেছে আমার তা বিশ্বাস
পেটার ওর নিঃসঙ্গতা, ওর লোক-দেখানো উদাসিনতা আর ওর বয়স্ক হাবভাব আঁকড়ে থাকে; কিন্তু ওটা ওর অভিনয় ছাড়া কিছু নয়, যাতে ওর আসল ভাব প্রকাশ হয়ে না পড়ে। বেচারা পেটার, আর কতদিন সে তার এই ভূমিকা চালিয়ে যেতে পারবে? এই অতিমানবিক প্রয়াস পরিনামে নিশ্চয়ই এক প্রচণ্ড বিস্ফোরণ হয়ে দেখা দেবে?
ইস্, পেটার, শুধু যদি আমার সাধ্য থাকত তোমাকে সাহায্য করার, শুধু যদি আমাকে তুমি দিতে। আমরা দুজনে মিলে তাড়িয়ে দিতে পারতাম তোমার একাকিত্ব এবং আমারও!
আমার মনে অনেক কিছু হয়, কিন্তু বেশি বলি না। ওকে দেখতে পেলে আমার সুখ হয় এবং যখন কাছে থাকি তখন যদি আকাশে রোদ হাসে। কাল আমি দারুণ উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলাম; যখন আমি মাথা ঘষছি, তখন পেটার আমাদের ঠিক পাশের ঘরেই বসে রয়েছে আমি জানতাম। আমি নিজেকে ধরে রাখতে পারিনি; ভেতরে ভেতরে নিজেকে আমার যত শান্ত সৌম্য বলে বোধ হয়, বাইরে ততই আমার দাপাদাপি বাড়ে।
কে প্রথম দেখতে পাবে, কে ভেদ করবে এই বর্ম? ভাগ্যিস, ফান ভানদের মেয়ে নয় ছেলে–যদি আমার বিপরীত বর্গের কেউ কপালে জুটে না যেত, তাহলে আমায় এই পাওয়া কখনই এত কষ্টসাধ্য, এত সুন্দর, এত ভালো জিনিস হতে পারত না।
তোমার আনা।
পুনশ্চঃ তুমি জানো, তোমার কাছে আমি কিছু লুকাই না। সুতরাং তোমাকে আমার বলা দরকার, আবার কখন ওর দেখা পাব সেই আশায় আমি বেঁচে থাকি। পেটারও যে সারাক্ষণ আমার জন্যে অপেক্ষা করে আছে–এটা জানতে আমার খুব সাধ যায়। যদি ওর দিক থেকে কুষ্ঠিত হয়ে এগোনোর সামান্য ভাব চোখে পড়ে, তখুনি আমি রোমাঞ্চিত হই। আমার বিশ্বাস, আমারই মতন পেটারের মধ্যেও অনেক কথা হাঁকুপাঁকু করে; ওর অপটু ভাবটাই আকৃষ্ট করে, ও সেটা ছাই জানে।
তোমার আনা।
.
মঙ্গলবার, ৭ মার্চ, ১৯৪৪
আদরের কিটি, আমার ১৯৪২ সালের জীবনের কথা এখন ভাবলে সবটাই অলীক বলে মনে হয়। চার দেয়ালের মধ্যে জ্ঞানচক্ষু ফোঁটা এই আনা আর সেদিনকার সুখস্বর্গে থাকা আনা–এই দূয়ের মধ্যে বিস্তর ফারাক। সত্যি, সে ছিল এক স্বর্গীয় জীবন। যার মোড়ে মোড়ে ছেলে বন্ধু, যার। প্রায় জন-বিশেক সুহৃদ আর চেনাজানা সমবয়সী, যে প্রায় প্রত্যেক শিক্ষকেরই প্রিয় পাত্র, যে মা-মণি আর বাপির আদরে মাথা-খাওয়া মেয়ে, যার অফুরন্ত টফি-লজেঞ্চল, হাত খরচের পর্যাপ্ত টাকা তার আর কী চাই?
তুমি নিশ্চয় ভেবে অবাক হবে কিভাবে আমি এতগুলো লোককে পটিয়েছিলাম। পেটার বলে ‘আকর্ষণীয় শক্তি’–কথাটা ঠিক নয় আমার চোখা উত্তর, আমার সরস মন্তব্য, আমার হাসি-হাসি মুখ এবং আমার সপ্রশ্ন চাহনি সব শিক্ষকেরই মনে ধরত। থাকার মধ্যে আমার ছিল প্রচণ্ড ধিঙ্গিপনা, মক্ষীরানীমার্কা ভাব আর মজা করার ক্ষমতা। সুনজরে পড়ার কারণ ছিল এই যে, আমি দু-একটা ব্যাপারে আর সবাইকে টেক্কা দিতাম। আমি ছিলাম পরিশ্রমী, সৎ এবং অকপট। পরের দেখে নকল করার কথা আমি স্বপ্নেও ভাবতে পারতাম না। আমার টফি-লজেন্ধু আমি মুক্ত হস্তে একে ওকে দিতাম এবং আমার মধ্যে কোনো গুমর ছিল না।
সবাই মিলে এভাবে মাথায় তোলায় আমার কি পায়াভারী হওয়ার ভয় ছিল না? এটা ভালো হয়েছে যে,এই রমরমা যখন তুঙ্গে, ঠিক তখনই হঠাৎ আমাকে বাস্তবের মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়তে হল। বাহবা কুড়োবার দিন যে শেষ, এটা বুঝতেই অন্তত একটা বছর গড়িয়ে গেল।
ইস্কুলে আমি কেমন ছিলাম? লোকের চোখে আমি ছিলাম এমন একজন যার মাথা থেকে বেরোয় নিত্যনতুন রঙ্গরস, যে সব সময় গড়ের রাজা, কক্ষনো যার মেজাজ খারাপ হয় না, যে কখনই ছিচকাঁদুনে নয়। সুতরাং সবাই চাইত সাইকেলে রাস্তায় আমার সঙ্গী হতে এবং আমি তাদের মনোযোগ আকর্ষণ করতাম।
আজ যখন পেছনে চাই মনে হয় সেদিনের আনা আমুদে ছিল বটে, কিন্তু বড়ই হালকা স্বভাবের–আজকের আনার সঙ্গে তার কোনই মিল নেই। পেটার আমার সম্পর্কে ঠিক কথাই বলেছিল–’তোমাকে যখনই দেখেছি, দুটি কি তারও বেশি ছেলে এবং রাজ্যের মেয়ে তোমাকে সব সময় ঘিরে রয়েছে। সব সময়ই তুমি হো হো করে হাসছ এবং যা কিছু ব্যাপার সবই তোমাকে ঘিরে!’
আজ কোথায় সে মেয়ে? ঘাবড়িও না হে, কেমন করে হো হো করে হাসতে হয়, কথার পিঠে কিভাবে কথা বলতে হয়–কিছুই আমি ভুলিনি। মানুষের খুঁত কাড়তে তখনকার চেয়েও হয়ত এখন আমি আরও ভালো পারি; এখনও মক্ষিরানী সাজতে পারি… যদি ইচ্ছে করি। তার মানে এই নয় যে একটা সন্ধ্যে, কয়েকটা দিন, কিংবা এমন কি একটি সপ্তাহের জন্যেও আমি ফিরে পেতে চাই তেমন একটা জীবন বাইরে থেকে যা খুব ভারমুক্ত আর মজাদার বলে মনে হয়। কিন্তু সপ্তাহটিও শেষ হবে আর আমিও একেবারে নেতিয়ে পড়ব; তখন যদি এমন কোনো জিনিস নিয়ে কেউ কিছু বলতে শুরু করে যার মানে হয়, তাহলে আমি কৃতজ্ঞচিত্তে তা কানে তুলব। আমি চেলাচামুণ্ডা চাই না; আমি চাই বন্ধু, চাই গুণগ্রাহী–যারা কাউকে ভালবাসবে তার খোসামুদে হাসির জন্যে নয়, তার কৃত কাজ এবং তার চরিত্রের জন্যে।
