‘তোমার সাহায্য পেতে আমি সবসময়ই উৎসুক।’
‘আমার মনে হয়, বাপির কাছে গেলে আরও ভালো ফল হবে। উনি সবকিছু সামলে দেবেন, এটা তোমাকে বলে দিচ্ছি। ওঁকে তুমি স্বচ্ছন্দে সব বলতে পারবে।’
‘সত্যি, উনি একেবারেই বন্ধুর মতো।’
‘বাপিকে তোমার খুব ভালো লাগে, তাই না? পেটার মাথা নেড়ে সায় দেয়। ‘তোমাকেও বাপির ভালো লাগে।’
পেটার তাড়াতাড়ি মুখ তোলে। মুখে ওর সলজ্জ আভা। আমার কথায় ওকে খুশী হতে দেখে কী ভালো যে লাগল।
পেটার জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি তাই মনে করো?’
আমি বললাম, ‘করি বৈকি। মাঝে মাঝে টুকরো-টাকরা কথা থেকে সহজেই তা ধরে ফেলা যায়।’
পেটার সোনার ছেলে। ঠিক বাপিরই মতন!
তোমার আনা।
.
শুক্রবার, ৩ মার্চ, ১৯৪৪
আদরের কিটি,
আজ সন্ধেয় মোমবাতির (স্যাবাথের প্রাক সন্ধ্যায় ইহুদীদের বাড়িতে মোমবাতি জ্বালানো হয়) দিকে তাকিয়ে থেকে মন জুড়িয়ে গেল এবং আনন্দ হল। মোমবাতিতে যেন ভর করে আছেন ওমা এবং এই ওমাই আমাকে আশ্রয় দেন আর রক্ষা করেন, আমাকে তিনিই সবসময় পুনরায় সুখী করেন। কিন্তু…তিনি ছাড়া আছেন আরও একজন যার হাতে আমার সমস্ত ভাব অনুভবের চাবিকাঠি এবং সেই একজন…পেটার। আজ যখন আলু আনতে ওপরে গিয়ে প্যান হাতে তখন ও সিঁড়ির ধাপে দাঁড়িয়ে। আমাকে দেখেই সে বলে উঠল, ‘দুপুরে খাওয়ার পর এতক্ষণ ছিলে কোথায়?’ আমি গিয়ে সিঁড়ির ধাপে বসে পড়লাম, তারপর শুরু হল দুজনের কথা। সোয়া পাঁচটায় (এক ঘণ্টা দেরিতে) মেঝের ওপর বসানো আলুগুলো শেষ পর্যন্ত তাদের গন্তব্যস্থলে পৌঁছুল।
পেটার তার মা-বাবা সম্পর্কে একটি কথাও আর বলেনি; আমরা শুধু বই আর পুরনো প্রসঙ্গ নিয়ে কথা বলে গেলাম। ছেলেটার চোখে এমন একটা গদগদ ভাব; আমি প্রায় ওর প্রেমে পড়ে গিয়েছি, এমনি একটা অবস্থা। পরে সন্ধ্যেবেলায় ও সেই প্রসঙ্গ তুলল। আলুর খোসা ছাড়ানোর পর্ব শেষ করে আমি ওর ঘরে গিয়ে বললাম, আমার খুব গরম লাগছে।
আমি বললাম, মারগট আর আমাকে দেখলেই তুমি তাপমাত্রার হদিস পেয়ে যাবে। ঠাণ্ডা থাকলে দেখবে আমাদের মুখগুলো সাদা আর গরম থাকলে লাল।’
ও জিজ্ঞেস করল, ‘প্রেমজ্বর?’
‘প্রেমে পড়তে যাব কেন?’ আমার উত্তরটা হল আকাট রকমের।
ও বলল ‘কেন নয়?’ তারপর আমাদের খেতে চলে যেতে হল।
এ প্রশ্নটার ভেতর দিয়ে পেটার কি কিছু বুঝিয়ে দিতে চেয়েছিল। শেষপর্যন্ত আজ আমি ওকে মুখ ফুটে জিজ্ঞেস করেছিলাম যে, কাল আমি ওর বিরক্ত হওয়ার মতো কিছু বলেছি কিনা। শুনে ও শুধু বলল, ‘ঠিক বলেছ, ভালো বলেছ!’
এটা কতটা লজ্জায় পড়ে বলা, আমার পক্ষে তা বিচার করা সম্ভব নয়।
কিটি, কেউ যখন প্রেমে পড়ে আর সারাক্ষণ তার প্রেমিকের কথা বলে, আমার হয়েছে সেই অবস্থা। পেটারের মতো ছেলে হয় না। কবে আমি ওকে আমার মনের কথা বলতে পারব? তখনই, যখন জানব আমিও ওর মনের মানুষ সে তো বটেই। তবে আমি কারো সাহায্যের থোরাই পরোয়া করি, ও সেটা বিলক্ষণ জানে। আর ও ভালবাসে চুপচাপ থাকতে; ফলে, ও আমাকে কতটা পছন্দ করে আমি জানি না। সে যাই হোক, আমরা কতকটা পরস্পরকে জানতে পারছি। আমরা যদি সাহস করে পরস্পরের কাছে আরও খানিকটা নিজেদের মেলে ধরতাম তো ভালো হত। হয়ত সেই লগ্ন অপ্রত্যাশিতভাবে আগেই এসে যাবে। দিনে বার দুই বোঝাঁপড়ার ভাব নিয়ে আমার দিকে ও তাকায়, চার চোখের মিলন হয় আর আমরা দুজনেই আনন্দে ডগমগ হই।
ওর খুশী হওয়ার প্রসঙ্গে মুখে আমার খই ফোটে এবং সেই সঙ্গে আমি এটা নিশ্চিতভাবে জানি যে, পেটারও আমার সম্বন্ধে সেটাই ভাবে।
তোমার আনা।
.
শনিবার, ৪ মার্চ, ১৯৪৪
আদরের কিটি, মাসের পর মাস কেটে যাওয়ার পর এই প্রথম শনিবার। সেদিনটা একটুও একঘেয়ে, বিরক্তিকর এবং বিরস লাগেনি। এর কারণ পেটার। আজ সকালে আমি ছাদের ঘরে গিয়েছিলাম অ্যাপ্রন মেলে দিতে। বাপি বললেন ইচ্ছে হলে আমি যেন থেকে যাই এবং কিছুটা ফরাসীতে কথাবার্তা বলি। আমি থাকতে রাজী হলাম। গোড়ায় আমরা ফরাসীতে কথা বললাম এবং পেটারকে কিছুটা ব্যাখ্যা করে বোঝালাম; তারপর কিছুটা ইংরেজির চর্চা হল। বাপি চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে ডিকন্স থেকে পড়ে শোনালেন; পেটারের খুব কাছাকাছি বাপির চেয়ারে আমি বলেছিলাম বলে আনন্দে আমার সে যেন এক তুরীয় অবস্থা।
এগারোটায় আমি নিচে নামি। পরে সাড়ে এগারোটায় আবার ওপরে উঠে দেখি সিঁড়িতে ও আগে এসে আমার জন্যে দাঁড়িয়ে আছে। পৌনে একটা পর্যন্ত আমরা বকর বকর করলাম। খাওয়ার পর আমি যদি ঘর ছেড়ে চলে যাই, ও করে কি, সুযোগ পেলেই এবং যদি কেউ শুনতে না পায়, তাহলে বলে ও আসি, আনা! শীগগিরই দেখা হবে।
ওঃ, আমার যে কী আনন্দ! ও কি আমার প্রেমে পড়বে! আমি অবাক হয়ে ভাবি। যাই বলো, চমৎকার মানুষটা। আর দেখ, কেউ জানে না, আমাদের কী প্রাণ মাতানো কথা হয়।
আমি যে ওর কাছে যাই, কথা বলি–মিসেস ফান ডান কোনো আপত্তি করেন না। তবে আজ আমাকে চটাবার জন্যে জিজ্ঞেস করেছিলেন, তোমরা দুটিতে যে একা ওপরে থাকো, তোমাদের বিশ্বাস করা যায় তো?’
আমি আপত্তি করে বললাম, ‘নিশ্চয়। আপনি কিন্তু আমার আত্মসম্মানে ঘা দিচ্ছেন!
সকাল থেকে রাত পর্যন্ত আমি পেটারের পথ চেয়ে বসে থাকি।
তোমার আনা।
.
সোমবার, ৬ মার্চ, ১৯৪৪
আদরের কিটি,
