আদরের কিটি,
আমার নিজের ব্যাপারগুলো এখন আড়ালে ঠেলে দিয়েছে–এক চুরির ঘটনা। চোর চোর। করে আমি ক্রমশ লোকের কানের পোকা বের করে ফেলছি। না করে উপায় কি, চোররা যেকালে পায়ের ধুলো দিয়ে কোলেন অ্যাণ্ড কোম্পানিকে ধন্য করতে এতটা আহাদ বোধ করে। ১৯৪৩-র জুলাইয়ের চেয়ে এই চুরির জট অনেক বেশি।
মিস্টার ফান ডান যখন সাড়ে সাতটায় রোজকার মতো ক্রালারের অফিসে যান, তখন দেখতে পান মাঝখানে কাঁচের দরজা আর অফিস ঘরের দরজা খোলা। সে কি কথা। ফান ডান এগিয়ে গিয়ে যখন দেখলেন ছোট্ট এঁদো ঘরটারও দরজা খোলা এবং সদর দপ্তরে। জিনিসপত্র সব ছড়ানো ছিটানো, তখন তার চক্ষু ছানাবড়া। সঙ্গে সঙ্গে তার মনে হল, ‘নিশ্চয় চোর ঢুকেছিল।’ নিঃসন্দেহ হওয়ার জন্যে সামনের দরজাটা দেখতে তিনি সটান নিচের তলায় চলে গেলেন। ইয়েলের তালাটা নেড়েচেড়ে দেখলেন বন্ধ আছে, তখন উনি ঠাওরালেন, অর্থাৎ সন্ধ্যেবেলায় পেটার আর এলির ঢিলেমির জন্যেই এই কাণ্ড। ক্রালারের কামরায় কিছুক্ষণ থেকে, সুইচ টিপে আলো নিভিয়ে দিয়ে ফান ডান ওপরে উঠে আসেন খোলা দরজা আর এলোমেলো অফিস ঘরের ব্যাপারটাকে তিনি আর তেমন আমল দেননি।
আজ সাতসকালে পেটার এসে আমাদের দরজায় কড়া নাড়ল। বলল, সামনের দরজাটা হাট করে খোলা। খবরটা খুব সুবিধের নয়। সে এও বলল যে, আলমারিতে রাখা প্রোজেক্টের। আর ক্রালারের নতুন পোর্টফোলিওটা পাওয়া যাচ্ছে না। ফান ডান আগের দিন সন্ধেবেলায় তার অভিজ্ঞতার কথা বললেন। শুনে তো আমাদের মাথায় হাত।
আসলে ঘটেছিল নিশ্চয় এই ব্যাপার যে, চোরের কাছে ছিল চাপল, নইলে তালাটা একেবারে অক্ষত থাকে কেমন করে! চোর নিশ্চয় বাড়িতে সেঁধিয়েছিল অনেক আগে এবং তারপর দরজাটা বন্ধ করে দিয়েছিল। ঠিক সেই সময় হঠাৎ মিস্টার ফান ডান এসে যাওয়ায় তাড়াতাড়ি সে লুকিয়ে পড়ে। তারপর ফান ডান চলে যেতেই সে মালপত্র নিয়ে তাড়াতাড়িতে দরজা বন্ধ না করেই সরে পড়ে। এ বাড়ির চাবি কার কাছে থাকা সম্ভব? চোর এল অথচ মালখানায় গেল না। কেন? মালখানায় যারা কাজ করে তাদের মধ্যে কেউ নয় তো? ফান। ডানের উপস্থিতি সে নিশ্চয়ই টের পেয়েছে এবং হয়ত দেখেও ফেলেছে। লোকটা আমাদের। ধরিয়ে দেবে না তো?
এসব ভাবলেই গা শিউরে ওঠে। কেননা বলা তো যায় না, ঐ একই চোখ হয়ত এ বাড়িতে ফের হানা দেওয়ার মতলব করতে পারে। কিংবা কে জানে, এ বাড়িতে একজনকে ঘুরে বেড়াতে দেখে হয়ত তার একেবারে আক্কেল গুড়ুম?
তোমার আনা।
.
বৃহস্পতিবার, ২ মার্চ, ১৯৪৪
আদরের কিটি, মারগট আর আমি, আমরা দুজনেই আজ ছাদের ঘরে উঠেছিলাম। আমি ধারণা করেছিলাম, দুজনে একসঙ্গে গেলে দুজনেরই ভালো লাগবে। সেটা ঘটেনি; তবু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মারগটের সঙ্গে আমার অনুভূতির মিল হয়।
বাসন ধোয়ার সময় মা-মণি আর মিসেস ফান ডানকে এলি বলেছিল যে, মাঝে মাঝেই তার খুব মন খারাপ লাগে। ওঁরা কি দাওয়াই বালালেন শুনবে? মা-মণি কী উপদেশ দিলেন, জানো? এলির উচিত তাবৎ লাঞ্ছিত-নিপীড়িত মানুষের কথা ভাবা! কেউ যখন এমনিতেই মনমরা হয়ে আছে, তখন তাকে দুঃখের কথা ভাবতে বলে কী লাভ? আমি তাও বলেছিলাম, কিন্তু তার জবাবে আমাকে বলা হল, এসব কথার মধ্যে তুমি নাক গলাতে এসো না।’
বুড়োধাড়িরা যেমনি আহাম্মক তেমনি বোকা, তাই না? পেটার, মারগট, এলি আর আমি–যেন আমাদের জ্ঞানগম্যিগুলো এঁদের মতো নয়; যেন একমাত্র মায়ের কিংবা অতিশয় ভালো কোনো বন্ধুর ভালবাসাই আমাদের সহায় হতে পারে। এখানকার এই মায়েরা আমাদের আদৌ বোঝে না। হয়ত মা-মণির তুলনায় মিসেস ফান ডান তবু একটু বোঝেন। ইস, এলি বেচারাকে আমি কিছু বলতে পারলে বড় ভালো হত; ওকে আমি বলতাম আমার অভিজ্ঞতালব্ধ কথা, তাতে ওর মন ভালো হত। কিন্তু বাপি এসে মাঝপড়া হয়ে আমাকে সরিয়ে দিলেন।
বোকা আর বলেছে কাকে। আমাদের নিজস্ব মতো থাকতে ওরা দেবেন না। লোকে আমাকে মুখে কুলুপ আঁটতে বলতে পারে, কিন্তু তাতে তো আর আমার নিজের মতো থাকা ঠেকানো যাবে না। বয়স কম হলেও তাদের মনের কথা অবাধে বলতে দেওয়া উচিত।
একমাত্র বিপুল ভালবাসা আর অনুরাগ এলি, মারগট, পেটার আর আমার পক্ষে হিতকর হতে পারে; আমরা কেউ তা পাচ্ছি না। আমাদের মনের ভাব কেউ বুঝতে পারে না। বিশেষ ভাবে, এখানকার যারা গবেট, সবজান্তার দল, তারা তো নয়ই, কেননা, এখানে কেউ স্বপ্নেও ভাবতে পারে না যে, তাদের চেয়ে আমরা ঢের বেশি স্পর্শকাতর এবং চিন্তার দিক দিয়ে অনেক বেশি এগিয়ে।
মা-মণি ইদানীং আবার গজগজ করছেন–আমি আজকাল মিসেস ফান ডানের সঙ্গেই কথাবার্তা বেশি বলছি বলে উনি ঈর্ষা করছেন সেটা বোঝাই যায়।
আজ সন্ধ্যেবেলায় পেটারকে কোনোক্রমে পাকড়াও করতে পেরেছিলাম; আবার কমপক্ষে তিন কোয়ার্টার সময় দুজনে বকর বকর করেছি। ও সবচেয়ে বেশি ঝামেলায় পড়েছিল নিজের সম্বন্ধে বলতে গিয়ে; অনেকখানি সময় লেগেছিল ওকে দিয়ে কথা বের করতে। রাজনীতি, সিগারেট, এবং যাবতীয় জিনিস নিয়ে প্রায়ই ওর মা-বাবার মধ্যে যে খিটিমিট হয়, এটা পেটার আমাকে বলেছিল। ও বেজায় মুখচোরা।
এরপর আমার মা-বাবা সম্পর্কে আমি ওকে বলেছিলাম। পেটার বাপির স্বপক্ষে বলল; ওর মতে, আমার বাপি একজন দারুণ লোক। এরপর ‘ওপর তলা’ আর নিচের তলা’ নিয়ে আবার আমাদের কথা হল; ওর মা-বাবাকে আমাদের যে সবসময় পছন্দ হয় না, এটা শুনে ও হাঁ হয়ে গেল। আমি বললাম, ‘পেটার, তুমি জানো আমি সবসময় যা সত্যি তাই বলি; ওঁদের মধ্যে যেসব দোষ আমরা দেখতে পাই, কেন তোমাকে তা বলতে পারব না।’ অন্যান্য কথার পিঠে আবার বললাম, ‘তোমাকে সাহায্য করতে পেলে আমি যে কী খুশি হই, পেটার। পারি না করতে? তুমি খুবই ঝামেলার মধ্যে পড়েছ, অবশ্য মুখ ফুটে তুমি বলো না, তার মানে এ নয় যে–তুমি কিছু গায়ে মাখো না।’
