কিন্তু সেই সঙ্গে আমি চেয়ে দেখছি খোলা জানলার বাইরে আমস্টার্ডামের বিস্তীর্ণ অঞ্চল, ছাদের পর ছাদ আর দূর দিগন্তে, তার রঙ এমনই ফিকে নীল যে বোঝাই দায়, কোথায় তার শেষ আর কোথায় শুরু। আমি মনে মনে বললাম, ‘যতদিন এর অস্তিত্ব আছে আর আমি বেঁচে থেকে দেখব এই রৌদ্রালোক, নির্মেঘ আকাশ, এ যতক্ষণ আছে আমি অসুখী হতে পারি না।’
যারা সন্ত্রস্ত, যারা নিঃসঙ্গ অথবা যারা অসুখী, তাদের পক্ষে সবচেয়ে প্রশস্ত হল বাইরের কোথাও চলে যাওয়া, এমন জায়গায় যেখানে জ্যোতিলোক, নিসর্গ আর ঈশ্বরের সঙ্গে তারা। একা হতে পারবে। কারণ, একমাত্র তখনই কেউ অনুভব করে সবকিছু যথোচিত আছে; এবং প্রকৃতির শুদ্ধ সৌন্দর্যের মাঝখানে মানুষ খুশি হোক, ঈশ্বর তাই চান। এ যতদিন আছে, এবং এ জিনিস নিশ্চয় চিরদিই থাকবে। আমি জানি, যখন যে অবস্থাই আসক, প্রত্যেকটি, সন্তাপে। সব সময়ই সান্ত্বনা মিলবে। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, সব কষ্টের উপশম ঘটায় প্রকৃতি।
আমি এমন একজনের সঙ্গে এই পরম সুখানুভূতি ভাগ করে নিতে চাই, এ ব্যাপারে যার জ্ঞানবোধগুলো আমারই মতন। মন বলছে, হয়ত সেটা ঘটতে খুব বেশি দেরি হবে না।
তোমার আনা।
.
একটা ভাবনা
এখানে এত কিছু পাই না, তার পরিমাণ এত বেশি এবং আজ এতদিন ধরে; তোমার মতোই আমি বঞ্চিত। বাইরের জিনিসপত্রের কথা তুলছি না, সেদিক থেকে বরং আমাদের দেখবার লোক আছে; আসলে আমি বলছি ভেতরের জিনিসের কথা। তোমার মতন, আমি চাই স্বাধীনতা আর খোলা হাওয়া, কিন্তু এখন আমার ধারণা, বহু কিছু আছে যাতে আমাদের অভাব পুষিয়ে যায়। আজ সকালে জানালার ধারে বসে বসে এটা হঠাৎ আমার উপলব্ধি হল। আমি বলছি ভেতরের ক্ষতিপূরণের কথা।
যখন আমি বাইরে তাকিয়ে সরাসরি নিসর্গ আর ঈশ্বরের গহনে চোখ রাখলাম, তখন আমি সুখ পেলাম, সত্যিকার সুখ। আর দেখ পেটার, যতক্ষণ আমি এখানে সেই সুখ পাই প্রকৃতি, সুস্থ সবলতা এবং আরও অনেক কিছুর আনন্দ, সর্বক্ষণই তা পাওয়া যায়। সমস্ত সময়ই সেই সুখ মনের মধ্যে ফিরিয়ে আনা যেতে পারে।
ধনদৌলত পুরোটাই খোয়া যেতে পারে, কিন্তু তোমার আপন হৃদয়ে সেই সুখ শুধুমাত্র অবগুণ্ঠিত হতে পারে; যতদিন তুমি বেঁচে থাকবে ততদিন আবারও তা তোমাকে সুখ এনে দেবে। যতদিন তুমি অকুতোভয়ে জ্যোতির্লোকে দৃষ্টি ফেরাতে পারবে, ততদিন তুমি জানছ অন্তরে তুমি শুদ্ধ এবং চাইলেই সুখ পাবে।
.
রবিবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি, ১৯৪৪
প্রিয়তম কিটি,
সেই কোন্ ভোর থেকে অনেক রাত অবধি পেটারের কথা ভাবা ছাড়া আমি প্রায় আর কিছুই করি না। ঘুমোবার সময় আমার চোখে পটে থাকে ওর ছবি, ওকে নিয়ে আমার স্বপ্ন এবং যখন চোখ খুলি তখনও ‘ও আমার দিকে তাকিয়ে।
আমার খুব মনে হয়, বাইরে যেমনই দেখাক, প্রকৃতপক্ষে পেটার আর আমার মধ্যে খুব একটা তফাত নেই। কেন বলছি–আমাদের দুজনেরই মা থেকেও নেই। ওর মা-র হালকা স্বভাব, ফষ্টিনষ্টি করতে ভালবাসেন, ছেলের মনে কী হচ্ছে তা নিয়ে ওঁর বিশেষ মাথাব্যথা নেই। আমার মা আমার সম্পর্কে চিন্তা করেন, কিন্তু তার মধ্যে সংবেদনশীলতা এবং মাতৃসুলভ বৃত্তির অভাব। পেটার আর আমি, আমরা দুজনেই আমাদের ভেতরকার অনুভূতিগুলোর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ি, এখনও আমরা অনিশ্চয়তার মধ্যে আছি, রুক্ষ ব্যবহার পেলে মনে খুব লাগে। কেউ যদি তেমন করে, আমার মনে হয় যেদিকে দুচোখ যায় চলে যাই’। কিন্তু সেটা সম্ভব নয় বলে, আমি আমার মনের ভাব গোপন করে গটগটিয়ে চলি, গলাবাজি করি আর মেজাজ দেখাই–যাতে প্রত্যেকে ঝেটিয়ে দূর করে দিতে চায়।
পেটার এর ঠিক উল্টো। ও ঘরে ঢুকে খিল এঁটে দেয়, কথা প্রায় বলে না বললেই হয়, চুপচাপ বসে সুখস্বপ্ন দেখে এবং তার মতো করে নিজেকে ও আড়াল করে রাখে।
কিন্তু কখন কিভাবে আমরা শেষ পর্যন্ত পরস্পরের কাছে পৌঁছব? আমি ঠিক জানি না, আমার সহজ বুদ্ধি আর কতদিন এই উৎকণ্ঠাকে সামাল দিয়ে চলবে।
তোমার আনা।
.
সোমবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি, ১৯৪৪
প্রিয়তম কিটি, কি দিনে কি রাত্রে–এটা একটা দুঃস্বপ্ন হয়ে উঠছে। প্রায় সারাক্ষণই ওকে দেখি অথচ ওর কাছে যেতে পারি না। আমাকে দেখে কেউ যাতে বুঝতে না পারে, তার জন্যে যখন আমি আসলে মুষড়ে পড়ি তখনও নিজেকে আমার হাসিখুশি দেখাতে হবে।
পেটার ভেসেল আর পেটার ফান ডান মিলে এখন পেটারে একাকার হয়ে গেছে। পরমপ্রিয় আর সজ্জন এই পেটার; ওর জন্যে আমার কী যে আকুলিবিকুলি কী বলব।
মা-মণি ক্লান্তিকর, বাপির মিষ্টি স্বভাব এবং সেইজন্যেই আরও ক্লান্তিকর। মারগট সবচেয়ে বেশি ক্লান্তিকর, কারণ ও চায় আমি হাসিখুশি ভাব নিয়ে থাকি। আমি বলি আমাকে আমার মতো থাকতে দাও।
চিলেকোটায় পেটার আমার কাছে এল না। তার বদলে মটকায় উঠে গিয়ে ছুতোরের কিছু কাজ করল। একবার করে আওয়াজ হয় চটাস্ আর খটাস, অমনি আমার বুকের মধ্যে যে ধড়াস্ করে ওঠে। আর আমি ততই বিমর্ষ হয়ে পড়ি। দূরে ঘণ্টা বাজছে ‘শুদ্ধ দেই, শুদ্ধ আত্মার সুরে (পুরোনো ঘড়িওয়ালা মিনারে ঘন্টা বাজে গানের সুরে)। আমি ভাবপ্রবণ হয়ে পড়ছি–আমি তা জানি; আমি মন-ভাঙা আর ভোতা হয়ে পড়ছি–তাও জানি। কে আছ, আমাকে বাঁচাও!
তোমার আনা।
০৭. আমার নিজের ব্যাপারগুলো
বুধবার, ১ মার্চ, ১৯৪৪
