পেটারের সাংঘাতিক হীনমন্যতা। যেমন, পেটার সর্বক্ষণ মনে করে সে হল মাথামোটা আর আমরা খুব চতুর। ওর ফরাসী চর্চায় আমি সাহায্য করলে হাজার বার আমাকে ও ধন্যবাদ দেয়। একদিন আমি ঘুরে দাঁড়িয়ে ওকে বলব–’থামো তো, ইংরেজি আর ভুগোলে তুমি আমার চেয়ে অনেক ভালো।‘
তোমার আনা।
.
শুক্রবার, ১৮ ফেব্রুয়ারি, ১৯৪৪
আদরের কিটি,
যখনই আমি ওপর তলায় যাই, আশায় আশায় থাকি ওর হয়ত দেখা পাব। কেননা আমার জীবনে এখন একটা উদ্দেশ্য এসেছে, এখন কিছু একটা প্রত্যাশা করতে পারি, সবকিছুই আমার কাছে আজ রমণীয় হয়ে উঠেছে।
অন্তত আমার অনুভবের উৎস তো সর্বদাই হাজির; আমার কোন ভয় নেই, কেননা মারগটকে বাদ দিলে আমি তো অপ্রতিদ্বন্দ্বী। ভেবো না আমি প্রেমে পড়েছি; কেননা প্রেমে আমি পড়িনি। কিন্তু আমাদের মধ্যে একটা কোনো সুন্দর সম্পর্ক গড়ে উঠতে পারে, যা আমাদের দেবে বল ভরসা আর বন্ধুত্ব–আমি এটা সবসময় অনুভব করি। একটা কোনো ছুতো পেলেই এখন আমি ওপরে ওর কাছে চলে যাই। আগে একটা সময় ছিল যখন পেটার কী করে কথা শুরু করবে জানত না। এখন আর তা নয়। বরং তার উল্টো। যাবার সময় আমার এক পা যখন ঘরের বাইরে–তখনও পেটারের কথা শেষ হতে চায় না।
মা-মণি আমার আচরণে তেমন খুশি নন; সবসময়ে বলেন, আমাকে নিয়ে ঝামেলা হবে এবং আমি যেন পেটারকে না জ্বালাই। আশ্চর্য, উনি কি এটা বোঝেন না যে আমার ঘটে কিছুটা বুদ্ধি আছে? পেটারের ছোট ঘরটাতে যখনই যাই মা-মণি আমার দিকে এমন আড়চোখে তাকান। সেখানে নিচে নেমে এলেই জিজ্ঞেস করেন এতক্ষণ কোথায় ছিলাম। আমার গা রী রী করে। খুব জঘন্য লাগে।
তোমার আনা।
.
শনিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি, ১৯৪৪
আদরের কিটি,
আবার সেই শনিবার এবং তাতেই সব স্পষ্ট হয়ে যায়।
সকালটা ছিল চুপচাপ। ওপর তলায় গিয়ে আমি কিছুটা বাড়ির কাজে সাহায্য করেছি; কিন্তু ওর সঙ্গে দু-একটা ঠুনকো কথা ছাড়া হয়নি। আড়াইটে নাগাদ সবাই যখন শুতে কিংবা পড়তে যে যার ঘরে চলে গেছে, আমি কম্বল আর যা কিছু সব নিয়ে টেবিলে বসে লেখাপড়া করতে খাস কামরায় চলে গেলাম। কিছুক্ষণ পরেই আমি একেবারে ভেঙে পড়লাম, কাধের ওপর মাথা এলিয়ে দিয়ে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতে লাগলাম। দুই চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়তে লাগল; তখন আমার কী বিশ্রী মনের অবস্থা কী বলব। ইস! ‘ও’ যদি একবার এসে আমার দুঃখ ভুলিয়ে দেয়। চারটে নাগাদ আবার আমি ওপরে গেলাম। আবার তার দেখা পাব, মনে এই আশা নিয়ে গেলাম খানকতক আলু আনতে। যখন আমি গোসলের ঘরে চুল ঠিক করছি, ঠিক তখনি সে মালখানায় বেখোর খোঁজে নিচে নেমে গেল।
হঠাৎ আবার চোখ ফেটে পানি চলে আসার উপক্রম হয়। সঙ্গে সঙ্গে আমি শৌচাগারে ছুটে যাই। যেতে যেতে তাড়াতাড়ি একটা পকেট-আয়না টেনে নিই। তারপর সেখানেই পুরো জামাকাপড়সুদ্ধ বসে পড়ি আর আমার লাল আঁচলে চোখের পানি পড়ে কালো কালো দাগে ভরে যায়। আমার এত মন খারাপ লাগছিল বলার নয়।
আমার মনের মধ্যে তখন এই রকম হচ্ছিল। ইস্, এভাবে আমি কখনই পেটারের কাছে যেতে পারি না। বলা যায় না, ও হয়ত আমাকে আদৌ পছন্দ করে না এবং মনের কথা বলার মত কাউকেই ওর দরকার নেই। হয়ত আমার কথা ও নেহাত ওপরসা ভাবে। আমাকে হয়ত আবারও সেই সাথীহারা একা হয়ে যেতে হবে, পেটার থাকবে না। হয়ত কিছুদিনের মধ্যেই আমার না থাকবে আশ্বাস না কোনো স্বস্তি; হয়ত এরপর হাপিত্যেশ করারও কিছু থাকবে না। ইস্, আমি যদি ওর কাধে আমার মাথা রাখতে পারতাম, নিজেকে যদি এত নিঃসঙ্গ, এত পরিত্যক্ত মনে না হত! ও আমার কথা আদৌ চিন্তা করে কিনা এবং অন্যদের দিকেও ঠিক একই ভাবে তাকায় কিনা, কে জানে! ও আমাকে বিশেষ ভাবে দেখে, এটা হয়ত ছিল আমারই মন গড়া। ও পেটার, শুধু যদি আমি তোমার চক্ষুকর্ণের গোচর হতাম! যা ভয় করছি তাই যদি সত্যি হয়, তাহলে তা হবে আমার সহ্যের বাইরে।
যাই হোক, অবিরল অশ্রুধারার মধ্যেও একটু বাদে মনে হল যে আবার নতুন আশ্বাস আর প্রত্যাশা ফিরে এসেছে।
তোমার আনা।
.
বুধবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি, ১৯৪৪
আদরের কিটি,
বাইরে ভারি সুন্দর আবহাওয়া। কাল থেকে মনে আমার বেশ ফুর্তির ভাব। প্রায় রোজ সকালেই ছাদের ঘরে চলে যাই যেখানে পেটার কাজ করে। জোরে জোরে নিশ্বাস নিয়ে নিচের দমবন্ধ ভাব দূর করি। মেঝেতে একটা জায়গা আছে, সেখান থেকে মুখ তুলে তাকিয়ে নীল আকাশ দেখি। নিষ্পত্র একটা চেস্টনাট গাছ, তার ডালে ডালে রূপোর মতন জ্বলজ্বল করে বৃষ্টির ছোট ছোট ফোঁটা। হাওয়ায় ভেসে বেড়ানো সী-গাল আর অন্যান্য পাখি।
একটা মোটা কড়িকাঠে মাথা ঠেকিয়ে পেটার দাঁড়িয়ে। আমি বসলাম। খোলা হাওয়ায় আমরা নিঃশ্বাস নিচ্ছি। বাইরে আমাদের দৃষ্টি প্রসারিত। দুজনেই বুঝছি, কথা বললেই এই মোহজাল ছিঁড়ে যাবে। অনেকক্ষণ আমাদের এইভাবে কেটে গেল। পেটারকে যখন কাঠ চেলা করতে মকায় যেতে হল, তখন আমার উপলব্ধি হল মানুষটা খুব চমৎকার। পেটার মই বেয়ে ওপরে উঠে গেল; ওর দেখাদেখি আমিও উঠলাম।
মিনিট পনেরো ধরে ও কাঠ চেলা করল। এ পর্যন্ত আমরা কেউ একটাও কথা বলিনি। আমি ঠায় দাঁড়িয়ে ওকে দেখছি! দেখেই বোঝা যায় ও কতটা জোয়ান সেটা সর্বশক্তিতে দেখানোর চেষ্টা করছে।
