শেষ বাক্যটাতে এসে মনে মনে আমি না হেসে পারলাম না। কিন্তু আমার তখন ইচ্ছে, পেটার তার নিজের কথা বলে চলুক; তাই কোনো উচ্চবাচ্য না করে মেঝেতে একটা কুশনের ওপর পুঁটুলি পাকিয়ে বসে ওর দিকে উত্তর্ণ হয়ে চেয়ে রইলাম। এ বাড়িতে আরেকজন আছে যে আমার মতন একই রকম ক্ষেপে আগুন হয়। আমি দেখলাম মনের সুখে ডুসেলের আদ্যশ্রাদ্ধ করতে পেরে পেটারের ভালোই হয়েছে। আমার দিক থেকে কাউকে লাগানো ভজানোর ভয় ওর নেই। সেদিক থেকে আমিও বেজায় খুশি, কেননা আমাদের দুজনের মধ্যে যে একটা সত্যিকার সহমর্মিতা গড়ে উঠেছে এটা অনুভব করতে পারছি। আমার মনে পড়ে, একদিন আমার মেয়েবন্ধুদের সঙ্গে ঠিক এমনই একটা সম্পর্ক ছিল।
তোমার আনা।
.
বুধবার, ১৬ ফেব্রুয়ারি, ১৯৪৪
আদরের কিটি, আজ মারগটের জন্মদিন। সাড়ে বারোটায় পেটার এল উপহারের জিনিসগুলো দেখতে এবং কথা বলতে বলতে থেকে গেল যতক্ষল থাকলে চলত তার চেয়েও বেশি–যেটা তার স্বভাববিরুদ্ধ। বিকেলের দিকে আমি গেলাম কিছুটা কফি আনতে এবং তারপর আলু আনতে। কেননা বছরের এই একটা দিন আমি চেয়েছিলাম আদর দিয়ে ওকে একটু মাথায় চড়াতে। আমি গেলাম পেটারের ঘরের ভেতর দিয়ে; সঙ্গে সঙ্গে পেটার তার সমস্ত কাগজপত্র সিঁড়ি থেকে সরিয়ে নিল। ওকে আমি জিজ্ঞেস করলাম ছাদের ঘরের কজা দেওয়া দরজাটা বন্ধ করে দেব কিনা। বলল, ‘বন্ধ করে দাও। যখন আসবে, দরজায় টোকা দিও, আমি খুলে দেব।’
ওকে ধন্যবাদ দিয়ে ওপরে গেলাম। বড় জালাটার মধ্যে কম করে দশ মিনিট ধরে সবচেয়ে ছোট আলুগুলো ঘুড়লাম। ততক্ষণে আমার কোমর দরে গেছে এবং ঠাণ্ডাও লেগেছে। স্বভাবতই ডাকাডাকি না করে আমি নিজেই টানা দরজাটা খুলেছি। এ সত্ত্বেও পেটার সঙ্গে সঙ্গে নিজের থেকেই আমার কাছে এসে আমার হাত থেকে প্যান্টা নিল।
বললাম, ‘অনেক খুঁজে পেত ক্ষুদে আলু বলতে বেছে এইগুলো পেয়েছি।‘
‘বড় জালাটা দেখেছিলে?’
‘কোনোটাই দেখতে বাকি রাখিনি।‘
বলতে বলতে সিঁড়ির গোড়ায় এসে আমি দাঁড়িয়েছি। পেটার তখনও হাতের প্যাটা তন্ন তন্ন করে দেখছে। পেটার বলল, ‘ব্যস্ রে, সেরা আলুগুলোই তো বেছে এনেছ।’ তারপর ওর হাত থেকে প্যান্ট ফেরত নেবার সময় বলল, বাহাদুর মেয়ে!’ সেই সময় ওর চাহনিতে ফুটে উঠেছিল এমন একটা শান্ত স্নিগ্ধ ভাব যে, তাতে আমার ভেতরটা মধুর আবেশে ভরে উঠল। আমি বস্তুতই দেখতে পেলাম পেটার আমার মন পেতে চাইছে এবং যেহেতু সে দীর্ঘ প্রশস্তিবাচনে অপারগ সেইজন্যে সে চোখ দিয়ে কথা বলছিল। আমি অতি সুন্দরভাবে বুঝতে পারছিলাম ও কী বলতে চাইছে এবং সেজন্যে নিজেকে ধন্য মনে করছিলাম। আজও সেইসব কথা আর তার সেই চাহনি স্মরণ করে মন আনন্দে ভরে ওঠে।
নিচে নামতেই–মণি বললেন আমাকে আরও কিছুটা আলু আনতে হবে, রাতের খাবারের জন্যে। আমি তো ওপরে যাওয়ার জন্যে তক্ষুনি এক পায়ে রাজী।
পেটারের ঘরে ঢুকে ওকে ফের বিরক্ত করার জন্যে ক্ষমা চেয়ে নিলাম। যখন আমি সিঁড়িতে পা দিয়েছি, পেটার উঠে পড়ে দরজা আর দেয়ালের মাঝখানে দাঁড়িয়ে শক্ত হতে আমার বাজু ধরে জোর করে আমাকে আটকাতে চাইল।
বলল, আমি যাচ্ছি।’ উত্তরে আমি বললাম তা দরকার নেই, কেননা এবারে আমাকে তত ছোট ছোট আলু বাছতে হবে না। বুঝতে পেরে পেটার আমার হাত ছেড়ে দিল। আলু নিয়ে নামার সময় ও এসে টানা দরজাটা খুলে আবার আমার হাত থেকে প্যাটা নিল। দোরগোড়ায় এসে আমি জিজ্ঞেস করলাম, কী করছ? পেটার জবাব দিল, ফরাসী’। ওর অনুশীলনগুলো একটু দেখতে পারি কিনা জেনে নিলাম। তারপর হাত ধুয়ে এসে ওর সামনাসামনি ডিভানটাতে গিয়ে বসলাম।
ফরাসী ভাষার কয়েকটা জিনিস গোড়ায় ওকে বুঝিয়ে দিলাম। তারপরই আমাদের কথা শুরু হয়ে গেল। পেটার বলল ওর ইচ্ছে, পরে ওলন্দাজ-অধিকৃত পূর্ব-ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জে চলে গিয়ে কোনো বাগিচায় বসবাস করবে। পারিবারিক জীবন, কালোবাজার–এইসব প্রসঙ্গের পর ও বলল–নিজেকে ওর একেবারেই অপদার্থ মনে হয়। আমি ওকে বললাম এর মধ্যে নিশ্চয়ই হীনমন্যতার জট আছে। ইহুদীদের প্রসঙ্গ ও তুলল। বলল ও যদি খ্রীস্টান হত তাহলে ওর পক্ষে অনেক কিছু সহজ হয়ে যেত এবং যদি যুদ্ধের পরে হতে পারে। ও শুদ্ধীকরণ চায় কিনা জিজ্ঞেস করলাম। কিন্তু তাও সে চায় না। বলল, যুদ্ধ মিটে গেলে কে আর জানছে সে ইহুদী?
এতে আমি একটু মনঃক্ষুণই হলাম এটা অত্যন্ত দুঃখের বিষয় যে সবসময় ওর স্বভাবে একটু মিথ্যের ছোঁয়া থাকে। বাপি সম্পর্কে, লোকচরিত্রের প্রসঙ্গে এবং আরও যাবতীয় বিষয়ে বাদবাকি কথাবার্তা বেশ খোশমেজাজে হল। কিন্তু কী কথা হয়েছিল এখন আর ঠিক মনে নেই। আমি যখন উঠলাম ঘড়িতে যখন সাড়ে চারটে বেজে গেছে।
সন্ধ্যেবেলায় পেটার অন্য একটা কথা বলেছিল। আমার কাছে সেটা ভালোই লেগেছিল। একবার ওকে আমি এক চিত্রতারকার ছবি দিয়েছিলাম; ছবিটা গত দেড় বছর ধরে ওর ঘরে টাঙানো রয়েছে। ছবিটা নিয়ে আলোচনা প্রসঙ্গে পেটার বলল ওটা ওর খুব প্রিয়। আমি ওকে পরে কখনও আর কিছু ছবি দেব বলায় পেটার জবাব দিল, ‘না। ওটা যেমন আছে থাক। রোজই আমি ছবিগুলো চেয়ে চেয়ে দেখি; এখন ওরা হয়ে পড়েছে আমার হলায়গলায় বন্ধু।’
এখন আমি আরও ভালো করে বুঝতে পারি, পেটার কেন সব সময় মুশ্চির সঙ্গে লেপটে থাকে। ও খানিকটা স্নেহের কাঙাল তো বটেই। বলতে ভুলে গিয়েছিলাম পেটারের অন্য একটা বক্তব্যের কথা। ও বলেছিল, নিচের ক্রটির কথা মনে হলেই যা ঘাবড়ে যাই, নইলে ভয় কাকে বলে আমি জানি না। কিন্তু সে দোষও আমি কাটিয়ে উঠছি।’
