‘শুনুন, শুনুন। রসিকতা রাখুন, আমরা চেষ্টা করব একটা নৌকো যোগাড় করতে।‘
‘কী দরকার? তার চেয়ে আমি বলি কি, চিলেকোঠা থেকে আমরা প্রত্যেকে নেব একটা করে কাঠের পাকিং বাক্স আর হাল বাইবার জন্যে একটা করে সুপের বড় হাতা!’
‘আমি রয় করে হেঁটে যাব; ওতে কম বয়সে আমি ছিলাম ওস্তাদ।’
‘হেংক ফান সাণ্টেনের তার দরকার হবে না, ওর বউকে উনি পিঠে নেবেন, তাহলেই ভদ্রমহিলার রপায় চড়া হবে।
এ থেকেই ধরনটা তুমি মোটের ওপর আঁচ করতে পারবে। তাই না, কিটি?
এই সব গালগল্প শুনতে মজার হলেও হয়ত আদতে ব্যাপারটা উল্টো। বহিরাক্রমণ প্রসঙ্গে দ্বিতীয় একটা প্রশ্ন না উঠেই পারে না–জার্মানরা আমস্টার্ডাম ছেড়ে চলে গেলে আমরা তখন কী করব?’
‘আমরাও শহর থেকে চলে যাব এবং যে যতটা পারি বেশভুষা পাল্টে ফেলব।
‘উঁহু, যাবে না। যাই ঘটুক, থেকে যাবে। সেক্ষেত্রে একমাত্র কাজ হবে দাঁতে দাঁত দিয়ে এখানেই থেকে যাওয়া। নইলে জার্মানরা ঝেটিয়ে সবাইকে খোদ জার্মানিতে চালনা করবে, যেখানে তারা সবাই মারবে। এদের অসাধ্য কিছু নেই!’
‘যা বলেছ, ঠিক তাই। এটাই সবচেয়ে নিরাপদ ঠাঁই, সুতরাং আমরা এখানেই থাকব। আমরা চেষ্টা করব যাতে মিস্টার কুপহুইস সপরিবারে চলে এসে এখানেই আমাদের সঙ্গে থাকেন। এক বস্তা কাঠের গুড়ো যোগাড় করে আনতে পারলে আমরা মেঝেতেই শুতে পারি। মিপ আর কুপহুইসকে বলা যাক এখনই ওঁরা এখানে কম্বল আনতে শুরু করে দিন।
আমাদের ষাট পাউণ্ড ভুট্টার ওপর বাড়তি কিছু আনিয়ে নিতে হবে। হেংককে বলা যাক আরও মটরশুঁটি আর বিন্ যোগাড় করতে; আমাদের এখন ঘরে আছে ষাট পাউণ্ডের মতো বি আর দশ পাউণ্ডের মতো মটরশুঁটি। মনে থাকে যেন আমাদের হাতে আছে পঞ্চাশ টিন সব্জি।’
‘মা-মণি, অন্যান্য খাবার আমাদের কতটা কী আছে, একটু হিসেব করে দেখবে?
‘মাছ দশ টিন, দুধ চল্লিশ টিন, পাউডার-দুধ দশ কেজি, বনস্পতি তিন বোতল, জমানো মাখনের চারটি বয়াম, জমানো মাংস চার বয়াম, দুটো বেতে-মোড়া স্ট্রবেরির বোতল, দুই বোতল র্যাস্পবেরি, কুড়ি বোতল টমেটো সস, দশ পাউণ্ড ওটমিল, আট পাউণ্ড চাল; সবসুদ্ধ এই।
‘ভাঁড়ারে যা আছে তা খুব খারাপ নয়। কিন্তু যদি বাইরের লোক আসে এবং সঞ্চিত খাবারের প্রতি সপ্তাহে হাত পড়ে, তাহলে এই দৃশ্যত বেশিটা আর তখন আসলে বেশি থাকবে না। বাড়িতে কয়লা আর জ্বালানি কাঠ, আর সেই সঙ্গে মোমবাতি, যা আছে যথেষ্ট। যদি আমরা সঙ্গে টাকাকড়ি নিয়ে যেতে চাই, তাহলে এসো আমরা সবাই আমাদের জামাকাপড়ের মধ্যে লুকিয়ে রাখা যায় এমন ছোট ছোট সব টাকার থলি বানিয়ে নিই।
‘যদি হঠাৎ পালাতে হয় তাহলে সঙ্গে জরুরি কি কি জিনিস নেব তার একটা লিস্ট এখনি বানিয়ে ফেলতে হবে এবং রুকস্যাকগুলো প্যাক করে তৈরি রাখতে হবে।
পানি যদি অতটাই গড়ায় তাহলে আমরা দুজন লোককে খবরদারির জন্যে রাখব একজন থাকবে সামনে এবং একজন থাকবে পেছনের চিলেকোঠায়। আমি বলি, এত খাবারদাবার যোগাড় করে হবেটা কি, যদি পানি, গ্যাস বা ইলেকট্রিসিটি আদৌ না থাকে?‘
‘তখন আমরা স্টোভে রাঁধব। পানি ফিল্টার করে ফুটিয়ে নেব। কিছু বেতে মোড়া বড় বড় বোতল পরিষ্কার করে নিয়ে তাতে পানি জমিয়ে রাখব।‘
সারাদিন ঘ্যানর ঘ্যানর করে কেবল এইসব কথা। বহিরাক্রমণ আর শুধু বহিরাক্রমণ; পেটের জ্বালা, মৃত্যু, বোমা, আগুন নেভানো, স্লিপিং ব্যাগ, ইহুদীদের কূপন, বিষাক্ত গ্যাস ইত্যাদি ইত্যাদি–এই নিয়ে কুটচক্ৰচাল।
এর কোনোটাই ঠিক মন প্রফুল্ল করার জিনিস নয়। গুপ্ত-মহলবাসী ভদ্রমহোদয়েরা বেশ খোলাখুলি অমঙ্গলের সঙ্কেত দিচ্ছেন। হেংক-এর সঙ্গে নিম্নোক্ত সংলাপের তার পরিচয় মিলবে–
গুপ্ত-মহল–’আমাদের ভয়, জার্মানরা সরে গেলে ওরা শহর থেকে ঝেটিয়ে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে যাবে।’
হেংক–’অসম্ভব, ওদের হাতে এত ট্রেনই নেই।’
গু-ম–’ট্রেন কেন? আপনি কি ভাবছেন বেসামরিক লোকদের ওরা যানবাহনে করে নিয়ে যাবে? সে প্রশ্নই ওঠে না। ওরা ব্যবহার করবে যে যার ‘পা-গাড়ি’।’ (ডুসেলের মুখের বুলিই হল–চরণদাস বাবাজী।)
হেংক–’আমি ওর একবর্ণও বিশ্বাস করি না। তোমরা সবকিছুর শুধু অন্ধকার দিকটাই দেখ। বেসামরিক লোকদের ঝেটিয়ে নিয়ে গিয়ে ওরা করবেটা কী?’
গু-ম—‘জানেন না গোয়েবলস বলেছে, আমরা যদি পিছিয়ে আসি তাহলে দখল করা সমস্ত দেশের দরজা দড়াম করে বন্ধ করে দিয়ে চলে আসব।’
হেংক–’ওরা তো বলার কিছু বাকি রাখেনি।‘
গু-ম—‘আপনি কি মনে করেন জার্মানরা এসবের ঊর্ধ্বে কিংবা তারা খুব হৃদয়বান লোক? ওরা স্রেফ মনে করে–যদি আমাদের ডুবতে হয় তাহলে যারা মুঠোর মধ্যে আছে তাদের সবাইকে নিয়ে আমরা ডুবব।‘
হেংক–’ওসব গিয়ে দরিয়ার লোকদের বলুন; আমি বিন্দুমাত্র বিশ্বাস করি না।’
গু-ম—‘এটাই সবসময় হয়ে থাকে; ঘাড়ে এসে পড়ার আগে কেউ বিপদ দেখতে পায় না।‘
হেংক–’আপনারা তো নিশ্চয় করে কিছুই জানেন না; সবটাই আপনাদের শুধু অনুমান।
গু-ম–’আমরা হলাম সবাই পোড়-খাওয়া মানুষ; আগে জার্মানিতে, এখন এখানে। রুশদেশেই বা কী ঘটছে?’
হেংক–ইহুদীদের কথা বাদ দিন। আমার মনে হয় রুশদেশে কী ঘটছে কেউই তার খবর রাখে না। প্রচারের জন্যে ইংরেজ আর রুশরা অনেক কিছু নিশ্চয়ই বাড়িয়ে বলছে। ঠিক জার্মানদেরই মতন।
