এসব তবু সহ্য হত যদি বড়দের গল্প বলার ধরনটা অমন অকিঞ্চিত্ত্বর না হত কুপহুইস, হেংক বা মিল্ক ঐভাবেই আসরে বলতেন–একই জিনিস দশবার করে। তাতে জুড়ে দিতেন নিজেদের একটু-আধটু চুনট-বুনট। মাঝে মাঝে আমার প্রবল ইচ্ছে হত ওঁদের শুধরে দেবার, অতিকষ্টে নিজেকে সামলাতাম। ছোট ছেলেমেয়েরা যেমন আনা কোনো ক্ষেত্রেই কদাচ বড়দের চেয়ে বেশি জানতে পারে না–তা বড় যত ভুলভ্রান্তিই করুক না কেন, যতই মনগড়া কথা বলে যাক না কেন।
কুপহুইস আর হেংকক্-এর একটা প্রিয় বিষয় হল অজ্ঞাতবাসের আর গুপ্ত আন্দোলনের লোকদের কথা। ওঁরা বিলক্ষণ জানেন যে, আমাদের আত্মগোপনকারী লোকদের কথা জানবার প্রচণ্ড আগ্রহ এবং ধরা-পড়া লোকদের লাঞ্ছনায় যেমন আমরা দুঃখ পাই–তেমনি খুশী হই কেউ বন্দিদশা থেকে ছাড়া পেলে।
অজ্ঞাতবাসে যাওয়া বা আণ্ডার গ্রাউণ্ড হওয়ার ব্যাপারটাতে আমরা এখন সেইভাবেই অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছি, যেমন আমরা অতীতে অভ্যস্ত ছিলাম বাপির শোবার ঘরের চটি গরম করার জন্য ফায়ার প্রেসের সামনে রেখে দেওয়ার ব্যাপারে।
‘স্বাধীন নেদারল্যাণ্ডের মত বিস্তর সংস্থা আছে, যাদের কাজ ‘অভিজ্ঞানপত্র জাল করা, ‘আণ্ডার গ্রাউণ্ডে’র লোকদের অর্থ যোগানো, লোকজনদের লুকিয়ে থাকার জায়গা দেখে দেওয়া এবং আত্মগোপনকারী তরুণদের জন্যে কাজের ব্যবস্থা করা; দেখে আশ্চর্য লাগে, এই লোকগুলো নিজেদের জীবন বিপন্ন করে অন্যদের সহায় হয়ে আর বাঁচাবার জন্যে নিঃস্বার্থভাবে কী পরিমাণ মহৎ কাজ করে চলেছে। আমাদের সাহায্যকারীরা এর একটি দৃষ্টান্ত? এ পর্যন্ত তারা আমাদের বিপদ থেকে ত্রাণ করেছেন এবং আমরা আশাকরি তারা আমাদের নিরাপদে ডাঙায় পৌঁছে দেবেন। নইলে, হন্যে হয়ে যাদের খুঁজছে সেই অন্য অনেকের মতোই ওঁদের কপালেও আছে একই দুর্গতি। আমরা ওঁদের গলগ্রহ হয়ে আছি সন্দেহ নেই। কিন্তু সে সম্বন্ধে একটা টু শব্দও তাদের কাছ থেকে কোনোদিন আমরা শুনিনি; আমরা যে ওঁদের এত মুশকিলে ফেলি, ওঁরা একজনও তা নিয়ে কখনও নালিশ করেন না।
এমন দিন যায় না যেদিন ওঁরা ওপরে উঠে আসেন না। এসে ওঁরা কথা বলেন পুরুষদের সঙ্গে ব্যবসাপত্র আর রাজনীতি, মায়েদের সঙ্গে খাবারদাবার আর যুদ্ধকালীন সংকট আর ছোটদের সঙ্গে খবরের কাগজ আর বইপত্র নিয়ে। মুখে ওঁদের যথাসম্ভব ফোঁটানো থাকে। হাসিখুশি ভাব, জন্মদিনে আর ব্যাঙ্ক বন্ধের দিন আনেন ফুল আর উপহার, সাহায্যে কখনও বিমুখ নন এবং সবকিছু করেন প্রাণ দিয়ে। এ জিনিস জীবনে কখনও ভোলার নয়। অন্যেরা যেখানে লড়াইতে আর জার্মানদের বিরুদ্ধে বীরত্ব দেখায়, আমাদের সাহায্যকারীরা বীরত্ব দেখান তাদের সদাহাস্যময়তায় আর স্নেহভালবাসায়।
অবিশ্বাস্য সব গল্প বাজারে চলেছে, কিন্তু তাহলেও সচরাচর এসবের মূলে সত্য আছে। যেমন, কূপহুইস এ সপ্তাহে আমাদের বললেন যে, গেণ্ডার ল্যাণ্ডে এগারোজন এগারোজন করে দুটো ফুটবল টিমের খেলায় এক পক্ষে ছিল পুরোপুরি ‘আনডার গ্রাউণ্ডে’র লোক আর অন্য পক্ষে ছিল পুলিশ বাহিনীর লোক।
হিভারসুমে নতুন রেশন কার্ড বিলি করা হচ্ছে। লুকিয়ে থাকা লোকরাও যাতে রেশন পেতে পারে তার জন্যে কর্মাচরীদের পক্ষ থেকে এলাকার ঐসব লোকদের জানানো হয়েছে তারা যেন একটা বিশেষ সময়ে এসে আলাদা একটা ছোট টেবিল থেকে উপযুক্ত দলিলপত্র নিয়ে যায়। তাহলেও এ ধরনের দুঃসাহসী কলাকৌশলের কথা যাতে জার্মানদের কানে না। যায় তার জন্যে ওদের সতর্ক হতে হবে।
তোমার আনা।
০৬. বহিরাক্রমণের ব্যাপারে
বৃহস্পতিবার, ৩ ফেব্রুয়ারি, ১৯৪৪
আদরের কিটি,
বহিরাক্রমণের ব্যাপারে দিন দিন দেশের মধ্যে উত্তেজনা দারুণ বাড়ছে। এ নিয়ে যে সাজো সাজো রব উঠেছে, তুমি এখানে থাকলে তার আঁচ হয়ত তোমার গায়েও এসে লাগত; অন্যদিকে, এ নিয়ে আমরা যে হৈচৈ জুড়ে দিয়েছি কে জানে, হয়ত নিতান্তই অকারণে তাই দেখে তুমি আমাদের উপহাস করতে।
কাগজগুলোতে এখন শুধু বহিরাক্রমণ ছাড়া কথা নেই; তাতে বলা হচ্ছে, হল্যাণ্ডে যদি ইংরেজদের সৈন্য নামে, তাহলে দেশটির প্রতিরক্ষায় জার্মানরা সর্বশক্তি নিয়োগ করবে; যদি দরকার হয়, দেশ বানের পানিতে ভাসিয়ে দেবে। ফলে, লোকজনদের আত্মারাম খাঁচাছাড়া হওয়ার যোগাড়।
লেখার সঙ্গে কয়েকটা ম্যাপ ছাপিয়ে দেখানো হয়েছে হল্যাণ্ডের কোন্ কোন্ অংশ পানির তলায় চলে যাবে। এটা আমস্টার্ডামের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের ক্ষেত্রেও প্রয়োজ্য বলে, প্রথম কথা হল, রাস্তায় এক মিটার পানি দাঁড়ালে আমরা তখন কী করব? এ বিষয়ে দেখা যাচ্ছে নানা মুনির নানা মত।
‘যেহেতু আদৌ হেঁটে বা সাইকেলে যাওয়া চলবে না, সুতরাং পানি ঠেলে ঠেলে আমাদের যেতে হবে।‘
‘একেবারেই না, বরং চেষ্টা করে সাঁতরাতে হবে আমরা সবাই স্নানের পোশাক আর টুপি পরে যথাসম্ভব পানির ভেতর দিয়ে ডুবে ডুবে যাব যাতে আমরা যে ইহুদী সেটা লোকে ধরে না ফেলে।’
‘কী যা-তা বকছ, ইঁদুরে কুটুস করে পায়ে কামড়ালে দেখব মেয়েরা কত সাঁতার কাটে!’ (বক্তা স্বভাবতই একজন পুরুষমানুষ–দেখা যাবে, চিৎকার করে কে পাড়া মাথায় করে!)
‘যে যতই বলো, বাড়ি থেকে যে আমরা বেরোবো সে গুড়ে বালি। এখনই যা নড়বড় করছে তাতে বান এলে গুদামঘরটা নির্ঘাত ধ্বসে পড়বে।‘
