‘এই যে, তুমি এটাকে দেখতে চাও?’ বলে কোনো হাবিজাবি বাগ্বিস্তরের ভেতর না গিয়ে বেড়ালটাকে স্রেফ চিৎ করে পেড়ে ফেলে পেটার সূকৌশলে এক হাতে তার মাথা আর অন্য হাতে তার থাবা দুটো ঠেসে ধরল। তারপর শুরু হল পেটারের মাস্টারি–এই হলো পুরুষের লিঙ্গ, এই হল মাত্র গুটিকয় চুল আর ঐটা হল ও পাছা।’ বেড়ালটা এবার এক কাতে উল্টে আবার তার সাদা লোমশ পায়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল।
আর কোনো ছেলে যদি আমাকে পুরুষের লিঙ্গ প্রদর্শন করত, আমি তার দিকে কখনই ফিরে তাকাতাম না। কিন্তু পেটার কোনোরকম মানসিক বিকার না ঘটিয়ে এমন একটা কষ্টকর বিষয়ে খুব নির্বিকার ভাবে কথা বলে চলল। শেষ অবধি আমার আড়ষ্টতা ভেঙে দিয়ে আমাকেও ও বেশ স্বাভাবিক করে তুলল। আমরা বোখার সঙ্গে মজা করে খেললাম, নিজেরা বকর বকর করলাম আর তারপর প্রকান্ড গুদাম ঘরটার ভিতর দিয়ে পায়চারি করতে করতে দরজার দিকে গেলাম।
যেতে যেতে জিজ্ঞেস করি, সাধারণত যখন আমার কিছু জানতে ইচ্ছে হয়, আমি বইপত্র ঘেঁটে বার করি। তুমি করো না?’
মাথা খারাপ? সোজা ওপরতলায় গিয়ে আমি জিজ্ঞেস করি। আমার বাবা আমার চেয়ে অনেক বেশি জানেন। এসব বিষয়ে তাঁর অভিজ্ঞতা অনেক বেশি।’
ততক্ষণে আমরা সিঁড়ির কাছে চলে এসেছি। সুতরাং এর পর আমি মুখে কুলুপ দিলাম।
ব্রের রাবিট বলেছিলেন, ‘সব কিছুরই হেরফের হতে পারে।‘ এটা ঠিক। কোনো মেয়ের সঙ্গে এসব জিনিস অতটা স্বাভাবিকভাবে বলা চলত না। ছেলেদের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করতে মা-মণি বারণ করেছিলেন বটে, কিন্তু এ ব্যাপারে আমার কোনোই সন্দেহ নেই যে মা-মণি ঠিক সে অর্থে বলেননি। কিন্তু শত হলেও এরপর সারাদিন আমি যেন কেমন একটা হয়ে গেলাম। আমাদের কথাবার্তার কথা মনে পড়ে কেমন যেন বেখাপ্পা লাগছিল। কিন্তু অন্তত একটা বিষয়ে আমার চোখ খুলে গিয়েছিল; সেটা এই যে, প্রকৃতই এমন কমবয়সী মানুষজন আছে–এমন কি তারা ছেলে হলেও মেয়েদের সঙ্গে স্বচ্ছন্দে এসব বিষয়ে ভালো মনে কথা বলতে পারে।
আমি ভাবি পেটার সত্যিই ওর বাবা-মাকে খুব বেশি জিজ্ঞাসাবাদ করে কি না। কাল আমার সঙ্গে যেভাবে করেছিল সেইভাবে পেটার ওঁদের সাক্ষাতে অকপট আচরণ করে কি? হায়, আমি তা কী জানব!
তোমার আনা।
.
বৃহস্পতিবার, ২৭ জানয়ারি, ১৯৪৪
আদরের কিটি,
ইদানীং পারিবারিক কুলজি আর রাজবংশাবলী নিয়ে আমি খুব মজে গিয়েছি। এখন আমার ধারণা হয়েছে যে, একবার শুরু করে দিলে আরও গভীরভাবে ইতিহাসচর্চার দিকে মন যায় এবং তখন ক্রমাগত নতুন নতুন আর মজার মজার জিনিস চোখে পড়ে। লেখাপড়ার ব্যাপারে আমি অসাধারণ পরিশ্রমী এবং স্থানীয় বেতারে ইংরেজিতে যে প্রোগ্রাম হয় আমি তা শুনে বিলক্ষণ বুঝতে পারি, কিন্তু এসব সত্ত্বেও আমার কাছে ফিল্মস্টারদের যেসব ছবি আছে সেগুলো অনেক রবিবারেই সাজাই বাছাই করি এবং মনপ্রাণ ঢেলে দিয়ে দেখি–এখন সেই ছবির সংগ্রহটা বেশ বড়সড় হয়ে উঠেছে।
প্রতি সোমবারে মিস্টার ক্রালার যখন ‘সিনেমা আর থিয়েটার’ পত্রিকাটা আনেন–আমি খুশীতে ডগমগ হয়ে উঠি। এই বাড়িতে যাদের স্কুল জিনিসে টান কম, তারা প্রায়ই এই সামান্য উপহারটিকে অর্থের অপব্যয় বলে মনে করেন; অবশ্য বছরখানেক পরেও আমি যখন নির্ভুলভাবে বলে দিই কোন্ ফিল্মে কে আছে তখন তারা অবাক হয়ে যান। ছুটির দিনগুলোতে এলি তার ছেলেবন্ধুর সঙ্গে প্রতি সপ্তাহে সিনেমায় যান; যেই উনি আমাকে ছবির নাম বলেন, অমনি আমি এক নিঃশ্বাসে গড় গড় করে বলে চলি ছবির তারকাদের নাম আর সেই সঙ্গে ছবিটি সম্পর্কে চলচ্চিত্র-সমালোচকদের বক্তব্য। অল্প কিছুদিন আগে মা বলছিলেন যে, এরপর আমার আর কোনো সিনেমার যাওয়ার দরকার হবে না। কেননা ছবির প্লট, তারকাদের নাম আর সমালোচকদের মতামত সমস্তই আমার কণ্ঠস্থ।
কখনও যদি আমি নতুন কায়দায় চুল বাঁধি, অমনি সকলে চোখ কুঁচকে তাকায়। আমি জানি ঠিক কেউ জিজ্ঞেস করে বসবে সিনেমার কোন্ রূপসীর চুলের ঢং আমি নকল করেছি। ওটা আমি নিজের মাথা থেকে বের করেছি বললে পুরোপুরি কেউ বিশ্বাস করে না।
চুল বাধার ব্যাপার নিয়ে আরেকটু বলি–চুল বেঁধে আঘঘণ্টার বেশি সেটা থাকে না; লোকের বাক্যবাণে তিতিবিরক্ত হয়ে চটপট বাথরুমে চলে গিয়ে চুল খুলে ফেলে বেঁধে নিই আমার সেই আটপৌরে এলোখোঁপা।
তোমার আনা।
.
শুক্রবার, ২৮ জানুয়ারি, ১৯৪৪
আদরের কিটি,
আজ সকালে মনে মনে ভাবছিলাম, মাঝে মাঝে নিজেকে তোমার পুরনো খবরের জাবর কাটা গরুর মত মনে হতে পারে যে শেষ অবধি সশব্দে হাই তুলে মনে মনে কামনা করে আনা যেন মাঝে-মধ্যে কিছুটা নতুন খবর দেয়।
দুঃখ এই যে, আমি জানি তোমার কাছে এ সবই খুব নিরস, তবে আমার দিকটাও তুমি একটু ভেবে দেখ ভাবো একবার আমার কী হাল বুড়ো গরুদের নিয়ে, যাদের উপর্যুপরি খানাখন্দ থেকে উঠিয়ে আনতে হয়। খেতে বসে রাজনীতি বা উপাদেয় খাবারের প্রসঙ্গ না। থাকলে, তখন মা-মণি কিংবা মিসেস ফান ডান তাদের ঝুলি থেকে তরুণ বয়সের পুরনো কোনো গল্প বের করেন, যে-গল্প শুনে শুনে আমাদের কান পচে গেছে। কিংবা ডুসেল ঘ্যানর ঘ্যানর করে বলতে থাকেন স্ত্রীর এলাহি পোশাক-আশাক, রেসের সুন্দর সব ঘোড়া, ফুটো হওয়া দাঁড়নৌকো, চার বছর বয়সের সাঁতারু সব ছেলে, পেশীর ব্যথা আর ভয়তরাসে সব রুগীর গল্প। মোদ্দা ব্যাপার যেটা দাঁড়ায় তা এই–আমাদের আটজনের যে কেউ যদি মুখ খোলে, তাহলে বাকি সাতজনই তার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বাকি গল্পটা তার হয়ে বলে যেতে পারে। প্রত্যেকটা হাসির কথার নির্দিষ্ট বিষয়টা গোড়া থেকেই আমাদের জানা এবং যে বলে সে ছাড়া আর কেউ সেই রসিকতা শুনে হাসে না। দুই প্রাক্তন গিন্নী-মার হরেক গোয়ালা, মুদি আর কশাইদের এত বেশিবার আকাশে তোলা হয়েছে কিংবা কাদায় ফেলা হয়েছে যে শুনে শুনে আমাদের মানসপটে তাদের দাড়ি গজিয়ে গিয়েছে; এখানে কোনো টাটকা কিংবা আনকোরা বিষয়ে কথাবার্তা হওয়া সম্ভবই নয়।
